যে গ্রামে মেয়ে জন্মালেই ১১১ গাছ লাগানো হয়

যে গ্রামে মেয়ে জন্মালেই ১১১ গাছ লাগানো হয়

আধুনিক সময়ে শিক্ষা-প্রযুক্তি, ব্যবসা সহ অনেক দিক দিয়েই এগিয়েছে ভারত। তবে এখনও ১৪৫ কোটি মানুষের দেশটির অনেক জায়গায় কন্যাশিশু কাঙ্ক্ষিত নয়, অনেক এলাকায় সদ্য ভূমিষ্ঠ মেয়ে শিশু হত্যা কিংবা ভ্রুণ অবস্থাতেই গর্ভপাত দুঃখজনক বাস্তব। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০০০-২০১৯ সালের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৯০ লাখ কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই ভারতেই আবার অনন্য এক নজীর স্থাপন করেছে একটি গ্রাম, যেখানে মেয়ে শিশুর জন্ম হলেই রোপণ করা হয় ১১১টি গাছ! রাজস্থানের রাজসমন্দ জেলার পিপলান্ত্রি গ্রামের বাসিন্দারা তৈরি করেছেন এই রেওয়াজ। গ্রামবাসীর এই দারুণ রেওয়াজকে স্বাগত জানিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্টও।

এই রেওয়াজের নাম দেওয়া হয়েছে পিপলান্ত্রি মডেল। ১৫ বছর আগে এই রেওয়াজ চালু করেছিলেন গ্রামের তৎকালীন প্রধান শ্যামসুন্দর পালিওয়াল। তার মেয়ে কিরণ পানিশূন্যতাজনিত কারণে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই প্রয়াত হন। কন্যাহারা বাবা মেয়ের স্মৃতিরক্ষায় একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এরপর তার মাথায় আসে এই কাজটি তো আরও বিস্তৃত করা যায়।

মেয়ের স্মৃতিরক্ষায় এক বাবার উদ্যোগ এখন পরিচিত বিশ্বজুড়ে

তিনি তার পরিবার এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের সাথে এই ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। সবাই তার সঙ্গে একমত হয়। প্রতিটি মেয়ে শিশুর জন্মের পর নবজাতক, মা ও বাবার অর্থাৎ তিনজনের নামে তিনটি করে চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে, এটি ১১১ (১+১+১) হয়ে ওঠে, তাদের ধারণামতে ১১১ একটি শুভ সংখ্যাও।

ব্যস সেই থেকে পিপলান্ত্রি রীতি চালু হয় যা আজ ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বেও পরিবেশ ও নারীর সুরক্ষায় চমৎকার এক উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসিত।

বড় এলাকাজুড়ে এরকম গাছগাছালির বন স্যাকরেড গ্রোভ বা পবিত্র বলে বিবেচিত হয় এবং ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা সুরক্ষিত থাকে।

সম্প্রতি বিচারপতি বিআর গাভাই, বিচারপতি এসভিএন ভাট্টি এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ রাজস্থানের ‘স্যাক্রেড গ্রোভ’ রক্ষার বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

পরিবেশ রক্ষায় রাজ্যের বন দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এলাকায় যেন উপগ্রহ মারফত নজরদারি চালিয়ে অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করা হয়। আর সেই প্রসঙ্গেই শীর্ষ আদালতে উঠে আসে পিপলান্ত্রি মডেল প্রসঙ্গ।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সন্দীপ মেহতা বলেন, রাজস্থানের একটি এলাকায় যে মডেল রয়েছে তা অনুপ্রেরণাদায়ক। মার্বেল পাথরের জন্য ব্যাপক খননের ফলে গ্রামটির পরিবেশ বিপণ্ণ হয়।

কিন্তু প্রত্যেক কন্যাসন্তানের জন্মের পরই ১১১টি করে গাছ লাগানোর রীতি এলাকাটির রুক্ষ প্রকৃতিতে নিয়ে এসেছে সবুজ সজীবতা। কারণ এই রীতির কারণে এখন পর্যন্ত ১৪ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। চমৎকার এক সবুজ উদ্যোগের ফলে পিপলান্ত্রির চেহারাই বদলে গেছে। আগে যেখানটা ছিল রাজস্থানের খরাময় চেহারার সেখানটা এখন সবুজ-শ্যামল উদ্যান।

পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে এই উদ্যোগ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনও এনেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিপলান্ত্রি এমন একটি গ্রাম যেখানে বালকদের চেয়ে স্কুলগামী বালিকার সংখ্যা বেশি। ভারতের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর বাস্তবতায় এই তথ্য সত্যিই আশাজাগানিয়া।

তাই এরকম বনায়ন রক্ষায় ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী রাজস্থান সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আর তা নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের নজরদারিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গড়ার কথাও বলা হয়েছে।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

