ইতিহাসের এই দিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়

ইতিহাসের এই দিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়

আজকের দিনটি কাল অতীত। তাই প্রতিটি দিনই এক ইতিহাস। আজ ৩০ এপ্রিল ২০২৫, বুধবার। ইতিহাসের এই দিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গঠিত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলা সাহিত্যের উন্নতি এবং প্রসারের উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় উনিশ শতকের শেষ দিক। বাংলায় জন্ম নিচ্ছে বাঙালি জাতিয়তাবাদ। একদিকে সংস্কৃত অন্য দিকে ইংরেজির দাপট। দুইয়ের চাপে দমবন্ধ অবস্থা বাংলা ভাষার। বাংলা সংস্কৃতির অবস্থাটাও ছিল অনেকটা একই রকম। অবস্থাটা পাল্টাতে শুরু হল অন্য রকম ভাবনার মাধ্যমে। বাঙ্গালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির চর্চা এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দরকার পড়ল একটা মঞ্চের। একটা প্রতিষ্ঠানের।

বাংলা ভাষার বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা, অন্যান্য ভাষায় রচিত গ্রন্থের অনুবাদ, দুর্লভ বাংলা রচনা সংরক্ষণ, গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই পরিষদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। উনিশ ও বিশ শতকের প্রায় সব বাঙালি মনীষীই যুক্ত ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গ। উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও প্রসার। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন বিনয়কৃষ্ণ দেব। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ একটি সাহিত্য সংস্থা। এল লিওটার্ড ও ক্ষেত্রপাল চক্রবর্তীর উদ্যোগে ১৮৯৩ সালের ২৩ জুলাই ‘বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার’ নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ রাখা হয়। এর যাত্রা শুরু হয় কলকাতার শোভাবাজারে বিনয়কৃষ্ণ দেব-এর বাসভবনে।

বাংলা সাহিত্যের উন্নতি সাধন ছিল পরিষদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রথম দিকে এর প্রায় সব কাজই ইংরেজিতে সম্পন্ন হতো। এমনকি সভার মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা দি বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার-এর অধিকাংশই লিপিবদ্ধ হতো ইংরেজিতে। এই অসঙ্গতি দূর করার উদ্দেশ্যে উমেশচন্দ্র বটব্যালের প্রস্তাবানুসারে ১৮৯৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পরিষদের সভায় মুখপত্রটি দি বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ  এ উভয় নামেই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৮৯৪ সালের ২৯ এপ্রিলের সভায় পরিষদের নামটি ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ হিসেবে সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। এরপর ৩০ এপ্রিল থেকে পরিষদের মুখপত্রটি সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকা হিসেবে বাংলায় প্রকাশিত হতে থাকে।

১৮৯৪ সালে পরিষদের সভাপতি ছিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত, সহ-সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবীনচন্দ্র সেন এবং সম্পাদক ছিলেন এল লিওটার্ড, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। ১৮৯৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পরিষদের নিজস্ব একটি কার্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিষদের কার্যালয় ১৩৭/১ কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে একটি ভাড়া বাড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিশ শতকের প্রথম দশকে পরিষদের কলেবর যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে এর সদস্য সংখ্যা ৫২৩-এ উন্নীত হয়। প্রখ্যাত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবীনচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত গুপ্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, দেবেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, অমৃতকৃষ্ণ মল্লিক, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ও দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু। ১৯০৬ সালে পরিষদের এক বিশেষ অধিবেশনে কলকাতার বাইরে পরিষদের শাখা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর পরপরই রংপুরে একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। কালক্রমে বাংলার বিভিন্ন জেলা শহরে এবং বাংলার বাইরেও ৩০টি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। চারুচন্দ্র ঘোষ, রজনীকান্ত গুপ্ত, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ও নগেন্দ্রনাথ বসু পরিষদের নিজ বাসগৃহ নির্মাণের জন্য কাসিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর স্মরণাপন্ন হন। তিনি হালশীবাগানে সাত কাঠা জায়গা পরিষদকে দান করেন। ১৯০৯ সালের শেষদিকে পরিষদ স্থায়ী কার্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়।

বান্ধব, বিশিষ্ট, আজীবন, সহায়ক ও সাধারণ পরিষদে এই পাঁচ ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। যেকোন ব্যক্তি পরিষদের সাধারণ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন।

