সংবাদ শিরোনাম ::
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে অংশীজনদের সংলাপ

প্লাস্টিক বর্জ্য ও রিসাইক্লিং নিয়ে কী বলছে কোকাকোলা-ইউনিলিভার-প্রাণ, কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?

প্লাস্টিক বর্জ্য ও রিসাইক্লিং নিয়ে কী বলছে কোকাকোলা-ইউনিলিভার-প্রাণ, কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?

অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও সর্বত্র শিল্পায়ন-নগরায়ন ঘটছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সহজলভ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার। পেট বোতলে সয়লাব দেশের প্রতিকোণা, একই সঙ্গে গৃহসামগ্রীতেও জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক। এই অবস্থায় দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে যেন দানবীয় রূপ নিচ্ছে, প্লাস্টিক দূষণ এখন মারাত্মক পর্যায়ে। এই বাস্তবতায় দেশে প্লাস্টিক পণ্য বাজারে আনা দেশীয় এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে হয়ে গেল অংশীজন সংলাপ। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে জোর দেয়ার কথা বলল সবপক্ষই। প্লাস্টিক দানবকে বশে আনতে সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রিসাইক্লিং শিল্পের নানা সমস্যা-সম্ভাবনা উঠে আসে তাদের কথায়।

রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এই অংশীজন সংলাপে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং শিল্পখাতের প্রধানরা একত্রিত হয়ে বাংলাদেশে রিসাইক্লিং বিজনেস ইউনিট (আরবিইউ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার এবং একটি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রিসাইক্লিং কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও আলোচনায় বাংলাদেশের রিসাইক্লিং অবকাঠামোর উন্নয়নে নীতি ও অর্থনৈতিক প্রণোদনাকে একীভূত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর উপর আলোকপাত করা হয়।

প্লাস্টিক বর্জ্য ও রিসাইক্লিং নিয়ে কী বলছে কোকাকোলা-ইউনিলিভার-প্রাণ, কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ তার বক্তব্যে টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতে উন্নত রিসাইক্লিং পদ্ধতি এবং নীতি সহায়তার মাধ্যমে সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণ দানবীয় রূপ নিয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি এখন প্রাণীদেহ এমনকি মাতৃগর্ভেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে প্লাস্টিক দূষণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেস্পন্সিবিলিটি (ইপিআর) নির্দেশিকা প্রণয়ন করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, শীঘ্রই নীতিমালা চূড়ান্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক উদ্যোগ এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তা এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

কোকাকোলা বাংলাদেশ বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব খান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কোকাকোলা বোতলকে ১০০% রিসাইকেলেবল করা। টেকসই পরিবেশের প্রতি আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। বর্তমানে বাংলাদেশে কোকাকোলা পণ্যের ৯৫ শতাংশই রিসাইকেল উপযোগী। আমাদের পানির বোতল নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন, আমাদের এই বোতল ১০.৪ গ্রামের যা কিনা বাজারের অন্যান্য পানির বোতলের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম। শুধু পানির বোতল নয়, আমাদের ২৫০ মিলিলিটার পানীয়র বোতলটি ৯.৬ গ্রাম ওজনে বিশ্বের সবচেয়ে হালকা বোতল। টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের পরের চিন্তা এমনটা নয়, আমরা আমাদের সমস্ত প্রক্রিয়ায় টেকসই পরিবেশকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা জানি এসবও যথেষ্ট নয়। এজন্য উদ্ভাবনী সমাধানেও জোর দিচ্ছি।’

সংলাপে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ব্র্যান্ড, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রধান শামিমা আক্তার দেশে তাদের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলেন, বর্তমানে ইউনিলিভার নিজের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করছে। এটা আমাদের ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার অংশ, আমরা যত পরিমাণ প্লাস্টিক মোড়কের পণ্য বিক্রি করি তার চেয়ে বেশি পরিমাণের প্লাস্টিক বর্জ্য তুলে আনতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