যে গ্রামে মেয়ে জন্মালেই ১১১ গাছ লাগানো হয়

আপডেট সময় ০৩:০০:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪

আধুনিক সময়ে শিক্ষা-প্রযুক্তি, ব্যবসা সহ অনেক দিক দিয়েই এগিয়েছে ভারত। তবে এখনও ১৪৫ কোটি মানুষের দেশটির অনেক জায়গায় কন্যাশিশু কাঙ্ক্ষিত নয়, অনেক এলাকায় সদ্য ভূমিষ্ঠ মেয়ে শিশু হত্যা কিংবা ভ্রুণ অবস্থাতেই গর্ভপাত দুঃখজনক বাস্তব। সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০০০-২০১৯ সালের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৯০ লাখ কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই ভারতেই আবার অনন্য এক নজীর স্থাপন করেছে একটি গ্রাম, যেখানে মেয়ে শিশুর জন্ম হলেই রোপণ করা হয় ১১১টি গাছ! রাজস্থানের রাজসমন্দ জেলার পিপলান্ত্রি গ্রামের বাসিন্দারা তৈরি করেছেন এই রেওয়াজ। গ্রামবাসীর এই দারুণ রেওয়াজকে স্বাগত জানিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্টও।

এই রেওয়াজের নাম দেওয়া হয়েছে পিপলান্ত্রি মডেল। ১৫ বছর আগে এই রেওয়াজ চালু করেছিলেন গ্রামের তৎকালীন প্রধান শ্যামসুন্দর পালিওয়াল। তার মেয়ে কিরণ পানিশূন্যতাজনিত কারণে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই প্রয়াত হন। কন্যাহারা বাবা মেয়ের স্মৃতিরক্ষায় একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এরপর তার মাথায় আসে এই কাজটি তো আরও বিস্তৃত করা যায়।

মেয়ের স্মৃতিরক্ষায় এক বাবার উদ্যোগ এখন পরিচিত বিশ্বজুড়ে

তিনি তার পরিবার এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের সাথে এই ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। সবাই তার সঙ্গে একমত হয়। প্রতিটি মেয়ে শিশুর জন্মের পর নবজাতক, মা ও বাবার অর্থাৎ তিনজনের নামে তিনটি করে চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে, এটি ১১১ (১+১+১) হয়ে ওঠে, তাদের ধারণামতে ১১১ একটি শুভ সংখ্যাও।

ব্যস সেই থেকে পিপলান্ত্রি রীতি চালু হয় যা আজ ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বেও পরিবেশ ও নারীর সুরক্ষায় চমৎকার এক উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসিত।

বড় এলাকাজুড়ে এরকম গাছগাছালির বন স্যাকরেড গ্রোভ বা পবিত্র বলে বিবেচিত হয় এবং ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা সুরক্ষিত থাকে।

সম্প্রতি বিচারপতি বিআর গাভাই, বিচারপতি এসভিএন ভাট্টি এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ রাজস্থানের ‘স্যাক্রেড গ্রোভ’ রক্ষার বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

পরিবেশ রক্ষায় রাজ্যের বন দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এলাকায় যেন উপগ্রহ মারফত নজরদারি চালিয়ে অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করা হয়। আর সেই প্রসঙ্গেই শীর্ষ আদালতে উঠে আসে পিপলান্ত্রি মডেল প্রসঙ্গ।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সন্দীপ মেহতা বলেন, রাজস্থানের একটি এলাকায় যে মডেল রয়েছে তা অনুপ্রেরণাদায়ক। মার্বেল পাথরের জন্য ব্যাপক খননের ফলে গ্রামটির পরিবেশ বিপণ্ণ হয়।

কিন্তু প্রত্যেক কন্যাসন্তানের জন্মের পরই ১১১টি করে গাছ লাগানোর রীতি এলাকাটির রুক্ষ প্রকৃতিতে নিয়ে এসেছে সবুজ সজীবতা। কারণ এই রীতির কারণে এখন পর্যন্ত ১৪ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। চমৎকার এক সবুজ উদ্যোগের ফলে পিপলান্ত্রির চেহারাই বদলে গেছে। আগে যেখানটা ছিল রাজস্থানের খরাময় চেহারার সেখানটা এখন সবুজ-শ্যামল উদ্যান।

পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে এই উদ্যোগ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনও এনেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিপলান্ত্রি এমন একটি গ্রাম যেখানে বালকদের চেয়ে স্কুলগামী বালিকার সংখ্যা বেশি। ভারতের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোর বাস্তবতায় এই তথ্য সত্যিই আশাজাগানিয়া।

তাই এরকম বনায়ন রক্ষায় ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী রাজস্থান সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আর তা নিশ্চিত করতে হাইকোর্টের নজরদারিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গড়ার কথাও বলা হয়েছে।