সংবাদ শিরোনাম ::

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা

মায়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত হচ্ছেন সেইসব মানুষ যারা প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির এবং আধুনিক জনগণ, যারা মেক্সিকোর দক্ষিণে এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকাতে বসবাস করতো এবং তারা মায়াভাষী পরিবারের মানুষ। এটি ছিলো বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ঘন জন বসতি এবং সংস্কৃতিভাবে গতিশীল একটি সমাজ। সম্প্রতি মেক্সিকোর জঙ্গলে শতাব্দী ধরে লুকিয়ে থাকা বিশাল মায়া সভ্যতার একটি শহরের সন্ধান মিলেছে। এ আবিষ্কারটি মেক্সিকোর সাউথইস্টার্ন ক্যাম্পেচে রাজ্যে অবস্থিত। এটি প্রাচীন ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মায়া শহরগুলোর মধ্যে ক্যালাকমুলের পরে দ্বিতীয় শহর। ভ্যালেরিয়ানা শহরে দুটি প্রধান কেন্দ্রের মাঝে পিরামিড, মন্দির, অ্যাম্ফিথিয়েটার, খেলার কোর্ট এবং জলাধারসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই শহরে মায়া জনগণ প্রার্থনা করতেন, মূল্যবান জেড পাথরের মুখোশ এবং অন্যান্য ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখতেন এবং মৃতদের সমাহিত করতেন। এছাড়া শহরটির বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে বাসগৃহ ও রাস্তার নেটওয়ার্কও বিদ্যমান।

গবেষণার সহ-লেখক অধ্যাপক মার্সেলো কানুটো বলেন, পশ্চিমা ধারণায় যেভাবে অরণ্য এলাকা মানেই সভ্যতার শেষ বলে মনে করা হয়, এই আবিষ্কার তার বিপরীতে প্রমাণ দেয়। বরং এই অঞ্চলটি জটিল ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ছিল।

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা prokritibarta

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শহরটির সন্ধান মেলে লিডার প্রযুক্তির মাধ্যমে। টুলেন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি শিক্ষার্থী লুক অউল্ড-থমাস তাঁর ইন্টারনেটে ডেটা ব্রাউজ করার সময় শহরটির সন্ধান পান। লিডার প্রযুক্তির মাধ্যমে জঙ্গলের নিচে থাকা বস্তুর ম্যাপ তৈরি করে তিনি এই বিশাল প্রাচীন শহরের ছবি দেখতে পান। এই প্রযুক্তি জঙ্গল ও গাছপালার আড়ালে লুকানো কাঠামো চিহ্নিত করতে সক্ষম। গবেষকরা শহরটির নাম রেখেছেন ‘ভ্যালেরিয়ানা’ একটি নিকটবর্তী হ্রদের নামে।

লিডার প্রযুক্তি প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা, যেমন ক্রান্তীয় অঞ্চলে জরিপ চালাতে অনেক সাহায্য করেছে। এটি হারানো সভ্যতাগুলির একটি নতুন জগৎ উন্মোচন করেছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মার্সেলো ক্যানুতো। তার কর্মজীবনের প্রথম দিকে জরিপগুলো পায়ে এবং হাতে, সাধারণ যন্ত্র ব্যবহার করে চালান হতো। তখন প্রতি ইঞ্চি মাটি পরীক্ষা করা হত। কিন্তু লিডার প্রযুক্তি দিয়ে মেসোআমেরিকান অঞ্চলে জরিপের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১০ গুণ বেশি এলাকা ম্যাপ করা সম্ভব হয়েছে। পূর্বে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রায় এক শতাব্দী ধরে কাজ করে এ স্থান ম্যাপ করতে পেরেছিল।

