আজ ২২ মে, আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। ১৯৯২ সালের আজকের এই দিনে কেনিয়ার নাইরোবিতে জীববৈচিত্র্য বা সিবিডি চুক্তি গ্রহণের পর থেকে বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তবে উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য—পৃথিবী নামক গ্রহটিতে জীবনের যে বৈচিত্র্য তা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের প্রকৃতি-বিনাশী কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের চারপাশের বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ছে।
রেড অ্যালার্ট: ৪০ বছরে বন্যপ্রাণী কমেছে ৫৮%
ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) একটি শিউরে ওঠার মতো গবেষণা বলছে, গত ৪০ বছরে পৃথিবী থেকে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে ২ শতাংশ করে বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নদী ও হ্রদের স্বাদু পানির প্রাণীরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের থাবায় মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে, ফলে গ্রিনল্যান্ডের মতো এলাকার প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান ও বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের হুঁশিয়ারি, বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তবে আমাজন থেকে শুরু করে এশিয়ার সমৃদ্ধ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এই বৃদ্ধি যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তবে সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যে নেমে আসবে মহাবিপর্যয়।
লবণাক্ততার গ্রাসে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূল ও সুন্দরবন
বাংলাদেশের জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার এখন দক্ষিণাঞ্চল। ঘন ঘন লোনা পানির প্লাবনে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা ও পটুয়াখালীর মাটিতে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে।
- নদ-নদীতে লবণের থাবা: সুন্দরবনের শিবসা ও পশুর নদসহ অন্যান্য জলাশয়ে প্রতি বছর প্রায় ২ পিপিটি (পার্টস পার ট্রিলিয়ন) হারে লবণাক্ততা বাড়ছে।
- মিঠা পানির মাছের সংকট: ৫ পিপিটি পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারা শিং, কাতল, টাকি, পাবদা, শোল ও মাগুরের মতো প্রায় ২৭ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ এখন সুন্দরবন এলাকায় মারাত্মক বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
- মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংকট: লবণাক্ততার কারণে একদিকে যেমন সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে সুন্দরবনের অক্সিজেনের আধার ও উপকূলের রক্ষাদেয়াল হিসেবে পরিচিত প্রতিবেশ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে।
বাঘ ও হরিণ নিধন: আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটের পাশাপাশি চোরা শিকারিদের কারণে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণের সংখ্যা প্রতি বছর কমছে। তথ্য মতে, প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজারের বেশি হরিণ নিধন করা হচ্ছে। অথচ বাঘ রক্ষা করতে না পারলে সুন্দরবনকে বাঁচানো অসম্ভব।
অলক্ষ্যে ধ্বংসযজ্ঞ: মাটি ও আলো দূষণ
নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে আমরা শুধু বাতাস বা পানি দূষণই করছি না, জীববৈচিত্র্যের আরও দুটি বড় উপাদান মাটি ও আলোকে বিষাক্ত করে তুলছি।
- মাটি দূষণ: পারদ, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর বিষক্রিয়ায় মাটির অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। বাংলাদেশে ২৫ ধরনেরও বেশি মাটি রয়েছে, যার এক এলাকার ক্ষতি অন্য এলাকায় প্রভাব ফেলছে।
- আলো দূষণ: কৃত্রিম এলইড বা ফ্লুরোসেন্ট বাতির অতিব্যবহারে প্রকৃতি থেকে ‘রাত’ হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নিশাচর প্রাণীদের জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে ফসলের পরাগায়ন এবং উদ্ভিদের ফুল ফোটার স্বাভাবিক ঋতুচক্র।
রাজধানী ঢাকা: হারিয়ে যাওয়া সেই অতীত
একসময় ঢাকা মানেই ছিল সবুজ বৃক্ষ, অসংখ্য পাখি আর পুকুর-জলাশয়ের সমাহার। বর্ষাকালে মাছের সমাহার আর ব্যাঙের ডাক ছিল চেনা দৃশ্য। আজ অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জলাশয় ভরাট এবং দূষণে তা শুধুই অতীত। তবে পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার অবশিষ্ট জলাশয়গুলো উদ্ধার ও দূষণমুক্ত করতে পারলে এখনো কিছু জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বাঁচার পথ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সঠিক ডেটাবেজ
আইইউসিএনের তথ্য মতে, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত নথিভুক্ত প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। তবে অতি-আহরণ ও মানুষের অসচেতনতায় লক্ষাধিক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির প্রহর গুনছে।
এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে উন্নত বিশ্ব এখন প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যামেরা ট্রাপিং, স্যাটেলাইট ও ড্রোন ইমেজের মাধ্যমে চোরা শিকার প্রতিরোধ, প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নির্ধারণে এআই দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
নদীমাতৃক ও জীববৈচিত্র্যের স্বর্গরাজ্য বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার এখনই সময়। তবে তার আগে প্রয়োজন আমাদের মেরুদণ্ডী, অমেরুদণ্ডী, উদ্ভিদ ও অণুজীবের সঠিক তথ্য-উপাত্ত বা ডেটাবেজ তৈরি করা। সঠিক তথ্য থাকলেই কেবল বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশের এই বিপন্ন প্রকৃতিকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 


