বাংলা ভাষায় নানা বিষয়ের গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা করে পরিষদ বিদ্বৎসমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। সংস্কৃত, আরবি ও ইংরেজি ভাষা হতে বহু গ্রন্থ অনুবাদ ও প্রকাশ করা এবং দুষ্প্রাপ্য বাংলা গ্রন্থ, সাহিত্য ও গবেষণা নিয়মিত পুস্তকাকারে প্রকাশ করা পরিষদের অন্যতম প্রধান কাজ। পরিষদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির বাংলা শব্দকোষ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, সংবাদপত্রে সেকালের কথা ও সাহিত্যসাধক চরিতমালা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গবেষণা কাজ ছাড়াও পরিষদ আরও কিছু বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল। প্রাচীন মুদ্রা, প্রস্তরমূর্তি, ধাতুমূর্তি, তাম্রশাসন, প্রাচীন চিত্র, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের ব্যবহূত দ্রব্যাদি, হস্তলিপি পত্র ও দানপত্রাদি, প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র, পান্ডুলিপি (বিখ্যাত লেখকের রচনা) ও প্রাচীন দলিল প্রভৃতি বিভাগসমৃদ্ধ একটি চিত্রশালাও গঠন করা হয়েছে। বহু বছরের চেষ্টার ফলে পরিষদ একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে রয়েছে বেশ কিছু দুর্লভ প্রাচীন পুস্তক। পরিষদের নিজস্ব সঞ্চয়, উপহার প্রাপ্ত ও দানলব্ধ পুস্তকাদি ছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রমেশচন্দ্র দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, বিনয়কৃষ্ণ দেব, ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রেমসুন্দর বসু ও যতীন্দ্রনাথ পালের সাতটি মূল্যবান গ্রন্থ-সংগ্রহ পরিষদ গ্রন্থাগারের অঙ্গীভূত হওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে আরও সমৃদ্ধ। গ্রন্থাগারে পুস্তকের সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও রজনীকান্ত গুপ্তের বিশেষ আগ্রহে প্রাচীন বাংলা ও সংস্কৃত পুথি সংগ্রহের যে চেষ্টা নেওয়া হয়, তারই ফল হিসেবে পরিষদ লাইব্রেরিতে বর্তমানে পুথির সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের একমাত্র পুথি পরিষদে সংরক্ষিত আছে।

গ্রন্থ-প্রকাশ, পদক ও পুরস্কার দান, দুস্থ সাহিত্যিক ভান্ডার গঠন প্রভৃতি সদনুষ্ঠানে সহায়তা করার জন্য অনেক মহানুভব ব্যক্তি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে গচ্ছিত তহবিল (Endowment Funds) স্থাপন করেছেন। পুলিনবিহারী দত্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুস্থ সাহিত্যিক ভান্ডারের আয় হতে বহু দুস্থ সাহিত্যিক পরিবারকে অর্থ সাহায্য করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর মূল পরিচয়—একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। যে ক’টি প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে বাঙালি সারস্বত-চর্চার কথা ভাবা যায় না, তারই অন্যতম এটি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তার জন্মলগ্ন থেকেই বিবিধ বিশিষ্টের চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ হয়েছে, পথ দেখিয়েছে বঙ্গবিদ্যাচর্চাকে। যদিও আমরা এর খোঁজ রাখি না আর। যদুনাথ সরকার ঋণস্বীকারের ভঙ্গিতে তাঁর শিষ্য-সহকর্মী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “আজ যে পরিষদের পুস্তাকাগার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পরই সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণা-সহায়ক কেন্দ্র হইয়াছে—শুধু বাঙ্গলা গ্রন্থ নহে, ইংরেজি ও অন্য কোও কোনও ভাষার উৎকৃষ্ট গ্রন্থে—তাহা ব্রজেন্দ্রনাথের গৃহিণীপনার ফল।”

যখন যখন আত্ম-আবিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে, প্রায় সব জাতির মধ্যেই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের এক বিশিষ্ট চরিত্রলক্ষণ ফুটে ওঠে। বাংলার নবজাগরণও তার ব্যতিক্রম নয়। উনিশ শতকের একেবারে শেষের দিকে, তার মাত্র বছর আষ্টেক আগে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভূমিষ্ঠ হয়েছে, ও দিকে কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হতে বারো বছর দেরি। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আবেগ এই সময়েই আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। যা কিছু বাংলার, যা কিছু বাঙালির, তাকে নিয়ে গর্ব করার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছিল। বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে চর্চার জন্য একটা মঞ্চ দরকার, এ কথা অনেকেই ভাবছিলেন। এক দিকে ইংরেজি, অন্য দিকে সংস্কৃত সাহিত্যের সাহায্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যের উন্নতিই এই সভার উদ্দেশ্য ছিল। সভার কার্যবিবরণী ইংরেজিতে লেখা হত, সভার মুখপত্রেও অধিকাংশ লেখাই থাকত ইংরেজিতে। কিন্তু বাংলা-সাহিত্য চর্চার এই প্রতিষ্ঠানের কাজে ইংরেজি-বহুলতা দেখে অনেকেই আপত্তি তোলেন। তখন উমেশচন্দ্র বটব্যালের প্রস্তাব মেনে সভার নাম বদল করা হয়।

