ইট-পাথরের নগরে বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে কোকিলের ‘কুহু কুহু’ কলতান। প্রকৃতির এই সুরকারকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও আবেগ চিরন্তন। তবে কোকিলের এই গান কেবল প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখা নয়, এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক কারণ।
কেন ডাকে কোকিল?
বসন্তকাল হচ্ছে কোকিলের প্রধান প্রজনন ঋতু। মূলত পুরুষ কোকিলই সুরেলা কণ্ঠে গান গায়। এর দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে:
১. স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করা: সঙ্গিনীকে প্রণয়ের আহ্বান জানাতে পুরুষ কোকিল অবিরাম ডেকে চলে।
২. সীমানা নির্ধারণ (Territorial Alarm): নিজের এলাকা দখলে রাখা এবং অন্য পুরুষ পাখিকে সতর্ক করার জন্য এটি এক ধরনের সংকেত। কেউ সীমানা লঙ্ঘন করলে শুরু হয় তীক্ষ্ণ স্বরে লড়াই।
রঙ ও রূপের ভিন্নতা
সাধারণভাবে কোকিল বলতে আমরা কুচকুচে কালো ও লাল চোখের পাখি বুঝলেও, স্ত্রী ও পুরুষ কোকিলের চেহারায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে:
পুরুষ কোকিল: এদের গায়ের রঙ উজ্জ্বল নীলচে-কালো এবং চোখ টকটকে লাল।

স্ত্রী কোকিল: এরা দেখতে অনেকটা বাদামী রঙের। পিঠে সাদা ফোঁটা এবং বুকে-পেটে কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। এরা অনেকটা অন্তরালে থাকতেই পছন্দ করে।
খাদ্যাভ্যাস ও পরজীবী স্বভাব
কোকিলের প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ ও নরম ফল (যেমন: বট বা পাকুড় ফল)।

তবে এদের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো এরা বাসা তৈরি করতে পারে না। কৌশলে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে তারা বংশবৃদ্ধি করে। বাংলাদেশে প্রায় ২০ প্রজাতির কোকিল পাওয়া যায়, যার মধ্যে ১৬টি প্রজাতিই অন্যের বাসায় ডিম পাড়ে। ব্যতিক্রম হিসেবে সবুজ ও মেটে মালকোয়া নিজেরাই বাসা বাঁধে।
সংকটে বসন্তের প্রতিনিধি
এক সময় গ্রাম থেকে শহর সবখানেই কোকিলের সরব উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে তারা অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
বাসস্থান ও খাদ্য সংকট: নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে কোকিলের আশ্রয়স্থল ও প্রাকৃতিক খাবারের উৎস কমে যাচ্ছে।
কাকের সংখ্যা হ্রাস: কোকিল প্রজননের জন্য কাকের বাসার ওপর নির্ভরশীল। গত দুই দশকে প্রকৃতিতে কাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কোকিলের প্রজনন চক্রও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং ঋতুরাজ বসন্তের এই চিরচেনা সুরকে বাঁচিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণ ও পাখির নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 

















