বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। এর মধ্যে একটি সম্প্রদায় হচ্ছে বেদে সম্প্রদায়, বাংলাদেশের একটি বিস্ময়কর পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠী। তাদের জীবন কাটে নৌকায় এবং জীবনযাপন, আচার-আচরণ সবই চলে ভিন্ন রীতিতে। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব যেখানে অসীম, সেখানে খুব সামান্য অনুষঙ্গ নিয়ে নৌকা কেন্দ্রিক গোটা জীবন কাটিয়ে দেয় এই সম্প্রদায়ের একাংশ!
বেদেরা বাংলাদেশের অতি পরিচিত প্রান্তিক যাযাবর গোষ্ঠী। ভূমিহীন এই মানুষেরা দলবদ্ধভাবে নৌকাতে বাস করে দীর্ঘদিন যাবৎ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের বসবাস। বিশেষ করে নদীর পাড়ে বা পতিত উঁচু কোন জায়গায় তাদের অস্থায়ী আবাস গড়ে ওঠে ।

এমনই এক বেদে পল্লীর দেখা মিলল বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার মীরগঞ্জ পশ্চিম ফেরিঘাটের পাশে। শিশুরা নদীর পাশে উঁচু একটি মাঠে খেলছিল, পাশেই নদীতে সারি সারি নৌকা বাঁধা। সেখানে গিয়ে জানতে ইচ্ছা হয় তাদের কথা।
কথায়-কথায় ভাব হয় তাদের অনেকের সাথেই, তারা বলেন, বেদেরা পেশা ও জীবিকার বৈচিত্রের ভিত্তিতে বিভিন্ন বংশ-গোত্রে বিভক্ত। বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা মোট নয়টি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হলো- লাউয়ো, চাপাইলা, বাজিকর, বেজ, গাইন, মেল্লছ, বান্দাইরা, মাল ও সাপুড়িয়া।

সর্দার জানান, আমাদের এই পল্লীতে বেশিভাগ লোকেরা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে পর্যায়ক্রমে মাছ ধরা। সকালে কিংবা সন্ধ্যায় তারা পাশের একটি বাজারে মাছ বিক্রি করে। সেই টাকায় নিজেদের প্রয়োজনীয় বাজার নিয়ে চলে আসে নৌকায় এরপর হয় রান্না ও খাওয়া । বর্তমানে নদীতে মাছ কম পাওয়ায় তারা দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা রোজগার করতে পারেন। যা আয় হয়, তাতে কী সঞ্চয় হয়? জানতে চাইলে তারা বলেন জমানো টাকা বছর শেষে নৌকা মেরামত ও চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, বেদে পল্লীতে মেয়েরা মাতৃত্বকালীন সময়ে তেমন কোনো ভালো চিকিৎসা পায় না। আমরা যাযাবর, ফলে একেক সময় একেক জায়গায় থাকি। এখন যেখানে থাকি এখানকার আশেপাশের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যেতে-যেতে অনেক সময় নৌকার ভেতর সন্তান জন্ম দেয় মেয়েরা। তখন আমাদের বেদেদের মধ্যে যারা দাইয়ের কাজ জানেন, তাদের মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারি (স্বাভাবিক প্রসব) সম্পন্ন করা হয়।

বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের ইচ্ছে থাকলেও পড়ালেখার সুযোগ হয় না বিভিন্ন কারণে। তাই শিশুরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের পেশাকেই বেছে নেয় যেমন,সাপ খেলা দেখানো, তাবিজ কবজ বিক্রি করা, মাছ ধরা ইত্যাদি।
তবে, দিন বদলেছে, আদি সমাজের বৈষম্য বিলোপ হয়েছে। প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা চায় শিক্ষা, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো অন্তত পূরণ হোক।
গোলাম মর্তুজা 