তিনি প্লাস্টিক রিসাইক্লিং নিয়ে বলেন, ‘বেসরকারিখাত বাংলাদেশে প্লাস্টিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার এই বেসরকারিখাতের সিংহভাগই অনানুষ্ঠানিকভাবে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং এর কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৪০% প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করা হচ্ছে অনানুষ্ঠানিকভাবে। তবে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো রিসাইক্লিং পণ্যের মান। বাংলাদেশে যেভাবে রিসাইক্লিং হচ্ছে তাতে কোকাকোলা, ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত মান আমরা পাচ্ছি না। এজন্যই অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক খাতে পরিণত করার তাগিদ দেখা দিয়েছে।’

দেশের অন্যতম বড় প্লাস্টিক সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রাণ আরএফএল-এর হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাস্সুম আহমেদ সংলাপে বলেন,  আমরা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্লাস্টিক রিসাইক্লার। গত বছর আমরা ৪৬ হাজার টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করেছি। এই রিসাইকেল পণ্য আমরা স্থানীয় বাজারে এবং দেশের বাইরে রপ্তানি করেছি। রিসাইক্লার হিসেবে আমাদের প্রস্তাব হলো মানসম্মত রিসাইকেলেবল প্লাস্টিক পেতে হলে গৃহস্থালী পর্যায়ের ব্যবহারি, প্লাস্টিক সংগ্রাহকসহ এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সচেতন করতে হবে, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে।’

 

বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাদেম মাহমুদ ইউসুফ বলেন, ‘আরবিইউ মডেল প্লাস্টিক বর্জ্য মোকাবিলার একটি পরিবর্তনমূলক পদ্ধতি। রিসাইক্লিং ভ্যালু চেইনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে আমরা দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস এবং বাংলাদেশে একটি সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখছি।’

বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামিম আহমেদ বলেন, ‘আমরা বর্জ্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জমা হতে দিতে পারি না। বরং সঠিক রিসাইক্লিং ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্যের জীবনচক্র শেষ করতে হবে। বিপিসিএল-এর স্বাস্থ্যসেবা ও আরবিইউ উদ্যোগ টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ, যা পরিবেশগত দায়িত্বের একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে।’

সংলাপে অংশ নিয়ে সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও ডেপুটি হেড অব ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন নায়োকা মার্টিনেজ-ব্যাকস্ট্রোম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারদের আলোচনায় যে বিষয়টি অন্যতম প্রাধান্য পায় সেটি হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সুইডেনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও এ থেকে মুনাফা লাভের উদাহরণ আছে। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখী মিশনের মাধ্যমে রেগুলেটরি এবং পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করানো দরকার। কোন ধরনের বর্জ্য কিভাবে ব্যবস্থাপনা হবে সেটি ঠিক করতে হবে। অহেতুক প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতেই হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিতে জোর দেয়া উচিত। এজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ে বাড়তি যত্ন নেয়া, প্রয়োজনে প্রণোদনার দিকে নজর দেয়ার দরকার হবে। আর এই দু’টিও যদি করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্লাস্টিক বর্জ্যের চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত করতে ইনসিনারেশন অর্থাৎ প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের দিকে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।’

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এই সংলাপে বিপিসিএল-এর চেয়ারম্যান খান এম আহসান স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এরপর বিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাদেম মাহমুদ ইউসুফ এবং সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিসেসের (সিডিআইপি) নির্বাহী পরিচালক মিফতা নাঈম হুদা প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ভ্যালু চেইনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বিষয়ে একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা প্রদান করেন। এই উপস্থাপনায় আরবিইউ স্থাপন এবং রিসাইক্লিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।


অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ছিল আরবিইউ মডেল ভিডিও প্রদর্শন, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরবিইউ-এর কাঠামো ও কার্যক্রমের গতিশীলতা তুলে ধরে। উপস্থাপনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী,  এই ভিডিওটি দেশের প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্পের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এই মডেল কীভাবে সাহায্য করতে পারে তা ব্যাখ্যা করার জন্য একটি ভিজ্যুয়াল সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

সংলাপে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন- ইউএনওপিএস-এর পার্টনারশিপ ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার কুলদীপ মাল্লা, ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী, বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বুশরা নিশাত, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত শবনম প্রমুখ।

এই সংলাপের আয়োজন করেছিল বিপিসিএল, প্লিজ প্রজেক্ট এবং সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস (সিডিআইপি)।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

মাঝারি রূপ নিচ্ছে তাপপ্রবাহ,তাপমাত্রা হতে পারে ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে অংশীজনদের সংলাপ

প্লাস্টিক বর্জ্য ও রিসাইক্লিং নিয়ে কী বলছে কোকাকোলা-ইউনিলিভার-প্রাণ, কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?

