পান্তাভাত বাঙালির হেঁশেলের এক পরিচিত রূপ। এটি খাওয়ার প্রচলন এদেশে বহুকাল ধরেই। মূলত আমাদের দেশে রাতের খাবারের পর রয়ে যাওয়া অতিরিক্ত ভাত পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখলেই পান্তা হয়ে যায়। সারা রাত গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া এই খাবারটি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী পদই নয়, বরং এটি লুকিয়ে রেখেছে অসাধারণ পুষ্টিগুণ। এটি গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও শহুরে জীবনে এর কদর নেই বললেও চলে। তবে নববর্ষের ভোরে ইলিশের সাথে পান্তার স্বাদ আজও বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করে। শহর বা গ্রাম পহেলা বৈশাখের সকালটা যেন পান্তা- ইলিশ ছাড়া জমতেই চায় না।

কী আছে পান্তাভাতে?
পান্তাভাত কেবল একটি সহজলভ্য খাবার নয়, প্রাকৃতিক এক বিস্ময় ও বটে। গাঁজন প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে সাধারণ ভাত রূপান্তরিত হয় এক পুষ্টিকর খাদ্যে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পান্তা ভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিঙ্ক, ফসফরাস এবং ভিটামিন বি-এর মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
গবেষণা বলছে, ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে যেখানে আয়রনের পরিমাণ মাত্র ৩.৫ মিলিগ্রাম, সেখানে ১২ ঘণ্টা ভেজানো পান্তা ভাতে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৩.৯ মিলিগ্রামে। একইভাবে, ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সাধারণ ভাতের ২১ মিলিগ্রাম থেকে বেড়ে পান্তা ভাতে ৮৫০ মিলিগ্রামে পৌঁছায়। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে পান্তা ভাতের অসাধারণ পুষ্টিগুণ।

পান্তা ভাত স্বাস্থ্যকর কেন
- অন্ত্রের প্রদাহ কমায়: পান্তা ভাত একটি অন্ত্র-বান্ধব খাবার। এটি প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ তাই অন্ত্রের সংক্রমণ রোধ করে এবং শরীরে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
- হজমশক্তি বাড়ায়: পান্তা ভাত হজমশক্তি বাড়ায়। খাবার দ্রুত হজমে সহায়তা করে।
- পেটের পীড়া দূর করে: পান্তা ভাতে ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সাধারণত দইয়ের মধ্যে এই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়।
- শক্তি যোগায়: অন্ত্রের পাশাপাশি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা নিরাময় বা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখে। এটি খেলে শরীর হালকা লাগে এবং কাজের ক্ষেত্রে শক্তি বেশি পাওয়া যায়।
- ত্বক সুন্দর রাখে: ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, চুলকে করে সুন্দর।
- পানিশূন্যতা দূর করে: পান্তা ভাতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। তাই পানিশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে এটি।
- শরীর সতেজ রাখে: পান্তা ভাতে ভিটামিন বি ১২ এর উপস্থিতির কারণে ক্লান্তি কমাতে কাজ করে, শরীরকে সতেজ রাখে, দুর্বলতা নিরাময় করে। যারা অনিদ্রায় ভুগছেন তাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী খাবার
তবে পান্তা ভাত তৈরির ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এটি তৈরিতে পানি ব্যবহার করা হয় তাই অবশ্যই বিশুদ্ধ খাবার পানি দিতে হবে এবং যে পাত্রে পান্তা তৈরি করা হবে, সেটি ভালোভাবে ঢেকে ধুলাবালি মুক্ত স্থানে রাখতে হবে। যেহেতু পান্তাভাত দীর্ঘ সময় ধরে গাঁজন প্রক্রিয়ায় থাকে, তাই এটি খেলে কিছুটা ঘুম ঘুম আসতে পারে, চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। তবে সময় অতিরিক্ত দীর্ঘ হলে পেটের ব্যাথা বা ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভবনা থাকে। ডায়াবেটিস রোগী ও যাদের ওজন বেশি তাদের পান্তাভাত না খাওয়াই উত্তম।
ভারতের আসামের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় পান্তাভাতের অসাধারণ উপকারিতা সম্পর্কে জানা যায়। পরিশেষে বলা যায় যে পান্তা শুধু কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী খাবারই নয়, এটি পুষ্টির পাওয়ার হাউসও বটে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 










