বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মে গাছপালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু গাছ কেবল সৌন্দর্য্যই বহন করে না, বরং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ঔষধি গুণাবলী এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সাথেও গভীরভাবে জড়িত।জেনে নেয়া যাক এমন কিছু পবিত্র গাছের কথা যা বিশ্বজুড়ে তাদের ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের জন্য বিখ্যাত।
পদ্ম:
পদ্ম ফুল হচ্ছে এমন একটি উদ্ভিদ, যেটির একেক স্তরের পাপড়ি প্রাচ্যের ধর্মীয় শিক্ষা বা সংস্কারে বিভিন্ন অর্থ বহন করে। হিন্দুদের কাছে এটি জীবন, উর্বরতা ও পবিত্রতার প্রতীক। কাদা ও ময়লার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেও পদ্মের অপরূপ সৌন্দর্য্য নির্লিপ্ততার বার্তা দেয়। বৌদ্ধ ধর্মেও পদ্ম পবিত্রতার প্রতীক। গল্পগাথাঁ প্রচলিত রয়েছে যে, ভগবান বিষ্ণুর নাভির ভেতর থেকে পদ্মের জন্ম আর ব্রক্ষ্মা এর কেন্দ্রে বসে থাকেন। অনেকে বিশ্বাস করেন ঈশ্বরের হাত-পা পদ্মের মতো এবং তাঁর চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো। ফুলের কুঁড়ি যেমন কোমল, ঈশ্বরের স্পর্শ আর দর্শনও সেরকম। হিন্দু ধর্মে বলা হয় প্রতিটি মানুষের মধ্যেই পদ্মের মতো পবিত্র আত্মা বিদ্যমান।
গাজা গাছ
রাস্তাফারি ধর্মে গাজা গাছ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাবারের ক্ষেত্রে তারা কতিপয় আইন মেনে চলে, যা ইতাল নামে পরিচিত। তার অর্থ স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক খাদ্যগ্রহণ। রাস্তাফারিরা বিশ্বাস করেন যে গাজা গাছ ঐশ্বরিক জ্ঞান ও ঔষধি গুণাবলী ধারণ করে। তারা ধ্যান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত গাঁজা ব্যবহার করে থাকেন।
পুদিনা:
পুদিনা শব্দটি গ্রিক শব্দ “minthē” থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “রাজকীয়”। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে, পুদিনাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় এবং এটি একটি পবিত্র ভেষজ হিসেবে বিবেচিত হয়। খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে পুদিনা পবিত্রতা, শুদ্ধতা এবং আশীর্বাদের প্রতীক। অনেকে তাদের বাড়িতে পুদিনা গাছ লাগানোকে আশীর্বাদ হিসেবে মনে করেন।
মিসলটো:
বর্তমান কালে যদিও মিসলটো ক্রিসমাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হয়, কিন্তু প্রাচীন কেল্টদের কাছে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। তারা বিশ্বাস করত মিসলটোতে সূর্য দেবতা টারানিসের স্পর্শ আছে, ফলে যে গাছে মিসলটো জন্ম নেবে বা যে ডালে সেটি ছড়াবে, সেটিও পবিত্র বলে বিবেচিত হবে। শীতকালে যখন সূর্য সবচেয়ে দূরে থাকে, তখন ধর্মযাজকরা সাদা পোশাক পরে সোনালী কাস্তে দিয়ে ওক গাছ থেকে পবিত্র মিসলটো সংগ্রহ করতেন। এই গাছ ও এর ফল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হত। ভুল ধারণা ছিল যে এর জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে। মিসলটোর একটি অংশই রোগ সারাতে পারে, যেকোনো বিষের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে, এবং ডাইনির ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে বাস্তবে, মিসলটো গ্রহণ বিষাক্ত হতে পারে।
পেয়টে
পেয়টে টেক্সাস ও মেক্সিকোর মরুভূমিতে পাওয়া এক ধরণের কাণ্ডহীন ক্যাকটাস। সহস্রাব্দ ধরে আদিবাসীরা এটি ধর্মীয় আচারে ব্যবহার করে আসছে। হুইকোল ইন্ডিয়ান ও অন্যান্য আদিবাসীরা বিশ্বাস করত পেয়টে তাদের ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার একধরণের মোহ বা আবেশ তৈরি করে, ফলে অনেকেই কল্পনা জগতে বা অলৌকিক জগতে বিচরণ করছেন বলে মনে করেন। শুধু আদিবাসীই নয়, শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী ও লেখকরাও এর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার জন্য আকৃষ্ট হন।
তুলসী
হিন্দু ধর্মে তুলসী গাছকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, দেবী বৃন্দা কৃষ্ণ ও তার ভক্তদের সেবার জন্য তুলসী গাছের রূপ ধারণ করেছিলেন। আবার প্রাচীন গ্রন্থে বলা হয়, কৃষ্ণ নিজেই তাকে তুলসী আকারে গ্রহণ করেছেন। তাই যেখানেই তুলসী গাছ জন্মায়, সেখানেই বৃন্দাবনের পবিত্র মাটির সমতুল্য বলে বিবেচিত হয়। বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ হিন্দু তাদের দৈনন্দিন ধর্মীয় রীতিনীতিতে তুলসী পাতা ব্যবহার করেন।
ইয়ু গাছ
ইয়ু গাছ সারা বছর সবুজ থাকে এবং হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে পারে। এটি একটি দেবদারু জাতের গাছ। অনেকে এই গাছটিকে পুনর্জন্ম ও অনন্ত জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। খ্রিস্টানরা মৃতদের কফিনে ইয়ু গাছের শাখা রাখেন এবং অনেক চার্চের পাশে এই গাছ দেখা যায়। তবে খ্রিস্টান ধর্মের আগে থেকেই অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী এই গাছটিকে পূজা করে আসছে এবং তারা তাদের প্রার্থনাস্থল নির্বাচনে ইয়ু গাছের উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেয়।
শারমিন সীমা 