‘বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ লিটারেচার’ শুরুর ছয় মাসের মাথায় উমেশ্চন্দ্র বটব্যাল অসন্তোষ প্রকাশ করলেন, “অপর ভাষায় দেশের লোকের কাছে আত্মপরিচয় দিয়া বেড়াইতে লজ্জাবোধ হয়।” অনেকেই তাঁকে সমর্থন জানালেন। রাজনারায়ণ বসু দাবি জানালেন, পরিষদের সব আলোচনা হবে বাংলা ভাষায়, প্রতিবেদন লেখা হবে বাংলায়। এমনকি বাংলায় আলোচনা চলাকালীন কেউ ইংরেজি ব্যবহার করলে তাঁকে শব্দ পিছু এক পয়সা করে জরিমানা দিতে হবে। বছর পাঁচেকের মধ্যেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের অনুগামী গোষ্ঠীর প্রাধান্য বাড়তে থাকে। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩৫০-র মতো, সভাপতি তখন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ এবং আরও অনেকে চাপ দেন যাতে পরিষদের কার্যালয় বিনয়কৃষ্ণের বাড়ি থেকে অন্য কোনও ‘সাধারণ প্রকাশ্য স্থানে’ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সভায় মতভেদ হয় এবং অনেকে বেরিয়ে চলে যান। শেষে উপস্থিত সদস্যদের ভোটে কার্যালয় সরানোর সিদ্ধান্তই বহাল থাকে এবং এর পরই পরিষৎ উঠে যায় ভাড়া বাড়িতে, আজকের টাউন স্কুলের উত্তরে। অন্য দিকে বিনয়কৃষ্ণের বাড়িতে গড়ে ওঠে ‘সাহিত্য সভা’। বাংলা মুদ্রণের আদি পর্বের বই ও পত্রপত্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগার। বাংলা হরফে প্রথম ছাপা বই হলহেডের বাংলা ব্যাকরণ, প্রথম সচিত্র বাংলা বই ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ প্রথম যুগের বহু দুর্লভ সচিত্র বই, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত বাংলা বই ও পত্রিকা এই সংগ্রহের সম্পদ।

কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর আনুকূল্যে পরিষদের নিজস্ব বাড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয় ১৯০১-এ। আজকের ২৪৩/১ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, সে কালের আপার সার্কুলার রোডের উপর হালসিবাগানে সাত কাঠা জমি পরিষৎকে দান করেন মনীন্দ্রচন্দ্র। চাঁদা তোলা হয় বাড়ি তৈরির জন্য, মোট ২৭ হাজার টাকা খরচের মধ্যে দোতলা তৈরির পুরো দশ হাজার টাকাই দেন লালগোলার মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়। মুর্শিদাবাদেরই শ্রীনাথ পাল দেন আড়াই হাজার বর্গফুট মার্বেল! ১৯০৮-এর ডিসেম্বরে পরিষৎ নিজস্ব বাড়িতে উঠে আসে, গৃহপ্রবেশের দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল আশ্চর্য উন্মাদনা। সমসাময়িক বর্ণনা থেকে জানা যায়, ভিড়ের জন্য দোতলা আর একতলায় দু’টো আলাদা সভা করতে হয়েছিল। বাড়ির ছাদের সামনে পেডিমেন্টটা ছিল মন্দিরের মতো, তাই বহু দিন পর্যন্ত একে পরিষৎ-মন্দির বলে উল্লেখ করা হত। মাঝে কোনও সময় এটি ভেঙে গিয়েছিল, কয়েক বছর আগে সরকারি অর্থানুকূল্যে এবং স্থপতি অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় আবার তাকে যথাসম্ভব আগের চেহারায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন পুরসভার ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকায় প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই ভবনের শতবর্ষ উদযাপনের দিন উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা কয়েকজনের। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে গড়ে ওঠা এই ভবন এক সময় বাঙালির নিজস্ব গৌরবের ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিল। হাজার বছরের বাঙালি মনীষার একটা বড়ো অংশই কোনও না কোনও ভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছেন। নামগুলি দেখলেই বোঝা যায়, এখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ যে শুধু একটি গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত, তা তার আসল পরিচয় নয়।

এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, বাংলা মুদ্রণের আদি পর্বের বই ও পত্রপত্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগার। বাংলা হরফে প্রথম ছাপা বই হলহেডের বাংলা ব্যাকরণ, প্রথম সচিত্র বাংলা বই ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ প্রথম যুগের বহু দুর্লভ সচিত্র বই, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত বাংলা বই ও পত্রিকা এই সংগ্রহের সম্পদ। লক্ষাধিক বই ও পত্রপত্রিকার মধ্যে উনিশ শতকের বাংলা পত্রপত্রিকার এত বড়ো সংগ্রহও আর নেই বললেই চলে। শুধু সাধারণ সংগ্রহই নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিজের লাইব্রেরির অধিকাংশ বইই এখন সাহিত্য পরিষদে ঠাঁই পেয়েছে। গ্রন্থসংগ্রহের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু পরিষদে আছে যা ততটা আলোচিত নয়। ১৯০৮-এ নিজস্ব ভবন তৈরির পর থেকেই বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের উদ্যোগও পরিষৎ-কর্তৃপক্ষের মনে একই ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই সব সংগ্রহে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি বইয়ের সংখ্যাও প্রচুর। বস্তুত বিদ্যাসাগর-রমেশচন্দ্র-রামেন্দ্রসুন্দর সংগ্রহের অধিকাংশই ইংরেজি, আর তার মধ্যে রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য বই। পরেও যতীন পাল সংগ্রহের মতো মূলত ইংরেজি বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহও এসেছে পরিষদে, যার মধ্যে আছে সতেরো শতকে ছাপা মানচিত্রকর জন ওগিলবি-র ‘এশিয়া/ ইন্ডিয়া অ্যান্ড পারসিয়া’ বইটি, যেটি এশিয়াটিক সোসাইটি কয়েক বছর আগে পুনর্মুদ্রণ করেছে। জেমস রেনেল-এর ‘বেঙ্গল অ্যাটলাস’-এর মতো বাংলার মানচিত্রের দুর্লভ বইটিও পরিষৎ সংগ্রহে আছে। আবার বই ছাড়াও পুথির সংগ্রহও কম নয়। বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যকীর্তি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ (এর একটিমাত্র পুথিই বসন্তরঞ্জন রায় খুঁজে পেয়েছিলেন এক গোয়ালঘরের মাচা থেকে!) ছাড়াও বহু বাংলা, সংস্কৃত, এমনকী ওড়িয়া, অসমীয়া ও তিব্বতি পুথিও পরিষদে আছে, যার মোট সংখ্যা হাজার দশেক।

আবার বাঙালি মনীষীদের স্মৃতিরক্ষাও সমান গুরুত্ব পেয়েছিল পরিষদে, তাই মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্রের বিপুল সংগ্রহও গড়ে ওঠে এখানে। স্থাপন করা হয় বিখ্যাত দেশি-বিদেশি ভাস্করের তৈরি করা মূর্তি, শিল্পীদের আঁকা অজস্র প্রতিকৃতি-তৈলচিত্র। এখানে সংগৃহীত তৈলচিত্র ও প্রাচীন আলোকচিত্রগুলি নিয়ে অনায়াসে গড়ে তোলা যায় একটি চিত্রবীথি। বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, ভগিনী নিবেদিতা, তারাশঙ্কর, নির্মলকুমার বসুর মতো ব্যক্তিত্বের পাণ্ডুলিপি ও চিঠিপত্রের সম্ভার এখানে গবেষকদের জন্য অপেক্ষমান। সংগ্রহশালার শতবর্ষ উপলক্ষে নতুন প্রদর্শকক্ষ তৈরি হয়েছে, নতুন করে তৈরি হয়েছে সাহিত্যিক স্মারক কক্ষও। সংগ্রহশালায় সংযোজিত হয়েছে দু’টি নতুন গ্যালারি। একটি বাংলার লোকায়ত শিল্প, অন্যটি বাঙালির দৈনন্দিনের শিল্প। লোকশিল্পের নমুনাগুলি সাজানো হয়েছে মূলত জেলা ধরে, কোথাও বিষয় অনুযায়ী। আর দৈনন্দিনের ব্যবহার্য নানা উপকরণে যে শিল্পের প্রকাশ, পূর্ব ভারতে আর কোনও সংগ্রহশালায় তা এ ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। থালা, গ্লাস, বাটি, হাঁড়ি, কলসি, পানের সাজ, হুঁকো কলকে, বাজনাবাদ্যি, রান্নাবান্না ও পুজোর উপকরণ, মিষ্টির ছাঁচ সবই আছে এখানে। এখানেই রাখা আছে বিহারীলাল চক্রবর্তীর জন্য কাদম্বরী দেবীর হাতে বোনা ‘সাধের আসন’। শুরু হয়েছে পাণ্ডুলিপি ও নথিপত্র তালিকাকরণ, সংরক্ষণের কাজ। সংগ্রহশালা প্রকাশনায় আছে নির্মলকুমার বসুর ‘ভারতের গ্রামজীবন’, হীরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘বাংলার লোকউৎসব ও লোকশিল্প’, ‘পশ্চিমবঙ্গের মন্দির টেরাকোটা’, ‘বাংলা গ্রন্থচিত্রণের আদিপর্ব’, ‘দুর্গা: বাংলার ঐতিহ্যে’, ইত্যাদি।

নানা কারণে পরিষদের অগ্রগতি অনেক দিন শ্লথ হয়ে পড়েছিল, গত এক দশকে আবার অনেকটা সক্রিয়তা ফিরে এসেছে। ভবন দু’টি আমূল সংস্কার করা হয়েছে, পাঠক-গবেষকরা নিয়মিত আসছেন, ডিজিটাইজ করা দুর্লভ বইপত্র কম্পিউটারের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে, সংরক্ষণের কাজ চলছে পুরোদমে, নতুন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে, আলোচনা সভা আয়োজিত হচ্ছে, সংগ্রহশালায় নানা সংযোজন হচ্ছে সব মিলিয়ে বেশ খানিকটা আশার আলো অনেক নিরাশার মধ্যে। উল্লেখ্য, ২০২৫-এ ১৩৩ বছর পূর্ণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