আপডেট সময় ০২:৪৩:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ মার্চ ২০২৫

অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও সর্বত্র শিল্পায়ন-নগরায়ন ঘটছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সহজলভ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার। পেট বোতলে সয়লাব দেশের প্রতিকোণা, একই সঙ্গে গৃহসামগ্রীতেও জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিক। এই অবস্থায় দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে যেন দানবীয় রূপ নিচ্ছে, প্লাস্টিক দূষণ এখন মারাত্মক পর্যায়ে। এই বাস্তবতায় দেশে প্লাস্টিক পণ্য বাজারে আনা দেশীয় এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে হয়ে গেল অংশীজন সংলাপ। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে জোর দেয়ার কথা বলল সবপক্ষই। প্লাস্টিক দানবকে বশে আনতে সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রিসাইক্লিং শিল্পের নানা সমস্যা-সম্ভাবনা উঠে আসে তাদের কথায়।

রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এই অংশীজন সংলাপে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং শিল্পখাতের প্রধানরা একত্রিত হয়ে বাংলাদেশে রিসাইক্লিং বিজনেস ইউনিট (আরবিইউ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার এবং একটি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রিসাইক্লিং কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও আলোচনায় বাংলাদেশের রিসাইক্লিং অবকাঠামোর উন্নয়নে নীতি ও অর্থনৈতিক প্রণোদনাকে একীভূত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর উপর আলোকপাত করা হয়।

প্লাস্টিক বর্জ্য ও রিসাইক্লিং নিয়ে কী বলছে কোকাকোলা-ইউনিলিভার-প্রাণ, কী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ তার বক্তব্যে টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতে উন্নত রিসাইক্লিং পদ্ধতি এবং নীতি সহায়তার মাধ্যমে সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণ দানবীয় রূপ নিয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি এখন প্রাণীদেহ এমনকি মাতৃগর্ভেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে প্লাস্টিক দূষণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেস্পন্সিবিলিটি (ইপিআর) নির্দেশিকা প্রণয়ন করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, শীঘ্রই নীতিমালা চূড়ান্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক উদ্যোগ এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তা এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

কোকাকোলা বাংলাদেশ বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব খান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কোকাকোলা বোতলকে ১০০% রিসাইকেলেবল করা। টেকসই পরিবেশের প্রতি আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। বর্তমানে বাংলাদেশে কোকাকোলা পণ্যের ৯৫ শতাংশই রিসাইকেল উপযোগী। আমাদের পানির বোতল নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন, আমাদের এই বোতল ১০.৪ গ্রামের যা কিনা বাজারের অন্যান্য পানির বোতলের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম। শুধু পানির বোতল নয়, আমাদের ২৫০ মিলিলিটার পানীয়র বোতলটি ৯.৬ গ্রাম ওজনে বিশ্বের সবচেয়ে হালকা বোতল। টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের পরের চিন্তা এমনটা নয়, আমরা আমাদের সমস্ত প্রক্রিয়ায় টেকসই পরিবেশকে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা জানি এসবও যথেষ্ট নয়। এজন্য উদ্ভাবনী সমাধানেও জোর দিচ্ছি।’

সংলাপে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ব্র্যান্ড, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রধান শামিমা আক্তার দেশে তাদের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলেন, বর্তমানে ইউনিলিভার নিজের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করছে। এটা আমাদের ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার অংশ, আমরা যত পরিমাণ প্লাস্টিক মোড়কের পণ্য বিক্রি করি তার চেয়ে বেশি পরিমাণের প্লাস্টিক বর্জ্য তুলে আনতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

