২০২২ এবং ২০২৩ সালে সৌদি আরবের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওয়াইল্ডলাইফের বিজ্ঞানীরা যখন বন্যপ্রাণীর সন্ধানে গুহাগুলোতে জরিপ চালাচ্ছিলেন, তখন তারা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি বিষয়ের মুখোমুখি হন। উত্তরাঞ্চলীয় শহর আরারের কাছে পাঁচটি গুহায় প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে যাওয়া সাতটি চিতার দেহাবশেষ খুঁজে পান তারা। দেহাবশেষগুলো ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে অক্ষত; নরম টিস্যু ও কঙ্কালগুলো খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল।
গবেষকরা বলছেন, এখন এই মমিগুলোর তিনটির ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে এমন কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে যা আরব উপদ্বীপের বন্য পরিবেশে আবারও চিতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সৌদি আরবে কেবল এশীয় চিতারই বিচরণ ছিল বলে আগে যে ধারণা করা হতো, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। উদ্ধার হওয়া মমির ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা গেছে, আরবের মরুভূমিতে একসময় উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকান চিতারও অবাধ বিচরণ ছিল।

চিতা একসময় আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশে বাস করত। কিন্তু এখন তাদের ঐতিহাসিক বিচরণস্থলের মাত্র ৯ শতাংশ এলাকায় তাদের পাওয়া যায়। এর আগে বিশ্বাস করা হতো যে, এশীয় চিতা (যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে অ্যাকিনোনিক্স জুবাটাস ভেনাটিকাস বলা হয়) ছিল একমাত্র উপপ্রজাতি যা সৌদি আরবে বিচরণ করতো। এই প্রজাতিটি এখন চরমভাবে বিপন্ন, যার একটি ছোট বন্য জনসংখ্যা বর্তমানে ইরানে টিকে আছে। পুরো আরব্য উপদ্বীপ জুড়ে ১৯৭০-এর দশকে চিতাকে স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত বলে গণ্য করা হয়েছিল।
কিন্তু গবেষকরা যখন তিনটি মমির জিনগত বিশ্লেষণ করেন, তখন তারা দেখেন যে সবচেয়ে পুরোনো দুটি নমুনা জিনগতভাবে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকান চিতা হিসেবে পরিচিত অ্যাকিনোনিক্স জুবাটাস হেকি উপপ্রজাতির কাছাকাছি।
গত জানুয়ারিতে ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত এই ফলাফলগুলো প্রকাশ করেছে যে, অন্তত দুটি উপপ্রজাতির চিতা একসময় আরব্য উপদ্বীপে বিচরণ করত। আরব উপদ্বীপ একসময় চিতার বিভিন্ন প্রজাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করত। এটি কেবল তাদের যাতায়াতের পথ ছিল না, বরং হাজার হাজার বছর ধরে তারা এখানে বংশবৃদ্ধি করে টিকে ছিল।

গবেষক দলের প্রধান আহমেদ আল বৌগ জানিয়েছেন, চিতা সাধারণত গুহা ব্যবহার করে না, তাই তাদের এই আচরণ বিজ্ঞানীদের অবাক করেছে। গবেষকরা ধারণা করছেন, অতিরিক্ত শুষ্ক আবহাওয়া এই চিতাগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে মমি হতে সাহায্য করেছে। এই গুহাগুলো থেকে ৫৪টি বিড়ালজাতীয় প্রাণীর কঙ্কালও উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনোটি প্রায় ৪ হাজার বছরের প্রাচীন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কিছু মমি মাত্র একশ বছরের পুরোনো, যার অর্থ হলো মানুষ আগে যা ভাবত তারচেয়েও অনেক বেশি সময় পর্যন্ত চিতা এই অঞ্চলে টিকে ছিল।
এই আবিষ্কারটি চিতা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষক আদ্রিয়ান টরডিফ মনে করেন, এই ডিএনএ তথ্যের ফলে এখন জানা সম্ভব হয়েছে যে ঠিক কোন প্রজাতির চিতা এই অঞ্চলের পরিবেশের জন্য উপযুক্ত। ফলে অন্য কোনো দূরবর্তী পরিবেশ থেকে চিতা না এনে ঐতিহাসিকভাবে এই মাটিতে বাস করা প্রজাতির কাছাকাছি চিতা দিয়েই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। বর্তমানে সৌদি আরবের বিশাল সংরক্ষিত এলাকাগুলো চিতার আদি শত্রু এবং মানুষের উৎপাত থেকে মুক্ত থাকায় এই পুনর্বাসন পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। চিতা ফিরে এলে মরুভূমির বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য আবার পূর্ণতা পাবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















