সংবাদ শিরোনাম ::

আজি এলো হেমন্তের দিন

  • শাহিন মাহফুজ
  • আপডেট সময় ০৫:১৫:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৪
  • 460

আজি এলো হেমন্তের দিন

ভোরের প্রথম আলো যখন ধানের শীষে নেমে আসে, শিশিরের কোমল চুম্বনে তার সঙ্গে মিশে যায় হেমন্তের ঘ্রাণ। শরতের শেষ আলিঙ্গন পেরিয়ে হেমন্ত আবার ফিরে আসে বাংলার বুকে। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস নিয়ে এই ঋতুটি শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। হেমন্ত আসে ধীরে, তার মিষ্টি রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাসে।

বাংলার মাটি, মানুষের জীবন ও উৎসব ফসলের ঋতু হেমন্তের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মাঠে মাঠে ধানকাটার উৎসব এ ঋতুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। সারা বাংলায় নতুন ধানের গন্ধ মিশে যায় বাতাসে, ধানের খেতে বয়ে যায় হিমেল হাওয়া। কবিরা এই ঋতুকে তাই ভিন্ন চোখে দেখেছেন। জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছেন, ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/ অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার,—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান…।’ জীবনানন্দের লেখায় হেমন্তের চিরচেনা বাংলার মাটির সৌন্দর্য অঙ্কিত হয়।

হেমন্তের আগমনের বার্তা অনুভূত হয় ভোরের কুয়াশায়, ঠান্ডা বাতাসে, দিনের তাপমাত্রার হ্রাসে। পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী আজ পয়লা কার্তিক, হেমন্তের প্রথম দিন। তবে প্রকৃতিতে এ ঋতুর আগমন হয়েছে আরো কিছুদিন আগে। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিককে একসময় বাংলার গ্রামে অভাবের মাস বলা হতো। যার কারণ ছিল ফসল ঘরে তোলার পূর্ববর্তী সময়ের কঠিন দিনগুলো। সেই দিন পেরিয়ে আজ হেমন্ত আনন্দের ঋতু। অগ্রহায়ণ মাসের সঙ্গে চলে আসে নবান্ন উৎসব। নতুন ধান মাড়াইয়ের সঙ্গে শুরু হয় উৎসবের মৌসুম।

তবে প্রকৃতির পাণ্ডুলিপি এখন আগের মতো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু পরিবর্তনের সময়গুলোও পাল্টে গেছে। উত্তরাঞ্চলে যেমন হেমন্তের শুরুতেই শীতের আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছে। তাপমাত্রা নেমে এসেছে, কুয়াশায় ভিজে যাচ্ছে সকালবেলার পথ। অথচ এই শীতলতা রাজধানীতে এখনো পুরোপুরি আসেনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেমন্তকে ‘ভূষণবিহীন’ ঋতু হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘আজি এল হেমন্তের দিন/ কুহেলীবিলীন, ভূষণবিহীন।’ অর্থাৎ হেমন্ত শরতের নীলাকাশ বা শীতের কুয়াশার মতো স্পষ্ট কোনো প্রতীক বহন করে না। বরং হেমন্ত ধীরে ধীরে বাংলার মাটির সঙ্গে মিশে যায়, মাঠে মাঠে ঝরে পড়া ধান আর শিশিরে সিক্ত হয় তার অস্তিত্ব। হেমন্তকে নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন, ‘উত্তরীয় লুটায় আমার—/ ধানের খেতে হিমেল হাওয়ায়।/ আমার চাওয়া জড়িয়ে আছে/ নীল আকাশের সুনীল চাওয়ায়।/ ভাঁটির শীর্ণা নদীর কূলে/ আমার রবি-ফসল দুলে,/ নবান্নেরই সুঘ্রাণে মোর/ চাষির মুখে টপ্পা গাওয়ায়।’

হেমন্ত শুধু ফসলের বা রোমান্টিকতার ঋতু নয়, এটা ভ্রমণেরও সময়। প্রকৃতি প্রেমিকেরা বেরিয়ে পড়েন পাহাড়, নদী আর সাগরের পানে। কক্সবাজার, সিলেট, বান্দরবান, কিংবা কুয়াকাটা—সর্বত্র ভ্রমণপ্রেমীদের আনাগোনা শুরু হয় এই সময়ে। খেজুরের রস সংগ্রহ, নতুন ধানের পিঠা-পায়েস বানানোর প্রস্তুতি, মাঠে কাজ করা কৃষকের গান—এ সবই হেমন্তের চিরাচরিত সৌন্দর্যের অংশ। নদীর পানিতে প্রতিফলিত বিকেলের সূর্যাস্ত আর সন্ধ্যার কুয়াশা ভেজা পরিবেশ সেই সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেয়।

এ ঋতুতে বাংলায় পরিযায়ী পাখিরাও আসে দূর দেশ থেকে। আমাদের জনপদকে মুখোরিত করে তাদের উপস্থিতিতে। তারা আমাদের অতিথি, শীতের পরে আবার ফিরে যায় তাদের জন্মভূমিতে। পাখির এই যাত্রা, তাদের ডাক, আর প্রকৃতির সৌন্দর্য হেমন্তের অপার রোমান্টিকতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এভাবে প্রতি বছর হেমন্ত বাংলায় ফিরে আসে। ধানের সোনালি রঙে বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবন ভরে ওঠে। হেমন্তের কোমল বাতাস আর মিষ্টি রোদের স্পর্শে বাংলার মাটির মতো আমাদের মনও সিক্ত হয়। হেমন্তের উজ্জ্বল রোদের মতোই আমাদের জীবনেও শান্তির আলো ছড়িয়ে পড়ুক।

গোলাপী ফ্রক পরা পরীর কোলে গন্ধগোকুল, পেছনে হাঁটছে সজারু!