ইতিহাসের এই দিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়

আপডেট সময় ০৫:৪২:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৫

আজকের দিনটি কাল অতীত। তাই প্রতিটি দিনই এক ইতিহাস। আজ ৩০ এপ্রিল ২০২৫, বুধবার। ইতিহাসের এই দিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গঠিত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলা সাহিত্যের উন্নতি এবং প্রসারের উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় উনিশ শতকের শেষ দিক। বাংলায় জন্ম নিচ্ছে বাঙালি জাতিয়তাবাদ। একদিকে সংস্কৃত অন্য দিকে ইংরেজির দাপট। দুইয়ের চাপে দমবন্ধ অবস্থা বাংলা ভাষার। বাংলা সংস্কৃতির অবস্থাটাও ছিল অনেকটা একই রকম। অবস্থাটা পাল্টাতে শুরু হল অন্য রকম ভাবনার মাধ্যমে। বাঙ্গালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির চর্চা এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দরকার পড়ল একটা মঞ্চের। একটা প্রতিষ্ঠানের।

বাংলা ভাষার বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা, অন্যান্য ভাষায় রচিত গ্রন্থের অনুবাদ, দুর্লভ বাংলা রচনা সংরক্ষণ, গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই পরিষদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। উনিশ ও বিশ শতকের প্রায় সব বাঙালি মনীষীই যুক্ত ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গ। উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও প্রসার। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন বিনয়কৃষ্ণ দেব। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ একটি সাহিত্য সংস্থা। এল লিওটার্ড ও ক্ষেত্রপাল চক্রবর্তীর উদ্যোগে ১৮৯৩ সালের ২৩ জুলাই ‘বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার’ নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ রাখা হয়। এর যাত্রা শুরু হয় কলকাতার শোভাবাজারে বিনয়কৃষ্ণ দেব-এর বাসভবনে।

বাংলা সাহিত্যের উন্নতি সাধন ছিল পরিষদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রথম দিকে এর প্রায় সব কাজই ইংরেজিতে সম্পন্ন হতো। এমনকি সভার মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা দি বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার-এর অধিকাংশই লিপিবদ্ধ হতো ইংরেজিতে। এই অসঙ্গতি দূর করার উদ্দেশ্যে উমেশচন্দ্র বটব্যালের প্রস্তাবানুসারে ১৮৯৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পরিষদের সভায় মুখপত্রটি দি বেঙ্গল একাডেমী অব লিটারেচার ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ  এ উভয় নামেই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৮৯৪ সালের ২৯ এপ্রিলের সভায় পরিষদের নামটি ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ হিসেবে সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। এরপর ৩০ এপ্রিল থেকে পরিষদের মুখপত্রটি সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকা হিসেবে বাংলায় প্রকাশিত হতে থাকে।

১৮৯৪ সালে পরিষদের সভাপতি ছিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত, সহ-সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবীনচন্দ্র সেন এবং সম্পাদক ছিলেন এল লিওটার্ড, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। ১৮৯৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পরিষদের নিজস্ব একটি কার্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিষদের কার্যালয় ১৩৭/১ কর্নওয়ালিস স্ট্রীটে একটি ভাড়া বাড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিশ শতকের প্রথম দশকে পরিষদের কলেবর যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে এর সদস্য সংখ্যা ৫২৩-এ উন্নীত হয়। প্রখ্যাত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবীনচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত গুপ্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, দেবেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, অমৃতকৃষ্ণ মল্লিক, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ও দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু। ১৯০৬ সালে পরিষদের এক বিশেষ অধিবেশনে কলকাতার বাইরে পরিষদের শাখা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর পরপরই রংপুরে একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। কালক্রমে বাংলার বিভিন্ন জেলা শহরে এবং বাংলার বাইরেও ৩০টি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। চারুচন্দ্র ঘোষ, রজনীকান্ত গুপ্ত, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ও নগেন্দ্রনাথ বসু পরিষদের নিজ বাসগৃহ নির্মাণের জন্য কাসিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর স্মরণাপন্ন হন। তিনি হালশীবাগানে সাত কাঠা জায়গা পরিষদকে দান করেন। ১৯০৯ সালের শেষদিকে পরিষদ স্থায়ী কার্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়।

বান্ধব, বিশিষ্ট, আজীবন, সহায়ক ও সাধারণ পরিষদে এই পাঁচ ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। যেকোন ব্যক্তি পরিষদের সাধারণ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেন।

