বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে একটি শব্দ নব্বই দশক থেকে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়ে আসছে,সেটি হলো ওজোন স্তর। ওজোন স্তর ক্ষয় হয়ে সূর্যের তাপে পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে বোঝাতে গিয়ে শুরু হয়েছিল গ্রিনহাউজ ইফেক্ট নামের চিরচেনা শব্দের সেই বিখ্যাত উদাহরণ। ব্যাপক প্রচারণা এবং বৈশ্বিক ঐক্যে ওজোন স্তর ক্ষয়ের ভয়াল পরিণতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে বিশ্ববাসী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওজোন স্তরের যে ক্ষতি মানুষ করে ফেলেছিল ,তা কমে আসছে।
গবেষকরা বলছেন, দক্ষিণ মেরুতে এন্টার্কটিকার ওপরে ওজোন স্তরের ক্ষতের পরিধি যে কমে আসছে এই দাবির পক্ষে তারা পরিষ্কার তথ্য প্রমাণ পেয়েছেন।

ওজোন স্তরের এই যে আরোগ্য লাভ, তার মূল কারণ বৈশ্বিক ঐক্য। ওজোন স্তরের ক্ষতি করে এমন সব রাসায়নিক নিষিদ্ধে ১৯৮৭ সালে যে আন্তর্জাতিক চুক্তি (মন্ট্রিল প্রটোকল) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা অবশেষে সফল হয়েছে বলে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ওজন স্তর রক্ষায় নব্বই দশক ধরেই চলছে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা। ওজোন স্তরের ক্ষয় এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা সৃষ্টি ও করণীয় বিষয়ে জনসম্পৃক্ততার লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ওজোন দিবস ঘোষণা করে। সেই থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবছর ওজোন দিবসের মূলপ্রতিপাদ্য, ‘করব ওজোন স্তর সংরক্ষণ, রুখব জলবায়ু পরিবর্তন।’
গবেষকরা আশার কথা বললেও বিশ্ববাসীকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। কারণ অ্যান্টার্কটিকার ওপরে ওজোন স্তরে যে বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে, তা ২০৬৬ সালের আগে সম্পূর্ণভাবে সেরে উঠবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
ওজোন স্তর কী, পৃথিবীর জন্য কেন দরকারী?
বায়ুমণ্ডলের দ্বিতীয় স্তর স্ট্রাটোমণ্ডলের নিচের অংশে ওজোন স্তরের অবস্থান, যা ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২০-৩০ কিলোমিটার ঊর্ধ্বে। ফরাসি পদার্থবিদ চার্লস ফ্যাব্রি এবং হেনরি বুইসন এটি আবিষ্কার করেন। ওজোনের ঘনত্ব খুব কম হলেও সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত ক্ষতিকর অতিবেগুনি তেজস্ক্রিয় রশ্মির প্রায় ৯৯ শতাংশ শোষণ করে নিতে পারে। এ রশ্মির প্রভাবে দুরারোগ্য ক্যানসার, চোখের ছানি পড়া, প্রজনন ক্ষমতার হ্রাস, মানুষের গড় আয়ু হ্রাস, উভয়চর প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া, উদ্ভিদের ক্লোরোসিস রোগ, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, খাদ্যচক্রের ক্ষতিসাধন, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করে। ওজোন স্তর অতিবেগুনি রশ্মি শোষণের মাধ্যমে উদ্ভাসিত জীবসমূহকে এমন ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। ওজোন স্তর ১০ শতাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর এ রোগে প্রায় ৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। তাই ওজোন স্তরকে প্রাকৃতিক সৌরপর্দা বলে।

