অবহেলার জীবনগাছে পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির নতুন আশা

  • নাসিমুল শুভ
  • আপডেট সময় ১২:৫৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • 10

মেঠোপথের ধারে, ঝোপঝাড়ে কিংবা বনভূমির প্রান্তে অনাদরে বেড়ে ওঠা যে গাছটিকে এতদিন কেবলই অবহেলিত মনে করা হতো, সেই দেশীয় প্রজাতি ‘জীবনগাছ’ (Trema orientalis) এখন স্থানীয় অর্থনীতি ও উদ্ভাবনে তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনা। উত্তরের ক্রিকেট ব্যাটের কারখানায় আমদানিনির্ভর কাঠের বিকল্প হিসেবে এর কাঠ ব্যবহারের সাফল্য কেবল কারিগরদের মুখেই হাসি ফোটায়নি, একই সঙ্গে গবেষক ও উদ্যোক্তাদের মাঝেও জাগিয়ে তুলেছে নতুন আশার আলো। গ্রামীণ বনায়ন থেকে শুরু করে খেলার সামগ্রী তৈরি ও পশুখাদ্য—একটি মাত্র প্রজাতিকে কেন্দ্র করে কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আয়ের একটি নতুন অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরির যে দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে, তার অনুসন্ধানে কাজ করে চলেছে গবেষণা সংস্থা ‘ডাহুক’।

ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে ব্যবহার
​উত্তরাঞ্চলের ক্রিকেট ব্যাটের কারিগর গোপাল দাস জানান, তাঁর কারখানায় জীবনগাছের কাঠ নিয়মিতভাবে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় কাঠের মিল থেকে তিনি প্রায় দুই ফুট দৈর্ঘ্যের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরা সংগ্রহ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ কাঠ স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।


​গোপাল দাসের কারখানায় জীবনগাছের কাঠের নিয়মিত ব্যবহার এ প্রজাতির কাঠের ব্যবহারিক সম্ভাবনার একটি মাঠপর্যায়ের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কাঠের গুণমান ও সরবরাহব্যবস্থা আরও উন্নত করা সম্ভব হলে স্থানীয়ভাবে ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
​ডাহুকের পরিচালক মাগফি রেজা সিদ্দিক বলেন, জীবনগাছের বাণিজ্যিক উৎপাদনচক্র তুলনামূলকভাবে স্বল্প হওয়ায় এ প্রজাতিকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোক্তা উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত গাছ স্থানীয় কাঠের মিলে প্রক্রিয়াজাত হয়ে কারখানায় ক্রীড়াসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হলে কৃষক, কাঠ ব্যবসায়ী, কারিগর ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি স্থানীয় মূল্যশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আঞ্চলিক পরিসর সম্প্রসারণের সুযোগ
​জীবনগাছের কাঠের ব্যবহার উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্রিকেট ব্যাট ও অন্যান্য ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কারিগর রয়েছেন। এসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে জীবনগাছের চাষ বা সামাজিক বনায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদনের জন্য স্থানীয়ভাবে কাঁচামালের একটি উৎস গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
​ডাহুকের অনুসন্ধানে জীবনগাছকে শুধু কাঠ উৎপাদনকারী প্রজাতি হিসেবে নয়, বরং কৃষি, বনায়ন, কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সম্ভাব্য মূল্যশৃঙ্খলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

​কাঠের বাইরের ব্যবহার নিয়েও অনুসন্ধান
​জীবনগাছের পাতা, ফল, বীজ ও অন্যান্য অংশের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান করছে ডাহুক। এ বিষয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামকে অবহিত করা হয়।


​জয়পুরহাট এলাকার প্রান্তিক কৃষক ও ছাগলের খামারমালিক মোজাম্মেল মিয়া জানান, স্থানীয়ভাবে ছাগল পালনের ক্ষেত্রে জীবনগাছের পাতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাঁর খামার ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতায় এ ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জীবনগাছের পাতার সম্ভাব্য অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে পাতার পুষ্টিমান, নিরাপদ ব্যবহার এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

আশা করা হচ্ছে,​ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচলিত জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার আওতায় আনা গেলে জীবনগাছের সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে অধিকতর নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

​সামাজিক বনায়নে দেশীয় প্রজাতির সম্ভাবনা
​সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রেও জীবনগাছের সম্ভাব্য ব্যবহার যাচাই চলছে। দ্রুতবর্ধনশীল দেশীয় প্রজাতি হিসেবে সামাজিক বনায়নে এর উপযোগিতা নির্ধারণের জন্য পরীক্ষামূলক উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে ডাহুক।

