গত কয়েকদিন ধরে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে কুমির দেখা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে, একটি-দুটি নয়, একাধিক কুমিরের দেখা মিলেছে। এতে নদীপাড়ের মানুষদের মধ্যে চাঞ্চল্য-আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কেউ হাঁস, কেউবা ছাগল নিয়ে হাজির হচ্ছে নদীপাড়ে। সপ্তাহখানেক ধরে কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীর শাখা গড়াইয়ে দেখা মিলেছে তিনটি কুমিরের। এতে আতঙ্কে দিন পার করছেন নদীতীরের মানুষ। তবে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বলছে আতঙ্কের কিছু নেই বরং দেশে মিঠাপানির কুমিরের প্রাকৃতিক আবাসে এদের আবার দেখা যাওয়াটা ইতিবাচক। কুমিরের বিষয়ে স্থানীয়দের আরও সচেতন ও সাবধান থেকে সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছে সংরক্ষণ বিভাগ।
কুষ্টিয়ার প্রাণী বৈচিত্র্য সংরক্ষণের দায়িত্ব খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের আওতায়। গড়াইতে সম্প্রতি দেখা যাওয়া কুমিরদের বিষয়ে জানতে প্রকৃতিবার্তা’র কথা হয় খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পালের সাথে।
তিনি প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘মিঠাপানির কুমির নদীতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। নদী থেকে এদের তুলে নিয়ে অন্যত্র অবমুক্ত করার প্রয়োজন আপাতত নেই। নদীই মিঠাপানির কুমিরের প্রাকৃতিক আবাস। পদ্মাবিধৌত অঞ্চলে বহু আগে থেকেই মিঠাপানির কুমির-ঘড়িয়ালদের বসবাস। বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা ও এর শাখা নদীগুলোতে মিঠাপানির কুমির ও ঘড়িয়াল ছিল। এখন এসব এলাকায় সংরক্ষণ উদ্যোগ কাজে আসছে।’

গড়াইসহ পদ্মা সংলগ্ন এলাকায় এই মৌসুমে কুমির দেখা যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কুমির শীতল রক্তবিশিষ্ট সরীসৃপ প্রাণী। এর অর্থ, পরিবেশের তাপমাত্রা কমে গেলে কুমিরের দেহের তাপমাত্রাও কমে যায়। আমাদের মতো কুমির নিজের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে শীতকালে কুমির ডাঙায় রোদ পোহায়। সাম্প্রতিক যে কুমিরগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে এটা তার একটি কারণ।’
এছাড়া বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য বলছে: ‘কার্তিক থেকে পৌষ মাসে কুমির ডাঙ্গায় এসে ৩০-৩৫ টি ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার জন্য স্ত্রী কুমির বালিতে ৪৫-৬০ সে.মি.গভীর গর্ত করে বাসা বাঁধে এবং এরা গর্তের ভিতর ডিম ছেড়ে বালি দিয়ে ঢেকে রাখে। কুমির দুটি সারি করে ডিম দেয় এবং বালি দ্বারা প্রতিটি সারি আলাদা রাখে । স্ত্রী কুমির নিকটবর্তী জায়গা থেকে বাসা পাহারা দেয়।’
গড়াইপাড়ে কুমির দেখা যাওয়ায় স্থানীয়দের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে এবং সাবধানে সহাবস্থান বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল।
তিনি প্রকৃতিবার্তাকে বলেন,‘মিঠাপানির কুমির সাধারণত মানুষসহ ডাঙার প্রাণীদের অহেতুক আক্রমণ করে না। মিঠাপানির কুমিরের প্রধান খাবার মাছ। সরকারের মাছ শিকার সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পদ্মা-যমুনাসহ প্রধান নদীগুলোতে মাছের পরিমাণ বেড়েছে। খাবার বৃদ্ধি পাওয়ায় এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মিঠাপানির কুমির-ঘড়িয়াল আবারও আদি নিবাসে ফিরে আসছে, যা আশাব্যঞ্জক।’
তাই কুমির দেখে আতঙ্কিত না হয়ে এদের বিচরণ ও আবাস্থল এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে গড়াইপাড়ের জনবসতির আশপাশে নিয়মিত একই জায়গায় কুমিরের আনাগোনা বেড়ে গেলে প্রয়োজনে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিসহ প্রচারণা চালানো হবে বলে জানিয়েছেন খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার) মিঠাপানির কুমিরকে বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল ২০০০ সালে। বিলুপ্ত ঘোষণা করার আগে এই ধরনের কুমির বাংলাদেশের জলাধারগুলোতে শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৬২ সালে।
এমন বাস্তবতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফরিদপুর, পাবনা, মাদারীপুর, কুষ্টিয়ায় ফের মিঠাপানির কুমির এবং পদ্মায় মহাবিলুপ্ত ঘড়িয়াল দেখা যাওয়াটা দেশের জীববৈচিত্রের জন্য আশা জাগানো বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও প্রাণী সংরক্ষণ সংশ্লিষ্টরা।
নাসিমুল শুভ 




















