সংবাদ শিরোনাম ::
Logo যে আদিম মাছটি এখনো সাঁতরে বেড়ায় বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীতে Logo আরেকটি বৃষ্টিবলয় সক্রিয় হতে পারে ১২ মে থেকে, প্রভাব বেশি থাকতে পারে ৩ বিভাগে Logo প্রকৃতিমা: জননী ও ধরিত্রী যেন একই সত্তা, সৃষ্টি আর ধৈর্যে একাকার Logo জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন: পুলিশের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন থালাপতি বিজয় Logo গাজীপুরে ৫ খুনের ঘটনায় মামলা দায়ের, প্রধান আসামি ফোরকান Logo মুকিত মজুমদার বাবুকে পাশে চায় দূষণে জর্জরিত সাভারবাসী Logo জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবর্ধিত মুকিত মজুমদার বাবু Logo ভোলায় ৪০ কেজি ওজনের ৯ ফুট দৈর্ঘ্যের দানবীয় গুইসাপ উদ্ধার Logo গ্রিন এনার্জি: রাজধানীর সব বাড়িতে সোলার প্যানেল বসাতে চায় সরকার

যে আদিম মাছটি এখনো সাঁতরে বেড়ায় বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীতে

যে আদিম মাছটি এখনো সাঁতরে বেড়ায় বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীতে

কয়েকদিন একটি খবর ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে। দাবি করা হচ্ছে ডাইনোসর যুগের কোনো এক মাছ নাকি আছে বাংলাদেশে। সম্ভবত আজকালের রিলস দেখতে অভ্যস্ত পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এমন চটকদার আশ্চর্যবোধক শিরোনাম দেয়া ছাড়া উপায়ও নেই। আসলে সত্যি বলতে, বাংলাদেশে ডাইনোসরযুগের কোনো মাছ নেই। গভীর সমুদ্রে কোয়েলাকান্ত মিললেও সেই মাছকেও একেবারে ডাইনোসরযুগের বলা যাবে না। অন্যদিকে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো পাহাড়ি নদীর মহাশোলকে ডাইনোসরযুগের বলে চালিয়ে দিলেও আসলে এটিও ডাইনোসরদের সমসাময়িক নয়।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি তুলনামূলক তরুণ বদ্বীপ (প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি), যা ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার (প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে) অনেক পরে গঠিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশে ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে জীবন্ত কিছুতো আরও দূরের কথা, তবে মহাশোলের মতো প্রাচীন বংশধারার মাছগুলো প্রকৃতির বিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে আজও টিকে আছে।

অর্থাৎ ডাইনোসরযুগের না হলেও বাংলার পাহাড়ি মহাশোল অবশ্যই আদিম এক মাছ। যা প্রকৃতির বিরূপ পরিবেশে হাজার বছর টিকে থাকলেও এখন মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে এখন অতি বিপন্নের তালিকায়।

মহাশোল কার্প গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারের মাছগুলো বহু মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবর্তন ও বরফ যুগ পেরিয়ে আজও টিকে আছে।আকার ও শক্তি: এই মাছগুলো বিশালাকৃতির এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে। একটি পূর্ণবয়স্ক মহাশোলের ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি বা তার বেশি হতে পারে। এর বড় আঁশ এবং দীর্ঘ গঠনের কারণে একে অনেক সময় “নদীর রাজা” বা “নদীর লড়াকু যোদ্ধা” বলা হয়।

বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীগুলোর অন্যতম আকর্ষণীয় মাছ মহাশোল (Mahseer – Tor tor এবং Tor putitora) বর্তমানে দেশের অন্যতম ‘অতি বিপন্ন’ (Critically Endangered) মাছের তালিকায় রয়েছে।

এটি মূলত স্বচ্ছ, খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর পাথর-নুড়ি বেষ্টিত স্থানে বসবাস করে। বাংলাদেশে মহাশোল মাছ বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি নির্দিষ্ট পাহাড়ি নদী ও জলাধারে টিকে আছে। নেত্রকোনার সোমেশ্বরী ও কংস নদীতে এদের এখনো পাওয়া যায়। বিশেষ করে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের এই খরস্রোতা নদীতে সোনালি মহাশোল (Tor tor) এবং লাল-পাখনা মহাশোল (Tor putitora) পাওয়া যায়।

মহাশোল আজ অতিবিপন্ন

পাহাড়ি নদীতে বাঁধ নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন এবং পানির প্রবাহ কমে যাওয়া।

পাথর উত্তোলন ও দূষণ: মেঘালয় থেকে নেমে আসা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে শ্যাওলা (তাদের প্রধান খাদ্য) ও প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে।

অতিরিক্ত মাছ শিকার: বড় ও ছোট নির্বিচারে সব মাছ শিকারের ফলে নতুন প্রজন্মের জন্ম কমে গেছে।

প্রজনন বাধা: প্রজননের সময়ে মাছেরা উজানে যেতে পারে না, ফলে বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

বর্তমান আবাসস্থল একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার পাহাড়ি নদীতে প্রচুর মহাশোল পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এটি মূলত নেত্রকোনার সোমেশ্বরী ও কংস নদীতে খুবই সীমিত পরিসরে টিকে আছে।

সংরক্ষণ ও কৃত্রিম প্রজনন উদ্যোগ

মহাশোলকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে:

কৃত্রিম প্রজনন: BFRI-এর বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর মহাশোলের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন করেছেন।