বাংলা ভাষায় নানা বিষয়ের গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা করে পরিষদ বিদ্বৎসমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। সংস্কৃত, আরবি ও ইংরেজি ভাষা হতে বহু গ্রন্থ অনুবাদ ও প্রকাশ করা এবং দুষ্প্রাপ্য বাংলা গ্রন্থ, সাহিত্য ও গবেষণা নিয়মিত পুস্তকাকারে প্রকাশ করা পরিষদের অন্যতম প্রধান কাজ। পরিষদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলির মধ্যে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির বাংলা শব্দকোষ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, সংবাদপত্রে সেকালের কথা ও সাহিত্যসাধক চরিতমালা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গবেষণা কাজ ছাড়াও পরিষদ আরও কিছু বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল। প্রাচীন মুদ্রা, প্রস্তরমূর্তি, ধাতুমূর্তি, তাম্রশাসন, প্রাচীন চিত্র, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের ব্যবহূত দ্রব্যাদি, হস্তলিপি পত্র ও দানপত্রাদি, প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র, পান্ডুলিপি (বিখ্যাত লেখকের রচনা) ও প্রাচীন দলিল প্রভৃতি বিভাগসমৃদ্ধ একটি চিত্রশালাও গঠন করা হয়েছে। বহু বছরের চেষ্টার ফলে পরিষদ একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে রয়েছে বেশ কিছু দুর্লভ প্রাচীন পুস্তক। পরিষদের নিজস্ব সঞ্চয়, উপহার প্রাপ্ত ও দানলব্ধ পুস্তকাদি ছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রমেশচন্দ্র দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, বিনয়কৃষ্ণ দেব, ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রেমসুন্দর বসু ও যতীন্দ্রনাথ পালের সাতটি মূল্যবান গ্রন্থ-সংগ্রহ পরিষদ গ্রন্থাগারের অঙ্গীভূত হওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে আরও সমৃদ্ধ। গ্রন্থাগারে পুস্তকের সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও রজনীকান্ত গুপ্তের বিশেষ আগ্রহে প্রাচীন বাংলা ও সংস্কৃত পুথি সংগ্রহের যে চেষ্টা নেওয়া হয়, তারই ফল হিসেবে পরিষদ লাইব্রেরিতে বর্তমানে পুথির সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের একমাত্র পুথি পরিষদে সংরক্ষিত আছে।

গ্রন্থ-প্রকাশ, পদক ও পুরস্কার দান, দুস্থ সাহিত্যিক ভান্ডার গঠন প্রভৃতি সদনুষ্ঠানে সহায়তা করার জন্য অনেক মহানুভব ব্যক্তি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে গচ্ছিত তহবিল (Endowment Funds) স্থাপন করেছেন। পুলিনবিহারী দত্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দুস্থ সাহিত্যিক ভান্ডারের আয় হতে বহু দুস্থ সাহিত্যিক পরিবারকে অর্থ সাহায্য করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর মূল পরিচয়—একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। যে ক’টি প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে বাঙালি সারস্বত-চর্চার কথা ভাবা যায় না, তারই অন্যতম এটি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তার জন্মলগ্ন থেকেই বিবিধ বিশিষ্টের চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ হয়েছে, পথ দেখিয়েছে বঙ্গবিদ্যাচর্চাকে। যদিও আমরা এর খোঁজ রাখি না আর। যদুনাথ সরকার ঋণস্বীকারের ভঙ্গিতে তাঁর শিষ্য-সহকর্মী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “আজ যে পরিষদের পুস্তাকাগার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পরই সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণা-সহায়ক কেন্দ্র হইয়াছে—শুধু বাঙ্গলা গ্রন্থ নহে, ইংরেজি ও অন্য কোও কোনও ভাষার উৎকৃষ্ট গ্রন্থে—তাহা ব্রজেন্দ্রনাথের গৃহিণীপনার ফল।”

যখন যখন আত্ম-আবিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে, প্রায় সব জাতির মধ্যেই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের এক বিশিষ্ট চরিত্রলক্ষণ ফুটে ওঠে। বাংলার নবজাগরণও তার ব্যতিক্রম নয়। উনিশ শতকের একেবারে শেষের দিকে, তার মাত্র বছর আষ্টেক আগে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভূমিষ্ঠ হয়েছে, ও দিকে কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হতে বারো বছর দেরি। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আবেগ এই সময়েই আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। যা কিছু বাংলার, যা কিছু বাঙালির, তাকে নিয়ে গর্ব করার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছিল। বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে চর্চার জন্য একটা মঞ্চ দরকার, এ কথা অনেকেই ভাবছিলেন। এক দিকে ইংরেজি, অন্য দিকে সংস্কৃত সাহিত্যের সাহায্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যের উন্নতিই এই সভার উদ্দেশ্য ছিল। সভার কার্যবিবরণী ইংরেজিতে লেখা হত, সভার মুখপত্রেও অধিকাংশ লেখাই থাকত ইংরেজিতে। কিন্তু বাংলা-সাহিত্য চর্চার এই প্রতিষ্ঠানের কাজে ইংরেজি-বহুলতা দেখে অনেকেই আপত্তি তোলেন। তখন উমেশচন্দ্র বটব্যালের প্রস্তাব মেনে সভার নাম বদল করা হয়।