ওজোন গ্যাসের ঘনত্ব ২০০ ডবসন এককের চেয়ে কমে গেলে তাকেই ওজোন গর্ত বা গহ্বর বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের মতে, ওজোন স্তরের ক্ষয় মূলত মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। আধুনিক বিশ্বে জীবনযাত্রাকে সহজ ও উন্নত করতে প্রথম ১৯৬০ সালে বাণিজ্যিকভাবে শীতলীকরণ কাজে যেমন, রেফ্রিজারেটর, হিমাগার, হেয়ার স্প্রে, এয়ারকন্ডিশন, ফোম শিল্প ইত্যাদিতে হ্যালোজেন (সিএফসি) ব্যবহার করা হয়। এ সিএফসি গ্যাস বায়ুমণ্ডলে প্রবেশকৃত এক-শতাংশ অতিবেগুনি তেজস্ক্রিয় রশ্মি দ্বারা ফ্রি-রেডিক্যাল উৎপন্ন করে, যা ওজোনকে ভেঙে অক্সিজেনে রূপান্তরিত করে। হ্যালোজেন মৌল ক্লোরিন ৫০-১০০ বছর পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারে এবং ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে।
মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন উৎস ছাড়াও প্রাকৃতিক ঘটনা যেমন-অগ্নুৎপাত, বজ্রপাত, আলোক-রাসায়নিক বিক্রিয়া ইত্যাদি কারণেও ওজোন স্তর কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওজোন স্তর ক্ষয়ের বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে ১৯৭৮ সালে পরিচালিত চিলির ‘পুনটা এরিনাস’ অভিযানে কুমেরুর আকাশে ধরা পড়ে। প্রতি দশকে স্ট্রাটোমণ্ডলে চার শতাংশ ওজোন স্তরের ক্ষয় হতো বলে ধারণা করা হয়; এটিকে বিজ্ঞানীরা ওজোন ছিদ্র বলে অভিহিত করেন।
অস্তিত্বের ঐক্য ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’
ওজোন স্তর ক্ষয়ে তেজস্ক্রিয় অতিবেগুনি রশ্মির দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলবায়ু। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর উদাহরণ। বাংলাদেশ নদীমাতৃক এবং সমুদ্রতীরবর্তী হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। এটি জলজ জীবন এবং স্থলজ জীবন তথা বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করেন গবেষকরা। জীববৈচিত্র্যের তারতম্যের কারণে অনেক প্রাণী এবং সমুদ্র তলদেশে থাকা ফাইটোপ্লাংকটনসহ হুমকির সম্মুখীন ছিল জীবজগত। তাই অস্তিত্ব রক্ষায় ওজন স্তরের ক্ষত মেরামতে প্রয়োজন ছিল বৈশ্বিক ঐক্যের।
মন্ট্রিল প্রটোকল হচ্ছে ওজোন স্তর রক্ষা করার সেই বৈশ্বিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক চুক্তি। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয়ের জন্য দায়ী দ্রব্যগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার জন্য ১৯৮৫ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থের ওপর কানাডার মন্ট্রিলে ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এ প্রটোকল বা চুক্তি গৃহীত হয়। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত সব দেশ মন্ট্রিল প্রটোকল এবং সংশোধনীসমূহে অনুস্বাক্ষর করে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৮১টি রাষ্ট্র কিগালি সংশোধনীতে অনুস্বাক্ষর করেছে এবং এতে ১৮ প্রকার এইচএফসি (হাইড্রোফ্লোরোকার্বন) নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। এ প্রটোকল অনুযায়ী যেসব ওজোন ডিপ্ল্যান্টিং সাবস্ট্যান্সগুলো ওজোন স্তর ক্ষয় করে, সেই গ্যাসগুলো আর কোনো দেশ আমদানি-রপ্তানি বা ব্যবহার করতে পারবে না।
ওজোন স্তরের ক্ষত নিরাময় করতে বিশ্ববাসীর যে সম্মিলিত চেষ্টা, সেই চেষ্টা-ঐক্য জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দেখা যাবে এমনটাই কাম্য প্রত্যেক সচেতন বিশ্ববাসীর।
ডেস্ক রিপোর্ট 




















