বাংলাদেশের একটি খামারে জন্ম নেওয়া এক অদ্ভুত রঙের মহিষ এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণত আমাদের দেশে কালো বা ধূসর রঙের মহিষ দেখা গেলেও, এই মহিষটির গায়ের রঙ গোলাপি এবং এর মাথায় রয়েছে সোনালী রঙের পশমের এক চমৎকার স্তূপ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কেউ যেন তাকে নিখুঁতভাবে হেয়ারস্টাইল করে দিয়েছে!
মহিষটি এবার কোরবানির পশুর হাটে ব্যাপক আলোচিত, কারণ নাম তার ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুল এবং গায়ের রঙের সাথে অবিকল মিল থাকায় মহিষটির এই নামকরণ করা হয়েছিল। এই নামকরণ ও আসল ট্রাম্পের সাথে বেশ মিল থাকায় শুরুতে দেশীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয় মহিষটি। এরপর জায়গা করে নিয়েছে বিশ্ব গণমাধ্যমেও।
বিশ্ব গণমাধ্যম—যেমন এএফপি, ডন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা একে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষ’ বা রসিকতা করে ‘কমান্ডার-ইন-বিফ’ (Commander-in-Beef) নামে আখ্যায়িত করেছে। আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এই মহিষটিকে দেখতে খামারে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছেন।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমগুলোর পর গত কয়েকদিনে মহিষটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ, ফ্রান্সের জনপ্রিয় টেলিভিশন টিএফওয়ান, বার্তা সংস্থা এএফপি, পাকিস্তানের দৈনিক ডন, ভারতের এনডিটিভি ও থাইল্যান্ডের ব্যাংকক পোস্ট।

টেলিগ্রাফ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশে কোরবানি হতে যাচ্ছে অ্যালবিনো মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এতে বলা হয়েছে, সোনালী রঙের বাহারি চুলের কারণে মহিষটির নাম রাখা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামানুসারে। সোনালী চুলের ঝুঁটি থাকা প্রায় দেড় হাজার পাউন্ড ওজনের এই মহিষটি ইতোমধ্যে তারকা বনে গেছে।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, চলতি মাস জুড়ে নারায়ণগঞ্জে জিয়া উদ্দিন মৃধার খামারে মহিষটি দেখতে উৎসুক জনতা ভিড় করছেন। জিয়ার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, চার বছর বয়সী এই মহিষকে তিনি গত এক বছর ধরে লালন-পালন করেছেন। কোরবানির পর তিনি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুব মিস করবেন’।
টিএফওয়ান তাদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমের পেজে মহিষটিকে নিয়ে একটি শর্টস ভিডিও প্রকাশ করেছে। বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, ‘মহিষটির চুলের বাহার নিখুঁত রাখতে মালিকেরা প্রতিদিন সেটি ব্রাশ করেন।’ ফরাসি ভাষার এই গণমাধ্যমটির শর্টস ভিডিও ইউটিউবে ৩ লাখ ৬৬ হাজার বার দেখা হয়েছে। ফেসবুকে লাইক দিয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ব্যবহারকারী, দেখা হয়েছে ৬২ লাখের বেশি।
ইউরোপের আরেক গণমাধ্যম ইউরো নিউজ লিখেছে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ডাকনামের মহিষটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মহিষটি নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের দৈনিক ডন। তারা শিরোনাম করেছে, ‘কমান্ডার-ইন-বিফ: বাংলাদেশিজ ডোনাল্ড ট্রাম্প বাফেলো উইনস ফ্যানস’।
খামারের মালিক জিয়া উদ্দিনের উদ্ধৃতিতে ব্যাংকক পোস্ট লিখেছে, প্রায় ১০ মাস আগে রাজশাহীর একটি পশুর হাট থেকে মহিষটি কেনা হয়েছিল। এরপর জিয়ার ভাই সেটির নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।
কেন এই মহিষের রঙ এমন? (বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা)
সাধারণ মহিষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য এই রঙের পেছনে কোনো কৃত্রিম ডাই বা রং ব্যবহার করা হয়নি। প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, এটি মূলত একটি জন্মগত জিনগত অবস্থা (Genetic Condition)। এর পেছনে দুটি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে পারে:
১. অ্যালবিনিজম (Albinism) বা শ্বেতী
প্রাণীদেহের ত্বক, চুল বা পশমের স্বাভাবিক রঙের জন্য দায়ী উপাদানটির নাম হলো মেলানিন (Melanin)। যখন কোনো প্রাণীর শরীরে জন্মগত জিনগত ত্রুটির কারণে মেলানিন একেবারেই তৈরি হতে পারে না, তখন সেই অবস্থাকে অ্যালবিনিজম বলা হয়। অ্যালবিনো বা শ্বেতী আক্রান্ত মহিষের গায়ের চামড়া হালকা গোলাপি বা সাদাটে হয় এবং পশম হয় একদম হালকা সোনালী বা সাদা। এই মহিষটির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।
২. লিউসিজম (Leucism)
আরেকটি সম্ভাবনা হলো লিউসিজম। এই অবস্থায় প্রাণীর শরীরে আংশিকভাবে মেলানিন বা অন্যান্য রঞ্জক পদার্থের ঘাটতি দেখা যায়। লিউসিজমের কারণে প্রাণীর চোখ স্বাভাবিক থাকতে পারে (যা অ্যালবিনিজমে সাধারণত লালচে বা নীলচে হয়), তবে শরীরের পশম ও চামড়া সোনালী বা সাদাটে হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের মহিষ অত্যন্ত বিরল। প্রতি লাখে হয়তো দুই-একটি মহিষ এমন জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সোনালী বা সাদা রঙ নিয়ে জন্মায়। জিনগত এই পরিবর্তনের কারণে এদের শুধু রঙের পরিবর্তন হয়, তবে মাংসের গুণগত মান বা স্বাস্থ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।
খামারের আকর্ষণ ও আকাশচুম্বী দাম
খামার মালিক জানান, মহিষটির মাথায় প্রাকৃতিকভাবেই এমন সোনালী চুলের চমৎকার ছাঁট রয়েছে, যা ট্রাম্পের চুলের অবয়বকে মনে করিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এটিকে দেখতে আসছেন।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এই বিশেষ “ডোনাল্ড ট্রাম্প” মহিষটির দামও হাঁকা হচ্ছে সাধারণ মহিষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। শৌখিন ক্রেতারা অনন্য এই প্রাণীটিকে সংগ্রহ করার জন্য খামারির সাথে যোগাযোগ করছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কল্যাণে বাংলাদেশের এই মহিষটি এখন বৈশ্বিক বিনোদনের একটি খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