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা prokritibarta

গবেষকরা মনে করছেন, এটি প্রাচীন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম মায়া শহর কালাকমুলের পরেই দ্বিতীয় বৃহৎ শহর। গবেষণার তথ্যমতে, শহরটিতে মায়া সভ্যতার স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন পাওয়া গেছে। শহরটির পরিসর ছিল প্রায় ১৬.৬ বর্গকিলোমিটার এবং এতে দুইটি প্রধান কেন্দ্র ছিল যা একে অপর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে মন্দির, পিরামিড, খেলাধুলার জন্য কোর্ট এবং প্রাচীন সম্পদের সম্ভার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শহরটিতে ৩০-৫০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, শহরটি খ্রিস্টীয় ৭৫০ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং স্প্যানিশ বিজেতাদের আগমনের কারণে শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করছে, প্রাচীন লাতিন আমেরিকায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলেও উন্নত ও জটিল সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছিল। উল্লেখ্য, মি. অউল্ড-থমাস এবং তার দল প্রাচীন মায়া সভ্যতার আরও গোপন শহরের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এখনও আরও বহু শহর জঙ্গলের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে। অল্ড-থমাস বলেন, যখন খরা শুরু হয়, তখন মনে হচ্ছে এলাকা সম্পূর্ণরূপে জনবহুল ছিল। সেখানে বেশি নমনীয়তা ছিল না। তাই সম্ভবত পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং মানুষ দূরে চলে যাচ্ছিল। যুদ্ধ এবং ১৬শ শতকে স্প্যানিশ আক্রমণকারীদের এ অঞ্চলের দখল নেওয়াটা মায়া নগররাষ্ট্রগুলোর ধ্বংসের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পর যখন মায়া সভ্যতা ধসে পড়তে শুরু করে তখন আংশিকভাবে অত্যধিক জনসংখ্যার কারণে এবং জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলায় অক্ষমতার কারণে শহরটির এমন পরিণতি হয়েছিল। গবেষণাটি অ্যাকাডেমিক জার্নাল অ্যান্টিকুইটিতে প্রকাশিত হয়েছে।

গোলাপী ফ্রক পরা পরীর কোলে গন্ধগোকুল, পেছনে হাঁটছে সজারু!

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা

আপডেট সময় ০৫:১৩:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৪

মায়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত হচ্ছেন সেইসব মানুষ যারা প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতির এবং আধুনিক জনগণ, যারা মেক্সিকোর দক্ষিণে এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকাতে বসবাস করতো এবং তারা মায়াভাষী পরিবারের মানুষ। এটি ছিলো বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ঘন জন বসতি এবং সংস্কৃতিভাবে গতিশীল একটি সমাজ। সম্প্রতি মেক্সিকোর জঙ্গলে শতাব্দী ধরে লুকিয়ে থাকা বিশাল মায়া সভ্যতার একটি শহরের সন্ধান মিলেছে। এ আবিষ্কারটি মেক্সিকোর সাউথইস্টার্ন ক্যাম্পেচে রাজ্যে অবস্থিত। এটি প্রাচীন ল্যাটিন আমেরিকার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মায়া শহরগুলোর মধ্যে ক্যালাকমুলের পরে দ্বিতীয় শহর। ভ্যালেরিয়ানা শহরে দুটি প্রধান কেন্দ্রের মাঝে পিরামিড, মন্দির, অ্যাম্ফিথিয়েটার, খেলার কোর্ট এবং জলাধারসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই শহরে মায়া জনগণ প্রার্থনা করতেন, মূল্যবান জেড পাথরের মুখোশ এবং অন্যান্য ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখতেন এবং মৃতদের সমাহিত করতেন। এছাড়া শহরটির বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে বাসগৃহ ও রাস্তার নেটওয়ার্কও বিদ্যমান।

গবেষণার সহ-লেখক অধ্যাপক মার্সেলো কানুটো বলেন, পশ্চিমা ধারণায় যেভাবে অরণ্য এলাকা মানেই সভ্যতার শেষ বলে মনে করা হয়, এই আবিষ্কার তার বিপরীতে প্রমাণ দেয়। বরং এই অঞ্চলটি জটিল ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ছিল।

