বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ বাংলা ২২ শ্রাবণ, বুধবার ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। এইদিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৪তম প্রয়াণ দিবস উদযাপিত হচ্ছে। ইংরেজী, ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, এই দিনে, বাংলা সাহিত্যের অমর কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চির বিদায় নেন। কবিগুরুর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। অজস্র রচনায় বাংলার বর্ষাকে তিনি অনিন্দ্য সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে বর্ষা ঋতুতেই চিরবিদায় নেন কবি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বৈচিত্র্যময় শিল্প সৃষ্টি, সংগীত ও সাহিত্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজও বাঙালির জীবনের অনেকটা জুড়ে রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নানাভাবে বাঙালির জীবনকে সমৃদ্ধ করছে। বিশ্বকবির সৃষ্টির পথ ধরেই বাঙালি ও বাংলাভাষীরা বিশ্ব সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল আয়োজনে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলছেন। দেশজ শিক্ষাব্যবস্থা বিকাশের লক্ষ্যে তিনি গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি একজন সমাজসংস্কারকও ছিলেন।
২২শে শ্রাবণকে ঘিরে বাংলার মানুষ প্রতি বছর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগে তাঁকে স্মরণ করে। তাঁর সাহিত্যকর্ম, গান, কবিতা, নাটক ও দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং প্রেরণাদায়ী।
এই দিনটিকে স্মরন করে আজ থাকছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা:
- কবিগুরুর গান ও কবিতাপাঠ
- আলোচনা সভা ও স্মরণানুষ্ঠান
- রবীন্দ্রসঙ্গীতের পরিবেশনা
- বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিশেষ আয়োজন
- বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার এবং বেসরকারি টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও নাটক প্রচার।
- এবং সরকারি উদ্যোগে নানান আয়োজন।
বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য প্রতিভা বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫শে বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৬১ সালের ৭ মে) পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২শে শ্রাবণ (১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট) কলকাতায় পৈতৃক বাসভবনেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাঙালির জীবনে তাই ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও প্রকৃতির পঙক্তির মতোই ‘শ্রাবণের বারিধারা ঝরিছে বিরামহারা, বিজন শূন্য-পানে চেয়ে থাকি একাকী।’ ৮০ বছর বয়সে চলে গেলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ মৃত্যু দেহান্তর মাত্র। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনেক কিছুরই প্রথম রূপকার তিনি। তার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য নতুন যুগের সৃষ্টি হয়।
বাংলা ১৩৪৮ সনের শ্রাবণ মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। ৩০ জুলাই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন। ঠাকুরবাড়িতে রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে তিনি বলতেন, তাঁর মুখে বলা সেইসব রচনার অনুলিপিকার ছিলেন রবীন্দ্র স্নেহধন্যা বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও লেখিকা রানী চন্দ।
মহাপ্রয়াণের মাত্র দিন কয়েক আগে এভাবেই লিখিত হয়েছিল তাঁর শেষ কবিতা, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি’।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার, চিত্রশিল্পী, সংগীতস্রষ্টা, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী, সমাজসংস্কারক ও দার্শনিক। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যের সীমা ছাড়িয়ে শিক্ষা, দর্শন, পল্লী ও কৃষি উন্নয়নের মতো নানা বিষয়ে তিনি নিজের মনীষা ও বহুমুখী চিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, কবিতা ও সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিভিন্নভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
এ সব মৌলিক সৃজনশীলতার বাইরেও কবির প্রতিভার স্ফুরণ রয়েছে। জমিদার পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি জমিদারিও করেছেন। তার প্রজাহিতৈষী মনোভাব সর্বজন বিদিত। তিনি ১৮৯১ সাল থেকে বাবার আদেশে কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও ওড়িশায় তাদের জমিদারি দেখাশোনা করেন। সেখানকার পৈতৃক ‘কুঠিবাড়িতে’ তিনি অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করেন। পাশাপাশি তিনি ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০১ সালে কবি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে সপরিবারে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে চলে যান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিশ্বভারতী’।
প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার এবং বেসরকারি টেলিভিশনগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও নাটক প্রচার করবে। রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে আজ বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় ছায়ানটে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত। ছায়ানটের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী কালের কণ্ঠকে জানান, অনুষ্ঠানে গীতি আলেখ্যসহ নানা আয়োজন থাকছে। এদিকে বাংলা একাডেমির আয়োজনে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। বিকেল ৪টায় একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনারকক্ষে হবে অনুষ্ঠানটি। এতে মূল বক্তা থাকবেন গবেষক ও সমালোচক অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল। আলোচনা করবেন কবি ও লেখক ড. মাহবুব হাসান, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রহমান হাবিব, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ও বাংলা একাডেমির সচিব মো. সেলিম রেজা। বিকেল ৫টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকছে আবৃত্তি ও রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনা।
সবশেষে; আজও তাঁর সাহিত্যকর্ম, দর্শন এবং চিন্তা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তিনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। ২২শে শ্রাবণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল এই দিনে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত। তাঁর গান, কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ সবকিছুতেই তিনি চিরভাস্বর হয়ে আছেন, থাকবেন।
মাসুদুর রহমান 




















