গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস’-এ প্রকাশিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের এক গবেষণায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর আশঙ্কাজনক উপস্থিতি উঠে এসেছে। এই দূষণ উপকূলীয় অঞ্চলের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রতিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে তীব্র ঝুঁকিতে ফেলছে।
যবিপ্রবি-এর গবেষক দল ভৈরব ও রূপসা নদীর ৯টি জনবহুল পয়েন্টের তলদেশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালান। গবেষণায় উঠে আসা প্রধান তথ্যগুলো হলো:
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব: নদীর তলদেশের ১০-৩০ সেন্টিমিটার গভীরতার পলিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ ৫,৭০০টি এবং গড়ে ৩,৬০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।
পলিমারের ধরন: প্রাপ্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে ৫১% ফ্র্যাগমেন্ট, ২৬% ফাইবার এবং ১৮% ফিল্ম। এতে পলিইথিলিন (২৩%), পলিস্টাইরিন (২১%) ও পলিপ্রোপিলিনসহ (১৮%) ৭ ধরনের পলিমার পাওয়া গেছে।
ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া: মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি নদীর তলদেশে উচ্চমাত্রায় ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভারী ধাতু ধরা পড়েছে।
ঝুঁকির মাত্রা: পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক (PERI) অনুযায়ী, এই নদী দুটির পলিতে দূষণের মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ বা ‘ক্লাস ভি’ পর্যায়ের।
দূষণের উৎস ও প্রভাব
খুলনা মহানগরী ও নওয়াপাড়ার শিল্প-কারখানা এবং লোকালয়ের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ড্রেন ও খাল হয়ে সরাসরি নদীতে মিশছে। খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৭৩২ টন বর্জ্যের একটি বড় অংশই নদী ও খালে গিয়ে পড়ে। এছাড়া, সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রাম ও পর্যটকদের ফেলে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য জোয়ার-ভাটার কারণে বনের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব প্লাস্টিক কণা খাবার হিসেবে গ্রহণ করায় বিষাক্ত ধাতুগুলো সরাসরি মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
উত্তরণের উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে সুন্দরবন, উপকূলীয় পরিবেশ ও মানবজীবন বাঁচাতে অবিলম্বে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পবর্জ্য রিসাইকেল করা এবং সরাসরি নদ-নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