আজি এলো হেমন্তের দিন

আপডেট সময় ০৫:১৫:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৪

ভোরের প্রথম আলো যখন ধানের শীষে নেমে আসে, শিশিরের কোমল চুম্বনে তার সঙ্গে মিশে যায় হেমন্তের ঘ্রাণ। শরতের শেষ আলিঙ্গন পেরিয়ে হেমন্ত আবার ফিরে আসে বাংলার বুকে। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস নিয়ে এই ঋতুটি শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। হেমন্ত আসে ধীরে, তার মিষ্টি রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাসে।

বাংলার মাটি, মানুষের জীবন ও উৎসব ফসলের ঋতু হেমন্তের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মাঠে মাঠে ধানকাটার উৎসব এ ঋতুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। সারা বাংলায় নতুন ধানের গন্ধ মিশে যায় বাতাসে, ধানের খেতে বয়ে যায় হিমেল হাওয়া। কবিরা এই ঋতুকে তাই ভিন্ন চোখে দেখেছেন। জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছেন, ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/ অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার,—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান…।’ জীবনানন্দের লেখায় হেমন্তের চিরচেনা বাংলার মাটির সৌন্দর্য অঙ্কিত হয়।

হেমন্তের আগমনের বার্তা অনুভূত হয় ভোরের কুয়াশায়, ঠান্ডা বাতাসে, দিনের তাপমাত্রার হ্রাসে। পঞ্জিকার হিসাব অনুযায়ী আজ পয়লা কার্তিক, হেমন্তের প্রথম দিন। তবে প্রকৃতিতে এ ঋতুর আগমন হয়েছে আরো কিছুদিন আগে। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিককে একসময় বাংলার গ্রামে অভাবের মাস বলা হতো। যার কারণ ছিল ফসল ঘরে তোলার পূর্ববর্তী সময়ের কঠিন দিনগুলো। সেই দিন পেরিয়ে আজ হেমন্ত আনন্দের ঋতু। অগ্রহায়ণ মাসের সঙ্গে চলে আসে নবান্ন উৎসব। নতুন ধান মাড়াইয়ের সঙ্গে শুরু হয় উৎসবের মৌসুম।

তবে প্রকৃতির পাণ্ডুলিপি এখন আগের মতো নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু পরিবর্তনের সময়গুলোও পাল্টে গেছে। উত্তরাঞ্চলে যেমন হেমন্তের শুরুতেই শীতের আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছে। তাপমাত্রা নেমে এসেছে, কুয়াশায় ভিজে যাচ্ছে সকালবেলার পথ। অথচ এই শীতলতা রাজধানীতে এখনো পুরোপুরি আসেনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেমন্তকে ‘ভূষণবিহীন’ ঋতু হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘আজি এল হেমন্তের দিন/ কুহেলীবিলীন, ভূষণবিহীন।’ অর্থাৎ হেমন্ত শরতের নীলাকাশ বা শীতের কুয়াশার মতো স্পষ্ট কোনো প্রতীক বহন করে না। বরং হেমন্ত ধীরে ধীরে বাংলার মাটির সঙ্গে মিশে যায়, মাঠে মাঠে ঝরে পড়া ধান আর শিশিরে সিক্ত হয় তার অস্তিত্ব। হেমন্তকে নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন, ‘উত্তরীয় লুটায় আমার—/ ধানের খেতে হিমেল হাওয়ায়।/ আমার চাওয়া জড়িয়ে আছে/ নীল আকাশের সুনীল চাওয়ায়।/ ভাঁটির শীর্ণা নদীর কূলে/ আমার রবি-ফসল দুলে,/ নবান্নেরই সুঘ্রাণে মোর/ চাষির মুখে টপ্পা গাওয়ায়।’

হেমন্ত শুধু ফসলের বা রোমান্টিকতার ঋতু নয়, এটা ভ্রমণেরও সময়। প্রকৃতি প্রেমিকেরা বেরিয়ে পড়েন পাহাড়, নদী আর সাগরের পানে। কক্সবাজার, সিলেট, বান্দরবান, কিংবা কুয়াকাটা—সর্বত্র ভ্রমণপ্রেমীদের আনাগোনা শুরু হয় এই সময়ে। খেজুরের রস সংগ্রহ, নতুন ধানের পিঠা-পায়েস বানানোর প্রস্তুতি, মাঠে কাজ করা কৃষকের গান—এ সবই হেমন্তের চিরাচরিত সৌন্দর্যের অংশ। নদীর পানিতে প্রতিফলিত বিকেলের সূর্যাস্ত আর সন্ধ্যার কুয়াশা ভেজা পরিবেশ সেই সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দেয়।

এ ঋতুতে বাংলায় পরিযায়ী পাখিরাও আসে দূর দেশ থেকে। আমাদের জনপদকে মুখোরিত করে তাদের উপস্থিতিতে। তারা আমাদের অতিথি, শীতের পরে আবার ফিরে যায় তাদের জন্মভূমিতে। পাখির এই যাত্রা, তাদের ডাক, আর প্রকৃতির সৌন্দর্য হেমন্তের অপার রোমান্টিকতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এভাবে প্রতি বছর হেমন্ত বাংলায় ফিরে আসে। ধানের সোনালি রঙে বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবন ভরে ওঠে। হেমন্তের কোমল বাতাস আর মিষ্টি রোদের স্পর্শে বাংলার মাটির মতো আমাদের মনও সিক্ত হয়। হেমন্তের উজ্জ্বল রোদের মতোই আমাদের জীবনেও শান্তির আলো ছড়িয়ে পড়ুক।