সংরক্ষণ: ‘মা মাছ’ সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে তা আবার নদীতে অবমুক্ত করার কার্যক্রম চলছে।

চাষাবাদ: খামারে বা পুকুরে চাষের জন্য চাষিদের মধ্যে পোনা বিতরণ করা হচ্ছে, যা এই সুস্বাদু মাছটিকে বাঙালির পাতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে নির্বিচার নিধনও কমবে।

মহাশোল মাছের এই ঐতিহাসিক এবং পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা করে, এর স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্র বা অভয়ারণ্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

যে আদিম মাছটি এখনো সাঁতরে বেড়ায় বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীতে

যে আদিম মাছটি এখনো সাঁতরে বেড়ায় বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীতে

আপডেট সময় ০৬:২৯:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

কয়েকদিন একটি খবর ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে। দাবি করা হচ্ছে ডাইনোসর যুগের কোনো এক মাছ নাকি আছে বাংলাদেশে। সম্ভবত আজকালের রিলস দেখতে অভ্যস্ত পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এমন চটকদার আশ্চর্যবোধক শিরোনাম দেয়া ছাড়া উপায়ও নেই। আসলে সত্যি বলতে, বাংলাদেশে ডাইনোসরযুগের কোনো মাছ নেই। গভীর সমুদ্রে কোয়েলাকান্ত মিললেও সেই মাছকেও একেবারে ডাইনোসরযুগের বলা যাবে না। অন্যদিকে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো পাহাড়ি নদীর মহাশোলকে ডাইনোসরযুগের বলে চালিয়ে দিলেও আসলে এটিও ডাইনোসরদের সমসাময়িক নয়।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি তুলনামূলক তরুণ বদ্বীপ (প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি), যা ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার (প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে) অনেক পরে গঠিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশে ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে জীবন্ত কিছুতো আরও দূরের কথা, তবে মহাশোলের মতো প্রাচীন বংশধারার মাছগুলো প্রকৃতির বিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে আজও টিকে আছে।

অর্থাৎ ডাইনোসরযুগের না হলেও বাংলার পাহাড়ি মহাশোল অবশ্যই আদিম এক মাছ। যা প্রকৃতির বিরূপ পরিবেশে হাজার বছর টিকে থাকলেও এখন মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে এখন অতি বিপন্নের তালিকায়।

মহাশোল কার্প গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারের মাছগুলো বহু মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবর্তন ও বরফ যুগ পেরিয়ে আজও টিকে আছে।আকার ও শক্তি: এই মাছগুলো বিশালাকৃতির এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে। একটি পূর্ণবয়স্ক মহাশোলের ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি বা তার বেশি হতে পারে। এর বড় আঁশ এবং দীর্ঘ গঠনের কারণে একে অনেক সময় “নদীর রাজা” বা “নদীর লড়াকু যোদ্ধা” বলা হয়।

বাংলাদেশের পাহাড়ি নদীগুলোর অন্যতম আকর্ষণীয় মাছ মহাশোল (Mahseer – Tor tor এবং Tor putitora) বর্তমানে দেশের অন্যতম ‘অতি বিপন্ন’ (Critically Endangered) মাছের তালিকায় রয়েছে।

এটি মূলত স্বচ্ছ, খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর পাথর-নুড়ি বেষ্টিত স্থানে বসবাস করে। বাংলাদেশে মহাশোল মাছ বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি নির্দিষ্ট পাহাড়ি নদী ও জলাধারে টিকে আছে। নেত্রকোনার সোমেশ্বরী ও কংস নদীতে এদের এখনো পাওয়া যায়। বিশেষ করে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের এই খরস্রোতা নদীতে সোনালি মহাশোল (Tor tor) এবং লাল-পাখনা মহাশোল (Tor putitora) পাওয়া যায়।

মহাশোল আজ অতিবিপন্ন

পাহাড়ি নদীতে বাঁধ নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন এবং পানির প্রবাহ কমে যাওয়া।

পাথর উত্তোলন ও দূষণ: মেঘালয় থেকে নেমে আসা নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে শ্যাওলা (তাদের প্রধান খাদ্য) ও প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে।

অতিরিক্ত মাছ শিকার: বড় ও ছোট নির্বিচারে সব মাছ শিকারের ফলে নতুন প্রজন্মের জন্ম কমে গেছে।

প্রজনন বাধা: প্রজননের সময়ে মাছেরা উজানে যেতে পারে না, ফলে বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

বর্তমান আবাসস্থল একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার পাহাড়ি নদীতে প্রচুর মহাশোল পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এটি মূলত নেত্রকোনার সোমেশ্বরী ও কংস নদীতে খুবই সীমিত পরিসরে টিকে আছে।

সংরক্ষণ ও কৃত্রিম প্রজনন উদ্যোগ

মহাশোলকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI) বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে:

কৃত্রিম প্রজনন: BFRI-এর বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর মহাশোলের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন করেছেন।

সংরক্ষণ: ‘মা মাছ’ সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে তা আবার নদীতে অবমুক্ত করার কার্যক্রম চলছে।

চাষাবাদ: খামারে বা পুকুরে চাষের জন্য চাষিদের মধ্যে পোনা বিতরণ করা হচ্ছে, যা এই সুস্বাদু মাছটিকে বাঙালির পাতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে নির্বিচার নিধনও কমবে।

মহাশোল মাছের এই ঐতিহাসিক এবং পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা করে, এর স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্র বা অভয়ারণ্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।