ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকা ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় নগরায়নের ছোঁয়া লেগেছে কয়েক বছর আগেই। প্রশস্ত সড়ক, একটি লেক আছে, পাশেই বহুতল আবাসন প্রকল্প, কাছেই মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশন। এখন সমস্যা হলো, সম্প্রসারিত রাজধানীর এই অপেক্ষাকৃত নতুন এলাকায় এখনো সবুজায়নের বাকী অনেকটাই। বিশেষ করে সড়কে নেই গাছের ছায়া। সবুজের শূন্যতা পূরণে এবার তাই দিয়াবাড়ির কাছের ষোলহাটি এলাকা সবুজে সাজানোর উদ্যোগ নিলো প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং টেলিকম-ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক। আর এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলো ঢাকা জেলার প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে ষোলহাটি এলাকার চওড়া সড়ক বিভাজকে রোপণ করা হলো কয়েকশ চারা গাছ। এছাড়া স্কুলপড়ুয়াদের হাতে হাতেও তুলে দেয়া হয়েছে গাছের চারা।

এ উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টম্বর) সকাল থেকেই ষোলহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উৎসবের আমেজ। স্কুলটির দেয়াল ঘেঁষে সারি সারি গাছের চারা, চারা রক্ষার ঘেরবেড়া স্তুপ করে রাখা। সকাল ১১ টার আগেই স্কুলের প্রাঙ্গনে চলে এলো প্রকৃতি ও জীবন টিম। তাদের আগেই ঝকঝকে স্কুলড্রেস পরে হাজির প্রাইমারি স্কুলটির ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা, আশপাশের বাড়ি থেকেও শিশুরা এসেছে দলবেঁধে। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুল প্রাঙ্গনে আসেন গোটা আয়োজনের মধ্যমণি প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু। এর মধ্যেই বাংলালিংকের কর্মী বাহিনীও হাজির।

বৃক্ষরোপণের মহাযজ্ঞ শুরুর আগে ষোলোহাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় হলো আলোচনা সভা। সভা শুরুর আগে দর্শকদের দেখানো হয় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ড তুলে ধরা একটি তথ্যচিত্র, প্রকৃতি ও জীবন মিউজিক ক্লাবের ‘সবুজের আহবান’ ও সম্প্রতি শেষ হওয়া বাঘ দিবসের বিশেষ কর্মসূচি টাইগার রান উপলক্ষ্যে নির্মিত আরেকটি গান ‘বাংলার বাঘ’।

আলোচনা সভায় শুরুতেই বক্তব্য রাখেন ঢাকা জেলার প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি আসলাম হোসেন। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন,‘কেউ যদি সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে চায়, তাহলে তাদের প্রকৃতিকে সুন্দর রাখা উচিৎ। আমরা প্রত্যেকটি মানুষ যদি একেকজন মুকিত মজুমদার বাবু হই, অর্থাৎ প্রকৃতিকে ভালোবাসি, তাহলে এই দেশ সুন্দর হবে, আমরা সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারবো।’

এবছর প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের ‘সবুজে সাজাই বাংলাদেশ’ নামের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সঙ্গী হয়েছে বাংলালিংক।
আলোচনা সভায় বাংলালিংকের ডেপুটি সিইও জাহরাত আদিব চৌধুরী স্কুলের ভেতর বড় কয়েকটি গাছের ছায়ার কথা মনে করিয়ে দেন, বলেন, ‘বাইরে রোদের তাপ, এখানে আসার পর যে গরম আমরা অনুভব করছিলাম তাতে এই স্কুল প্রাঙ্গনে যদি এই গাছগুলো না থাকতো, তাহলে হয়তো এমন উন্মুক্ত জায়গায় আমরা বসতে পারতাম না। আসার সময় প্রায় বৃক্ষশূন্য রাস্তা দেখে দুঃখ লাগছিলো। ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় গাছের পরিমাণ খুব কম। এই অবস্থা দূর করতে প্রতিবছর আমরা দেখি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হয়। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ যে ওনারা বছর বছর এমন কর্মসূচি পালন করছেন। এবার চারকোটি গ্রাহকের বাংলালিংক এই কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পেরে আনন্দিত। ঢাকাসহ সারাদেশে আমরা প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৃক্ষরোপণ করছি।’

