জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব এখন শুধু পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি অভিঘাত পড়ছে দেশের কর্মসংস্থান খাতে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও চামড়া শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন হাজারো মানুষ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরার কারণে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। আগে যেখানে একটি মৌসুমে কয়েক মাস কাজের সুযোগ থাকত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে কয়েক সপ্তাহে। এতে করে গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং অনেকেই বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন।
মৎস্য খাতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। নদী ও উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জেলেরা আগের মতো মাছ ধরতে পারছেন না। এতে তাদের আয় কমে যাচ্ছে এবং বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অনেকেই অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
পর্যটন শিল্পও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষয় পর্যটকদের আকর্ষণ কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রেও জলবায়ু পরিবর্তন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে চামড়া সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না গেলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়াও, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত গরমে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, হিটস্ট্রোকসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আবার বন্যা ও দূষিত পানির কারণে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।
এদিকে, শহরে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বেকারত্বের হার আরও বাড়ছে। গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে শহরে আসা মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এতে করে বস্তি এলাকায় জনসংখ্যা বাড়ছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জলবায়ু সহনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের নতুন খাতে কাজের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কর্মসংস্থান সংকট সামাজিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্য বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত নয়, একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থানের এই সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জোবায়ের আহমেদ 




















