স্পেনে গত কয়েক মাস ধরে চলছে খরা। পানযোগ্য পানির অভাব দেখা দিয়েছে স্বায়ত্তশাসিত কাতালোনিয়ায়। পানি ক্রমশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হোটেলগুলো পানি পুনর্ব্যবহার এবং সমুদ্রের পানি পানযোগ্য ও বিশুদ্ধকরণের মতো উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে, বৃষ্টির আশাই করা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টরডেরা এলাকার একটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের কর্মীরা সাগরের নোনাপানি পানযোগ্য করার সম্ভাবনা যাচাই করছেন।
স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলের খরা ও খাবার পানি সংকটের তৃষ্ণাময় এই খোঁজ-উদ্ভাবনের কথা উঠে এসেছে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে।
ডয়চে ভেলের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,নোনাপানিকে পানযোগ্য পানি হিসেবে প্রস্তুতের গুরু দায়িত্ব নিয়েছে আইটিএএম টরডেরা নামের একটি পরিশোধন প্ল্যান্ট।
এই প্ল্যান্টের ডেপুটি ম্যানেজার মিকেল পুমাওলা গার্সিয়া এই বিষয়ে বলেন, ‘‘এটি একটি কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া, কিন্তু প্রয়োজনীয়। প্ল্যান্টটির প্রক্রিয়াতে ব্যবহৃত অর্ধেকের বেশি নোনাপানি আবার সাগরেই ফেলা হয়। আর বাকিটা আশেপাশের মানুষদেরকে সরবরাহ করা হয়।’
২০০২ সালে প্ল্যান্টটি চালুর পর থেকে এখানে কাজ করছেন মিকেল পুমাওলা। ইতোমধ্যে এটির ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘এটি আসলে একটি পর্যটন এলাকা এবং একই সঙ্গে কৃষিপ্রধান অঞ্চল । আর নদী ধরে সামনে গেলে দেখবেন রাসায়নিক কারখানা রয়েছে, সেখানেও পানি দরকার।”
খরা কাটাতে চলতি দশকের শেষ নাগাদ পানি পরিশোধনাগারটির কর্মক্ষমতা তিনগুণ করতে চায় অঞ্চলের সরকার। তবে সাগরের পানি নোনামুক্ত করা বেশ ব্যয়বহুল ব্যাপার।

মিকেল বলেন, ‘‘চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে জ্বালানি খরচ কমিয়ে একই পরিমাণ বা বেশি পানি পরিশোধন করা, যাতে প্ল্যান্টের সক্ষমতা বাড়ে। সর্বাধুনিক প্ল্যান্টগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ তবে বিষয়টি জটিল।’
এদিকে টরডেরা নদীর পানি অনেক শুকিয়ে গেছে৷ কাতালোনিয়াতে গত চার বছর ধরে বৃষ্টিপাত অনেক কম হচ্ছে বলে এই পরিস্থিতি। জলাধারের স্তরও গত কয়েকবছরে বেশ কমেছে৷ সংকটের কারণে এখানকার বাসিন্দাদেরকে পানির ব্যবহার সীমিত করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কাতালান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেরিটেল সারেত বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তন এবং জলবায়ু সংকটের প্রভাব যে বিশ্বের অন্যান্য অংশের চেয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বেশি তা এক বাস্তবতা। অতীতেও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খরা হয়েছে কিন্তু সেসবের ব্যাপ্তি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির তীব্রতা অনেক বেড়ে গেছে৷ এই পরিবর্তন নজিরবিহীন।”
পানির রিসাইকেল
পানি সাশ্রয়ের সম্ভাব্য এক সমাধান দিচ্ছে সাম্বা হোটেল। ২৫ বছর আগে সংস্কারের সময় হোটেলটিতে আলাদা পাইপ বসানো হয়েছিল। যেমন, গোসলে ব্যবহৃত পানি আলাদা পাইপে নিয়ে তা টয়লেটে ব্যবহার করা হয়৷ বেসমেন্টে সেই পানি পরিশোধন করা হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষের হিসেবে তারা এভাবে দেড় কোটি লিটার পানি সাশ্রয় করেছে এবং অর্থও সাশ্রয় করেছে।
সাম্বা হোটেলের সাসটেইনিবিলিটি ম্যানেজার লরা পেরেজ ফ্লোরেস বলেন, ‘‘আমি মনে করি, যেসব হোটেল ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, সেগুলো সংস্কারের সময় এই বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে৷ আর নির্মাণাধীন নতুন সব হোটেলে এই ব্যবস্থা বসানো বাধ্যতামূলক করা উচিত৷”
এছাড়া স্পেনে পানি সাশ্রয়ের আরও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলছে। এমনকি সাম্বা হোটেলে ব্যবহৃত পানি (গ্রে-ওয়াটার) উদ্ভিদ এবং মাটির মাধ্যমে পরিষ্কার করার এক পদ্ধতি যাচাই করেছেন গবেষকরা। এ প্রক্রিয়ায় পুদিনার মতো খাওয়া যায় এমন উদ্ভিদ ব্যবহার করে পানি ও খাদ্য, এই দুই উৎপাদনের বহুমুখী চেষ্টা চলছে।
কাতালান ইন্সটিটিউট ফর ওয়াটার রিসার্চের বিজ্ঞানী জানলুইজি বুটলিয়ারি বলেন, ‘‘আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, এই উদ্ভিদ মানুষের খাবার হিসেবে নিরাপদ কিনা৷ আমরা এটা এখনো জানি না, জানতে আরো অনুসন্ধান করতে হবে। এটা ভবিষ্যতে গবেষণার বিষয়। একইসঙ্গে পানি পরিশোধন করতে সক্ষম এবং একই সঙ্গে খাদ্য উপযোগী উদ্ভিদ যদি চাষ করা যায়, তবে সেটা বেশ ভাল হবে।’
সাগরের নোনাপানি, হোটেলের ব্যবহৃত পানি থেকে পানযোগ্য পানি নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন গবেষকরা। তবে বেড়ে চলা খরার বিপরীতে বর্তমান এই প্রক্রিয়া কতদিন সংশ্লিষ্ট এলাকাকে সহায়তা করতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অন্তত জলবায়ু পরিবর্তনে ভুগতে থাকা অঞ্চলগুলোতে এসব আদৌ কাজে আসবে , বা কতটুকু টেকসই হবে তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।
ডেস্ক রিপোর্ট 