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য তিনি ষোলহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘রোপিত গাছগুলো যেন রক্ষা পায়, যত্নে বেড়ে ওঠে, আশা করি তা আপনারা, এলাকাবাসী ও গণ্যমান্যরা খেয়াল রাখবেন।’
উত্তরায় সবুজায়নের এই উদ্যোগে শামিল হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। আজকের অনুষ্ঠানে উত্তর সিটির প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন পরিবেশ, জলবায়ু ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেম।

তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণসহ, উত্তপ্ত ঢাকায় বৃক্ষরোপণ কার্যকরী সমাধানের একটি উপায়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন বর্তমান অর্থবছরে বৃক্ষরোপণের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ রেখেছে। আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। জিরো সয়েল কনসেপ্ট অর্থাৎ যতো খোলা অনাবাদি জায়গা আছে আমরা তাতে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছি। ধূলামুক্ত ঢাকা মহানগরীর জন্য মাটি উন্মুক্ত না রেখে আমরা ঘাস ও গাছ লাগাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য আপাতত ৫ লাখ বৃক্ষরোপণ করা। আর এই লক্ষ্যপূরণে আমরা প্রকৃতি ও জীবনের মতো সংগঠনের সাথে কাজ করছি। বৃক্ষরোপণের পর এর যত্ন নেয়া আরও দরকার, ইসলাম ধর্মেও বৃক্ষরোপণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মজুমদার বাবু।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি জানান, রাজধানীর এই অংশ পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে, এখানে পরিবেশের ভবিষ্যত নিয়ে তাই আশাবাদী হওয়া যায়।

প্রকৃতিবন্ধু বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘গাছ কেবল যে ফল-ফুল দিচ্ছে তা-ই নয়, প্রত্যেকটি গাছ অক্সিজেন দিচ্ছে, কার্বন-ডাই অক্সাইড শুষে নিচ্ছে, পাশাপাশি গাছ কিন্তু প্রাণীদের আবাসস্থলও। মাটির উর্বরতা বলি, মাটিকে ধরে রেখে ক্ষয়রোধ করা বলি, সেসব করছে গাছ। দক্ষিণে গাছ বুকে আগলে আমাদের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করছে। অথচ সেই গাছ আমরা নিধন করছি, দিন দিন গাছ শূন্য হয়েছে ঢাকা।’
তিনি বলেন, ‘গাছ না থাকলে কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এই আপনি, আমি ও আমাদের বাচ্চারা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি ভালো রাখতে হয় আমাদের কিন্তু এই বৃক্ষরোপণ করে যেতে হবে এবং পরিবেশকে ভালো রাখার বার্তাও দিতে হবে। আজকে পরিবেশ-প্রকৃতিকে ভালো রাখতেই এখানে বৃক্ষরোপণ এবং শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীদের সচেতনতার বার্তা দিতে এই আয়োজন। ৭১ সালে আমরা হাতে-হাত মিলিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কাছ থেকে দেশকে স্বাধীন করেছি। আবার পরিবেশ প্রকৃতিকে যদি ভালো রাখতে চাই, তাহলে আবার আমাদের হাতে-হাত মেলাতেই হবে।’

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের উপদেষ্টা ড. মুনশী শা জাহান। বৃক্ষরোপণের এই আয়োজনে ষোলহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সম্পৃক্ত করায় ধন্যবাদ জানান স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শাহিনা জিন্নাতুল ফেরদৌস।

আলোচনা সভা শেষে মুকিত মজুমদার বাবুসহ অন্যান্য অতিথিরা শিক্ষার্থীদের হাতে গাছে চারা তুলে দেন।

চারা বিতরণ শেষে অতিথিদের নিয়ে ষোলহাটি সড়কদ্বীপে একটি সোনালু গাছের চারাসহ কয়েকটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রকৃতিবন্ধু।

এছাড়া ষোলহাটি সড়কদ্বীপ-সড়কবিভাজকে শতাধিক গাছের চারা রোপণ করেন প্রকৃতি ও জীবন, বাংলালিংক কর্মীরা।

সার্বিক সহায়তা করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া এলাকাবাসীর নিজ আঙিনায় রোপণের জন্যও গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

সব শেষে মুকিত মজুমদার বাবু এবং প্রকৃতি ও জীবন টিমের সদস্যরা শ্রেণীকক্ষগুলো পরিদর্শন করেন।

এসময় তিনি শিক্ষার্থীদের গাছে উপকারিতা সম্পর্কে সহজ করে বলেন এবং রোপিত নতুন চারাগুলোর যত্ন নিতে বলেন।
নাসিমুল শুভ 