‘বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ লিটারেচার’ শুরুর ছয় মাসের মাথায় উমেশ্চন্দ্র বটব্যাল অসন্তোষ প্রকাশ করলেন, “অপর ভাষায় দেশের লোকের কাছে আত্মপরিচয় দিয়া বেড়াইতে লজ্জাবোধ হয়।” অনেকেই তাঁকে সমর্থন জানালেন। রাজনারায়ণ বসু দাবি জানালেন, পরিষদের সব আলোচনা হবে বাংলা ভাষায়, প্রতিবেদন লেখা হবে বাংলায়। এমনকি বাংলায় আলোচনা চলাকালীন কেউ ইংরেজি ব্যবহার করলে তাঁকে শব্দ পিছু এক পয়সা করে জরিমানা দিতে হবে। বছর পাঁচেকের মধ্যেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের অনুগামী গোষ্ঠীর প্রাধান্য বাড়তে থাকে। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩৫০-র মতো, সভাপতি তখন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ এবং আরও অনেকে চাপ দেন যাতে পরিষদের কার্যালয় বিনয়কৃষ্ণের বাড়ি থেকে অন্য কোনও ‘সাধারণ প্রকাশ্য স্থানে’ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সভায় মতভেদ হয় এবং অনেকে বেরিয়ে চলে যান। শেষে উপস্থিত সদস্যদের ভোটে কার্যালয় সরানোর সিদ্ধান্তই বহাল থাকে এবং এর পরই পরিষৎ উঠে যায় ভাড়া বাড়িতে, আজকের টাউন স্কুলের উত্তরে। অন্য দিকে বিনয়কৃষ্ণের বাড়িতে গড়ে ওঠে ‘সাহিত্য সভা’। বাংলা মুদ্রণের আদি পর্বের বই ও পত্রপত্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগার। বাংলা হরফে প্রথম ছাপা বই হলহেডের বাংলা ব্যাকরণ, প্রথম সচিত্র বাংলা বই ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ প্রথম যুগের বহু দুর্লভ সচিত্র বই, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত বাংলা বই ও পত্রিকা এই সংগ্রহের সম্পদ।

কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর আনুকূল্যে পরিষদের নিজস্ব বাড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয় ১৯০১-এ। আজকের ২৪৩/১ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, সে কালের আপার সার্কুলার রোডের উপর হালসিবাগানে সাত কাঠা জমি পরিষৎকে দান করেন মনীন্দ্রচন্দ্র। চাঁদা তোলা হয় বাড়ি তৈরির জন্য, মোট ২৭ হাজার টাকা খরচের মধ্যে দোতলা তৈরির পুরো দশ হাজার টাকাই দেন লালগোলার মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়। মুর্শিদাবাদেরই শ্রীনাথ পাল দেন আড়াই হাজার বর্গফুট মার্বেল! ১৯০৮-এর ডিসেম্বরে পরিষৎ নিজস্ব বাড়িতে উঠে আসে, গৃহপ্রবেশের দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল আশ্চর্য উন্মাদনা। সমসাময়িক বর্ণনা থেকে জানা যায়, ভিড়ের জন্য দোতলা আর একতলায় দু’টো আলাদা সভা করতে হয়েছিল। বাড়ির ছাদের সামনে পেডিমেন্টটা ছিল মন্দিরের মতো, তাই বহু দিন পর্যন্ত একে পরিষৎ-মন্দির বলে উল্লেখ করা হত। মাঝে কোনও সময় এটি ভেঙে গিয়েছিল, কয়েক বছর আগে সরকারি অর্থানুকূল্যে এবং স্থপতি অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় আবার তাকে যথাসম্ভব আগের চেহারায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন পুরসভার ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকায় প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই ভবনের শতবর্ষ উদযাপনের দিন উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা কয়েকজনের। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে গড়ে ওঠা এই ভবন এক সময় বাঙালির নিজস্ব গৌরবের ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিল। হাজার বছরের বাঙালি মনীষার একটা বড়ো অংশই কোনও না কোনও ভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছেন। নামগুলি দেখলেই বোঝা যায়, এখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ যে শুধু একটি গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত, তা তার আসল পরিচয় নয়।

এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, বাংলা মুদ্রণের আদি পর্বের বই ও পত্রপত্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগার। বাংলা হরফে প্রথম ছাপা বই হলহেডের বাংলা ব্যাকরণ, প্রথম সচিত্র বাংলা বই ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ প্রথম যুগের বহু দুর্লভ সচিত্র বই, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত বাংলা বই ও পত্রিকা এই সংগ্রহের সম্পদ। লক্ষাধিক বই ও পত্রপত্রিকার মধ্যে উনিশ শতকের বাংলা পত্রপত্রিকার এত বড়ো সংগ্রহও আর নেই বললেই চলে। শুধু সাধারণ সংগ্রহই নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিজের লাইব্রেরির অধিকাংশ বইই এখন সাহিত্য পরিষদে ঠাঁই পেয়েছে। গ্রন্থসংগ্রহের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু পরিষদে আছে যা ততটা আলোচিত নয়। ১৯০৮-এ নিজস্ব ভবন তৈরির পর থেকেই বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের উদ্যোগও পরিষৎ-কর্তৃপক্ষের মনে একই ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই সব সংগ্রহে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি বইয়ের সংখ্যাও প্রচুর। বস্তুত বিদ্যাসাগর-রমেশচন্দ্র-রামেন্দ্রসুন্দর সংগ্রহের অধিকাংশই ইংরেজি, আর তার মধ্যে রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য বই। পরেও যতীন পাল সংগ্রহের মতো মূলত ইংরেজি বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহও এসেছে পরিষদে, যার মধ্যে আছে সতেরো শতকে ছাপা মানচিত্রকর জন ওগিলবি-র ‘এশিয়া/ ইন্ডিয়া অ্যান্ড পারসিয়া’ বইটি, যেটি এশিয়াটিক সোসাইটি কয়েক বছর আগে পুনর্মুদ্রণ করেছে। জেমস রেনেল-এর ‘বেঙ্গল অ্যাটলাস’-এর মতো বাংলার মানচিত্রের দুর্লভ বইটিও পরিষৎ সংগ্রহে আছে। আবার বই ছাড়াও পুথির সংগ্রহও কম নয়। বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যকীর্তি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ (এর একটিমাত্র পুথিই বসন্তরঞ্জন রায় খুঁজে পেয়েছিলেন এক গোয়ালঘরের মাচা থেকে!) ছাড়াও বহু বাংলা, সংস্কৃত, এমনকী ওড়িয়া, অসমীয়া ও তিব্বতি পুথিও পরিষদে আছে, যার মোট সংখ্যা হাজার দশেক।

আবার বাঙালি মনীষীদের স্মৃতিরক্ষাও সমান গুরুত্ব পেয়েছিল পরিষদে, তাই মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্রের বিপুল সংগ্রহও গড়ে ওঠে এখানে। স্থাপন করা হয় বিখ্যাত দেশি-বিদেশি ভাস্করের তৈরি করা মূর্তি, শিল্পীদের আঁকা অজস্র প্রতিকৃতি-তৈলচিত্র। এখানে সংগৃহীত তৈলচিত্র ও প্রাচীন আলোকচিত্রগুলি নিয়ে অনায়াসে গড়ে তোলা যায় একটি চিত্রবীথি। বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, ভগিনী নিবেদিতা, তারাশঙ্কর, নির্মলকুমার বসুর মতো ব্যক্তিত্বের পাণ্ডুলিপি ও চিঠিপত্রের সম্ভার এখানে গবেষকদের জন্য অপেক্ষমান। সংগ্রহশালার শতবর্ষ উপলক্ষে নতুন প্রদর্শকক্ষ তৈরি হয়েছে, নতুন করে তৈরি হয়েছে সাহিত্যিক স্মারক কক্ষও। সংগ্রহশালায় সংযোজিত হয়েছে দু’টি নতুন গ্যালারি। একটি বাংলার লোকায়ত শিল্প, অন্যটি বাঙালির দৈনন্দিনের শিল্প। লোকশিল্পের নমুনাগুলি সাজানো হয়েছে মূলত জেলা ধরে, কোথাও বিষয় অনুযায়ী। আর দৈনন্দিনের ব্যবহার্য নানা উপকরণে যে শিল্পের প্রকাশ, পূর্ব ভারতে আর কোনও সংগ্রহশালায় তা এ ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। থালা, গ্লাস, বাটি, হাঁড়ি, কলসি, পানের সাজ, হুঁকো কলকে, বাজনাবাদ্যি, রান্নাবান্না ও পুজোর উপকরণ, মিষ্টির ছাঁচ সবই আছে এখানে। এখানেই রাখা আছে বিহারীলাল চক্রবর্তীর জন্য কাদম্বরী দেবীর হাতে বোনা ‘সাধের আসন’। শুরু হয়েছে পাণ্ডুলিপি ও নথিপত্র তালিকাকরণ, সংরক্ষণের কাজ। সংগ্রহশালা প্রকাশনায় আছে নির্মলকুমার বসুর ‘ভারতের গ্রামজীবন’, হীরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘বাংলার লোকউৎসব ও লোকশিল্প’, ‘পশ্চিমবঙ্গের মন্দির টেরাকোটা’, ‘বাংলা গ্রন্থচিত্রণের আদিপর্ব’, ‘দুর্গা: বাংলার ঐতিহ্যে’, ইত্যাদি।

নানা কারণে পরিষদের অগ্রগতি অনেক দিন শ্লথ হয়ে পড়েছিল, গত এক দশকে আবার অনেকটা সক্রিয়তা ফিরে এসেছে। ভবন দু’টি আমূল সংস্কার করা হয়েছে, পাঠক-গবেষকরা নিয়মিত আসছেন, ডিজিটাইজ করা দুর্লভ বইপত্র কম্পিউটারের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে, সংরক্ষণের কাজ চলছে পুরোদমে, নতুন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে, আলোচনা সভা আয়োজিত হচ্ছে, সংগ্রহশালায় নানা সংযোজন হচ্ছে সব মিলিয়ে বেশ খানিকটা আশার আলো অনেক নিরাশার মধ্যে। উল্লেখ্য, ২০২৫-এ ১৩৩ বছর পূর্ণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।