সবুজ গাছপালা আর নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখরিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। তবে প্রযুক্তির অভাব এবং সঠিক নথিবদ্ধকরণ বা ডকুমেন্টেশন না থাকায় এতকাল ক্যাম্পাসের অনেক মূল্যবান জীববৈচিত্র্যের তথ্যই থেকে গেছে আড়ালে। যুগের সেই চাহিদাকে মাথায় রেখে এবার রাবি ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও প্রাণিজগতকে ডিজিটাল ডাটাবেজে বন্দি করতে চালু হলো এক অভিনব মোবাইল অ্যাপ—‘বায়োব্লিটজ’ (BioBlitz)।
বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসকে সামনে রেখে পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন লাইফ, নেচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ ক্লাব (LINERC) এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অ্যাপটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
📱 কী এই ‘বায়োব্লিটজ’ অ্যাপ?
‘বায়োব্লিটজ’ মূলত একটি সিটিজেন সায়েন্স বা নাগরিক বিজ্ঞান-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। এর মূল লক্ষ্য হলো রাবি ক্যাম্পাসের প্রতিটি উদ্ভিদ, পাখি, কীটপতঙ্গ এবং সরীসৃপের নিখুঁত ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা।
প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কাজ শুরু হলেও, আয়োজকরা জানিয়েছেন খুব দ্রুতই অ্যাপটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তখন যেকোনো সাধারণ শিক্ষার্থী, গবেষক বা প্রকৃতিপ্রেমী ক্যাম্পাসে হাঁটার সময় কোনো অচেনা পাখি বা উদ্ভিদের ছবি তুলে, তার অবস্থান (Location) ও সময়সহ অ্যাপে আপলোড করতে পারবেন।
🗺️ মাঠপর্যায়ে তরুণদের ‘প্রকৃতি শিকার’
অ্যাপটি উদ্বোধনের আগের দিন, অর্থাৎ গত বুধবার (২০ মে) ক্যাম্পাসে রীতিমতো উৎসবমুখর পরিবেশে পরিচালিত হয় ‘বায়োব্লিটজ’ জরিপ।
- অংশগ্রহণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।
- কাজের কৌশল: শিক্ষার্থীদের ৫ জন করে মোট ১৫টি দলে ভাগ করে দেওয়া হয়।
- অভিযান: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এই তরুণ পরিবেশকর্মীরা ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে ঘুরে বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেন এবং তা সাথে সাথে অ্যাপের সার্ভারে জমা করেন।
🧠 যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে LINERC-এর সভাপতি মো. আব্দুল বারী অ্যাপটির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, শুধু তথ্য সংগ্রহই নয়, আগামীতে অ্যাপটিতে যুক্ত করা হবে আধুনিক সব ফিচার:
- এআই প্রজাতি শনাক্তকরণ: কোনো গাছের পাতা বা পাখির ছবি তুললেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার প্রজাতি ও বৈজ্ঞানিক নাম জানিয়ে দেবে।
- ইন্টারেক্টিভ ম্যাপ: কোন এলাকায় কোন প্রাণীর আনাগোনা বেশি, তা মানচিত্রের মাধ্যমে দেখা যাবে।
- জাতীয় সম্প্রসারণ: রাবি ক্যাম্পাসে সফলতার পর দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এই অ্যাপের ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
💬 “অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই” — বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সেমিনারে উপস্থিত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদরা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিধান চন্দ্র দাস তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এখন আর কেবল শৌখিনতার বিষয় নয়, এটি মানুষের নিজেদের টিকে থাকার লড়াই।
উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হাসানুর রহমান এবং পরিবেশবিদ মাহাবুবুল ইসলাম পলাশ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই প্রযুক্তিনির্ভর ডেটাবেজটি একদিকে যেমন বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও প্রাণী রক্ষায় গবেষকদের সাহায্য করবে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের মাঝে প্রকৃতি ও পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















