আজ ৬ আগস্ট, জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলার দিন। ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত এক দিন। বিশ্বে প্রথমবার পারমাণবিক বোমা সরাসরি মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের লিটল বয় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। পরে, তেজস্ক্রিয়তাজনিত অসুস্থতা, পোড়া এবং পানিশূন্যতার মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৪০ হাজার।
কিন্তু ভয়াবহ ওই বোমা হামলার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে হিরোশিমার পরিবেশে, কার্যত মানবতা ধ্বংসের সঙ্গে ধ্বংস হয় হিরোশিমার পরিবেশ-প্রকৃতিও।
হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং জটিল। এই হামলার ফলে তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি এমন কিছু দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রভাব বিস্তার করছে।

পারমাণবিক বোমার বিকিরণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশের ইকোসিস্টেম। বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড তাপ এবং চাপ সেখানকার সব উদ্ভিদ ও প্রাণী ধ্বংস করে দিয়েছিল। স্থানীয় নদী ও জলের উৎসগুলো ছাই এবং বিষাক্ত পদার্থে দূষিত হয়ে পড়েছিল, যার ফলে জলজ প্রাণীদের জীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এই দূষণ কয়েক দশক ধরে মাটির উর্বরতা নষ্ট করেছে, যা কৃষিকাজকে কঠিন করে তুলেছিল।
বোমা বিস্ফোরণের ফলে বাতাসে বিপুল পরিমাণ ধুলো এবং ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ধোঁয়া সাময়িকভাবে স্থানীয় আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল এবং বৃষ্টিপাতের সঙ্গে তেজস্ক্রিয় কণা মিশে ব্ল্যাক রেইন নামে এক ধরনের বিষাক্ত বৃষ্টি তৈরি হয়েছিল। এই বৃষ্টি আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে দিয়েছিল, যা অনেক মানুষকে অসুস্থ করে তোলে।

১. তেজস্ক্রিয় দূষণ:
বোমা বিস্ফোরণের ফলে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এবং প্লুটোনিয়াম-২৩৯-এর মতো তেজস্ক্রিয় কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মাটি, পানি ও বাতাসকে দূষিত করে তোলে। এটি দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশে বিদ্যমান থাকে, যা কয়েক দশক ধরে বিশাল এলাকাকে বসবাসের জন্য অযোগ্য করে তুলতে পারতো। হিরোশিমার মতো একটি শহরে বিস্ফোরণের পর বহু বছর ধরে বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এর ফলে সেই সময়ে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ক্যান্সার, জন্মগত ত্রুটি এবং অন্যান্য বিকিরণ-সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
২. বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস:
পারমাণবিক বিস্ফোরণের তীব্র তাপ (প্রায় ৪০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত) এবং শক ওয়েভ আশেপাশের এলাকার সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দেয়। বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থলের প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে যা কিছু ছিল, সবই প্রায় পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় নদী ও জলের উৎসগুলো ছাই এবং বিষাক্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ দ্বারা দূষিত হয়ে পড়ে, যার ফলে জলজ জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

৩. স্থানীয় জলবায়ুর পরিবর্তন:
পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে ধুলো এবং ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা একটি বিশাল মাশরুম মেঘ তৈরি করে। এই ধোঁয়া এবং ধুলোর আস্তরণ সাময়িকভাবে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দেয়, ফলে তাপমাত্রা হ্রাস পায়। যদিও হিরোশিমায় এই প্রভাব একটি বৃহৎ আকারের পারমাণবিক যুদ্ধের তুলনায় সীমিত ছিল, তবে এটি স্থানীয় জলবায়ুতে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।
৪. কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব:
তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে সেখানকার মাটিতে কৃষিকাজ করা বহু বছর ধরে কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তেজস্ক্রিয় কণার দ্বারা মাটি দূষিত হওয়ায় ফসল ও গবাদি পশুর দূষিত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। এর ফলে দীর্ঘকাল ধরে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

৫. জিনগত পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি:
তীব্র পারমাণবিক বিকিরণের কারণে মানুষের ডিএনএ-তে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা, বিকলাঙ্গতা, এবং জন্মগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। হিরোশিমার বোমা হামলায় বেঁচে যাওয়া মানুষরা (যাদের জাপানে ‘হিবাকুশা’ বলা হয়) এখনো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার। এর প্রভাবে অনেক শিশুর মধ্যে বিকলাঙ্গতা এবং জিনগত সমস্যা দেখা গেছে, যা পারমাণবিক বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের একটি বাস্তব উদাহরণ।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















