“আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি – বিকেলের এই রঙ – রঙের শূন্যতা
রোদের নরম রোম – ঢালু মাঠ – বিবর্ণ বাদামি পাখি – হলুদ বিচালি
পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে ঘাসে……”
জীবনানন্দ দাশের কবিতার উপরিউক্ত চরণগুলো পড়লে ঠিক চোখের সামনে প্রকৃতিতে ঘেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা চত্বরের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একাধিক চত্বরের মিলন মেলা। প্রত্যেকটি স্থানই একেকটি চত্বর দিয়ে পরিচিত। ভিসি চত্বর, সমাজবিজ্ঞান চত্বর, হাফিজ চত্বর, ভাবনা চত্বর, ইত্যাদি চত্বরে ঘেরা আমাদের এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এসকল চত্বরে গাছপালারও যেন কোনো কমতি নেই। অসংখ্য গাছপালায় পরিপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সকলের কাছেই প্রকৃতিতে ঘেরা এক অনন্য জায়গার নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও তাই প্রতিনিয়তই এখানে বহিরাগতদের আগমন ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসকল প্রতিটি চত্বরের রয়েছে একেকটি ইতিহাস। তবে সৌন্দর্য ও আয়তনের বিচারে যাচাই করতে গেলে বোধহয় সবচেয়ে বড় মল চত্বরের নামই আসবে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সাবেক ফরাসী সংস্কৃতি মন্ত্রী আঁন্দ্রে মারলোর সম্মানার্থে ঢাবিতে একটি চত্বরের নামকরণ করা হয়। নাম ছিল মারলো চত্বর। এটিই বিকৃত হয়ে বর্তমানে ‘মল চত্বর’ নামে পরিচিত।
প্রকৃতিতে ঘেরা এই মল চত্বরে শতবর্ষের ম্যুরাল স্থাপন ও ভাস্কর্য স্থাপনের কর্মযজ্ঞে অনেক গাছের শিকড় কেটে ফেলা হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা কেউই বর্তমান সময়ে এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি। তাদের মতে, সৌন্দর্য বর্ধনে প্রকৃতির কোনো বিকল্প নেই। কৃত্রিম উপায়ে সৌন্দর্য বর্ধন কেবলই সাময়িক ভালো লাগার জন্ম দিতে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
আগের তুলনায় গাছ কিছুটা বিলীন হলেও উল্লিখিত এই মল চত্বরে ঢুকতেই কিছুটা সামনে গেলে এখনও দেখা মেলে বিরাট এক গাছের। রেইন ট্রি বা বাংলায় রেণ্ডিকড়ই নামে খ্যাত উল্লিখিত গাছটি যেন যুগ যুগ ধরেই গোটা মল চত্বরে সৌন্দর্য বর্ধনে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। দর্শনার্থীদের বসার জন্য উক্ত গাছের সামনে বেশ কিছু জায়গা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে প্রতিনিয়ত এই গাছের নিচে বসে দিগ্বিদিক আড্ডা দিয়ে থাকে। আবার কখনো ইচ্ছে হলে মল চত্বরে নিয়মিত আগমনরত এক চা বিক্রেতা চাচার কাছে পাখিদের কলরব শুনতে শুনতে চা পানও করে থাকেন তারা। রেইন ট্রি গাছটি এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত যে খুব সহজেই দিন দুপুরের প্রচণ্ড রোদকেও এটি ছায়ায় মন্ডিত করতে পারে যা সেখানে অবস্থানরত প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনকে অবলীলায় প্রশান্ত করে তোলে। বর্ষাকালে মাঠে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ভিজে বৃষ্টি উপভোগ করে থাকে যা নিঃসন্দেহে তাদের জীবনে স্মরণীয় দিনের তালিকায় জায়গা করে নেয়।
এই মল চত্বরে আগে ফুচকা-ভেলপুরিসহ হরেক রকমের মজাদার স্ট্রিট ফুডের জমজমাট মহল ছিল। শিক্ষার্থীরা একেক জায়গা থেকে ক্লাসের ফাঁকে ছুটে আসত রেইন ট্রি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তাদের প্রিয় খাবার খেতে। চলতি বছরে উক্ত স্থানে খাবার বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এখনও মল চত্বর মানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এক চিরচেনা প্রিয় জায়গার নাম। প্রকৃতিতে ঘেরা জায়গাটির উল্লিখিত রেইন ট্রি গাছের অবদান যেন কখনও ভুলবে না এই মল চত্বর।
শিক্ষার্থী,
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নন্দিনী আহসান 




