তিনি প্লাস্টিক রিসাইক্লিং নিয়ে বলেন, ‘বেসরকারিখাত বাংলাদেশে প্লাস্টিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার এই বেসরকারিখাতের সিংহভাগই অনানুষ্ঠানিকভাবে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং এর কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৪০% প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করা হচ্ছে অনানুষ্ঠানিকভাবে। তবে এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো রিসাইক্লিং পণ্যের মান। বাংলাদেশে যেভাবে রিসাইক্লিং হচ্ছে তাতে কোকাকোলা, ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত মান আমরা পাচ্ছি না। এজন্যই অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক খাতে পরিণত করার তাগিদ দেখা দিয়েছে।’

দেশের অন্যতম বড় প্লাস্টিক সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রাণ আরএফএল-এর হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাস্সুম আহমেদ সংলাপে বলেন,  আমরা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্লাস্টিক রিসাইক্লার। গত বছর আমরা ৪৬ হাজার টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করেছি। এই রিসাইকেল পণ্য আমরা স্থানীয় বাজারে এবং দেশের বাইরে রপ্তানি করেছি। রিসাইক্লার হিসেবে আমাদের প্রস্তাব হলো মানসম্মত রিসাইকেলেবল প্লাস্টিক পেতে হলে গৃহস্থালী পর্যায়ের ব্যবহারি, প্লাস্টিক সংগ্রাহকসহ এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সচেতন করতে হবে, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে।’

 

বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাদেম মাহমুদ ইউসুফ বলেন, ‘আরবিইউ মডেল প্লাস্টিক বর্জ্য মোকাবিলার একটি পরিবর্তনমূলক পদ্ধতি। রিসাইক্লিং ভ্যালু চেইনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে আমরা দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস এবং বাংলাদেশে একটি সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখছি।’

বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামিম আহমেদ বলেন, ‘আমরা বর্জ্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য জমা হতে দিতে পারি না। বরং সঠিক রিসাইক্লিং ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্যের জীবনচক্র শেষ করতে হবে। বিপিসিএল-এর স্বাস্থ্যসেবা ও আরবিইউ উদ্যোগ টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ, যা পরিবেশগত দায়িত্বের একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে।’

সংলাপে অংশ নিয়ে সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও ডেপুটি হেড অব ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন নায়োকা মার্টিনেজ-ব্যাকস্ট্রোম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারদের আলোচনায় যে বিষয়টি অন্যতম প্রাধান্য পায় সেটি হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সুইডেনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও এ থেকে মুনাফা লাভের উদাহরণ আছে। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখী মিশনের মাধ্যমে রেগুলেটরি এবং পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করানো দরকার। কোন ধরনের বর্জ্য কিভাবে ব্যবস্থাপনা হবে সেটি ঠিক করতে হবে। অহেতুক প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতেই হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিতে জোর দেয়া উচিত। এজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ে বাড়তি যত্ন নেয়া, প্রয়োজনে প্রণোদনার দিকে নজর দেয়ার দরকার হবে। আর এই দু’টিও যদি করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্লাস্টিক বর্জ্যের চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত করতে ইনসিনারেশন অর্থাৎ প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের দিকে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।’

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এই সংলাপে বিপিসিএল-এর চেয়ারম্যান খান এম আহসান স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এরপর বিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাদেম মাহমুদ ইউসুফ এবং সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিসেসের (সিডিআইপি) নির্বাহী পরিচালক মিফতা নাঈম হুদা প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ভ্যালু চেইনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বিষয়ে একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা প্রদান করেন। এই উপস্থাপনায় আরবিইউ স্থাপন এবং রিসাইক্লিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।


অনুষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ছিল আরবিইউ মডেল ভিডিও প্রদর্শন, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরবিইউ-এর কাঠামো ও কার্যক্রমের গতিশীলতা তুলে ধরে। উপস্থাপনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী,  এই ভিডিওটি দেশের প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্পের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় এই মডেল কীভাবে সাহায্য করতে পারে তা ব্যাখ্যা করার জন্য একটি ভিজ্যুয়াল সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

সংলাপে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন- ইউএনওপিএস-এর পার্টনারশিপ ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার কুলদীপ মাল্লা, ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী, বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বুশরা নিশাত, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত শবনম প্রমুখ।

এই সংলাপের আয়োজন করেছিল বিপিসিএল, প্লিজ প্রজেক্ট এবং সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস (সিডিআইপি)।