বন উজাড় হচ্ছে, আগ্রাসী প্রজাতির বৃক্ষ-মাছ-প্রাণী বাড়ছে, শিল্পের বর্জ্যে পানি দূষিত হচ্ছে, জলাভূমি ভরাট চলছে,- স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব কারণে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। উন্নত দেশগুলোর ব্যাপক কার্বন নিঃসরণ, প্লাস্টিকের কারবার এবং কৃষিতে ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণে কমে আসছে প্রকৃতির স্বাভাবিক শৃঙ্খলা। এদিকে মানুষ এমন আগ্রাসীভাবে পৃথিবী দখল করছে যেন পৃথিবীটা তাদের একার, অথচ এই ধরিত্রীতে মানুষের যেমন অধিকার তেমনি অধিকার ছোট্ট একটি প্রজাপতির-পাখিরও।
সব মিলিয়ে মানুষের আগ্রাসী মনোভাব ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে হুমকির মুখে পড়েছে গোটা বিশ্বের জীববৈচিত্র্য। জাতিসংঘের তথ্য মতে, প্রকৃতি ধ্বংসের বর্তমান এই ধারা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে।
জীববৈচিত্র্য বা বায়োডাইভার্সিটি বলতে বুঝায় পৃথিবীর সব ধরনের জীব—গাছপালা, প্রাণী, মাছ, পোকামাকড়, এবং মাইক্রোঅর্গানিজমের বৈচিত্র্য। প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি প্রকৃতির এক অপরিহার্য অংশ। তারা একে অপরের সঙ্গে জড়িত এবং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই নান্দনিক ও কার্যকরী সিস্টেম ছাড়া, আমাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিন্তে করা সম্ভব নয়।

গত কয়েক দশকে, বনাঞ্চল ধ্বংস, জলজ ও স্থলজ বাস্তুসংস্থানের অবক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও অতিরিক্ত শিকার জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন ও সমুদ্রের বহু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে হচ্ছে, তা যদি চলতে থাকে, তাহলে ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রতি তিনটির মধ্যে একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। বাংলাদেশেও সুন্দরবন, পদ্মা-যমুনা নদীর বেষ্টিত এলাকায় জীববৈচিত্র্যের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বিশ্বের বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এই হারানো জীববৈচিত্র্য মানে শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়, বরং মানব সভ্যতার নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর সংকেত। স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তা পর্যন্ত সবকিছুই প্রভাবিত হতে পারে। অর্থাৎ জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানুষের অস্তিত্বদের সঙ্গেও সম্পৃক্ত, যার গুরুত্ব অনুধাবন করে পালিত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য দিবস। আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিবসটির সূচনা হয় ১৯৯২ সালে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে পালন করা হলেও ২০০১ সাল থেকে এটি প্রতিবছর ২২ মে পালন করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ২২ মে দিনটি আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক প্রোগ্রামের অধীনে কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি (সিবিডি) কর্তৃক একটা করে থিমও নির্ধারণ করা হয় প্রতিবছর। এই বছরের থিম হচ্ছে, ‘হারমোনি উইথ নেচার এন্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’, অর্থাৎ ‘প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য এবং টেকসই উন্নয়ন’।

টেকসই উন্নয়ন আসলে কি? ১৯৯২ এর ধরিত্রী সম্মেলনের ‘এজেন্ডা ২১’ অনুযায়ী, পরিবেশের কোনো ক্ষতি সাধন না করে এবং মানব সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ের কোনোরূপ ব্যত্যয় না ঘটিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে মানব জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনই হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন।
ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ডব্লিউসিইডি) এর সাবেক চেয়ারম্যান ব্রুন্ডটল্যান্ডের মতে, টেকসই উন্নয়ন হলো সেই উন্নয়ন যা ভবিষ্যত প্রজন্মের সম্পদের চাহিদা পূরণের সক্ষমতাকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, বর্তমান প্রজন্মের সম্পদের চাহিদা পূরণ করে।
এই কয়েকদিন আগেও কেবল উন্নয়নের কথা বলা হতো, আর এখন বেশ জোরেশোরেই টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের উন্নয়নের জন্য টেকসই উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে বাঁচাতে হবে পরিবেশ-প্রকৃতি, প্রকৃতির স্বার্থেই রক্ষা করতে হবে জীববৈচিত্র্য। চমৎকার এই শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই মানুষের সব উন্নয়ন কাজ হতে হবে টেকসই।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