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা prokritibarta

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শহরটির সন্ধান মেলে লিডার প্রযুক্তির মাধ্যমে। টুলেন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি শিক্ষার্থী লুক অউল্ড-থমাস তাঁর ইন্টারনেটে ডেটা ব্রাউজ করার সময় শহরটির সন্ধান পান। লিডার প্রযুক্তির মাধ্যমে জঙ্গলের নিচে থাকা বস্তুর ম্যাপ তৈরি করে তিনি এই বিশাল প্রাচীন শহরের ছবি দেখতে পান। এই প্রযুক্তি জঙ্গল ও গাছপালার আড়ালে লুকানো কাঠামো চিহ্নিত করতে সক্ষম। গবেষকরা শহরটির নাম রেখেছেন ‘ভ্যালেরিয়ানা’ একটি নিকটবর্তী হ্রদের নামে।

লিডার প্রযুক্তি প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য গাছপালা আচ্ছাদিত এলাকা, যেমন ক্রান্তীয় অঞ্চলে জরিপ চালাতে অনেক সাহায্য করেছে। এটি হারানো সভ্যতাগুলির একটি নতুন জগৎ উন্মোচন করেছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মার্সেলো ক্যানুতো। তার কর্মজীবনের প্রথম দিকে জরিপগুলো পায়ে এবং হাতে, সাধারণ যন্ত্র ব্যবহার করে চালান হতো। তখন প্রতি ইঞ্চি মাটি পরীক্ষা করা হত। কিন্তু লিডার প্রযুক্তি দিয়ে মেসোআমেরিকান অঞ্চলে জরিপের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১০ গুণ বেশি এলাকা ম্যাপ করা সম্ভব হয়েছে। পূর্বে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রায় এক শতাব্দী ধরে কাজ করে এ স্থান ম্যাপ করতে পেরেছিল।

মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া মায়া সভ্যতা prokritibarta

গবেষকরা মনে করছেন, এটি প্রাচীন লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম মায়া শহর কালাকমুলের পরেই দ্বিতীয় বৃহৎ শহর। গবেষণার তথ্যমতে, শহরটিতে মায়া সভ্যতার স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন পাওয়া গেছে। শহরটির পরিসর ছিল প্রায় ১৬.৬ বর্গকিলোমিটার এবং এতে দুইটি প্রধান কেন্দ্র ছিল যা একে অপর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে মন্দির, পিরামিড, খেলাধুলার জন্য কোর্ট এবং প্রাচীন সম্পদের সম্ভার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শহরটিতে ৩০-৫০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, শহরটি খ্রিস্টীয় ৭৫০ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং স্প্যানিশ বিজেতাদের আগমনের কারণে শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করছে, প্রাচীন লাতিন আমেরিকায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলেও উন্নত ও জটিল সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছিল। উল্লেখ্য, মি. অউল্ড-থমাস এবং তার দল প্রাচীন মায়া সভ্যতার আরও গোপন শহরের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করছেন, এখনও আরও বহু শহর জঙ্গলের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে। অল্ড-থমাস বলেন, যখন খরা শুরু হয়, তখন মনে হচ্ছে এলাকা সম্পূর্ণরূপে জনবহুল ছিল। সেখানে বেশি নমনীয়তা ছিল না। তাই সম্ভবত পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং মানুষ দূরে চলে যাচ্ছিল। যুদ্ধ এবং ১৬শ শতকে স্প্যানিশ আক্রমণকারীদের এ অঞ্চলের দখল নেওয়াটা মায়া নগররাষ্ট্রগুলোর ধ্বংসের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পর যখন মায়া সভ্যতা ধসে পড়তে শুরু করে তখন আংশিকভাবে অত্যধিক জনসংখ্যার কারণে এবং জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলায় অক্ষমতার কারণে শহরটির এমন পরিণতি হয়েছিল। গবেষণাটি অ্যাকাডেমিক জার্নাল অ্যান্টিকুইটিতে প্রকাশিত হয়েছে।