​তবে প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, কোনো প্রজাতি দেশীয় হওয়াই সামাজিক বনায়নের জন্য সর্বত্র উপযোগিতার নিশ্চয়তা দেয় না। মাটির ধরন, পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবহার, গাছের বৃদ্ধির হার, কাঠের গুণমান, জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য বাজার—এসব বিষয় সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এ কারণে জীবনগাছকে সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্য প্রজাতি হিসেবে বিবেচনার আগে পরীক্ষামূলক চাষ এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ডাহুক।

পূর্বাচলে সাইট পরিদর্শন
​জীবনগাছভিত্তিক সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকার সামাজিক বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পূর্বাচলের একটি সম্ভাব্য সাইট পরিদর্শন করা হয়েছে। সাইটটির পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা এবং স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে বনায়ন কার্যক্রমের সমন্বয়ের সুযোগ সরেজমিনে পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এ পরিদর্শন করা হয়।

​ডাহুকের কর্ণধার জানান, পূর্বাচলের পরিকল্পনায় নগরায়ণের পাশাপাশি জলাভূমি, সবুজ এলাকা, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ও বৃক্ষসম্পদের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত দেশীয় প্রজাতিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত বনায়নের সুযোগ থাকলে তা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রয়োজন সমন্বিত গবেষণা ও পরীক্ষামূলক উদ্যোগ
​এই উদ্ভাবনী তরুণ আরও জানান, জীবনগাছকে ঘিরে ডাহুকের কার্যক্রম বর্তমানে গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। বৃহত্তর পরিসরে এর উৎপাদন সম্প্রসারণের আগে গাছটির বৃদ্ধির হার, কাঠের গুণমান, উৎপাদন ব্যয়, বাজার চাহিদা এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

​একই সঙ্গে সামাজিক বনায়নে এর সম্ভাব্য ভূমিকা নির্ধারণের জন্য মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে প্রজাতিটির সম্পর্কও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

​তবে মাঠপর্যায়ে ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে এর কাঠের ব্যবহার, স্থানীয় পর্যায়ে পাতা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই—এই তিনটি ক্ষেত্র জীবনগাছকে নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।

​ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মাগফি রেজা বলেন, একটি অবহেলিত দেশীয় প্রজাতিকে কেন্দ্র করে কৃষক, বনায়ন, স্থানীয় কাঠশিল্প, ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না—জীবনগাছ নিয়ে ডাহুকের বর্তমান অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন সেটিই। এর উত্তর নির্ভর করবে আরও গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের ফলাফলের ওপর।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

অবহেলার জীবনগাছে পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির নতুন আশা

অবহেলার জীবনগাছে পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির নতুন আশা

আপডেট সময় ১২:৫৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

মেঠোপথের ধারে, ঝোপঝাড়ে কিংবা বনভূমির প্রান্তে অনাদরে বেড়ে ওঠা যে গাছটিকে এতদিন কেবলই অবহেলিত মনে করা হতো, সেই দেশীয় প্রজাতি ‘জীবনগাছ’ (Trema orientalis) এখন স্থানীয় অর্থনীতি ও উদ্ভাবনে তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনা। উত্তরের ক্রিকেট ব্যাটের কারখানায় আমদানিনির্ভর কাঠের বিকল্প হিসেবে এর কাঠ ব্যবহারের সাফল্য কেবল কারিগরদের মুখেই হাসি ফোটায়নি, একই সঙ্গে গবেষক ও উদ্যোক্তাদের মাঝেও জাগিয়ে তুলেছে নতুন আশার আলো। গ্রামীণ বনায়ন থেকে শুরু করে খেলার সামগ্রী তৈরি ও পশুখাদ্য—একটি মাত্র প্রজাতিকে কেন্দ্র করে কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আয়ের একটি নতুন অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরির যে দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে, তার অনুসন্ধানে কাজ করে চলেছে গবেষণা সংস্থা ‘ডাহুক’।

ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে ব্যবহার
​উত্তরাঞ্চলের ক্রিকেট ব্যাটের কারিগর গোপাল দাস জানান, তাঁর কারখানায় জীবনগাছের কাঠ নিয়মিতভাবে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় কাঠের মিল থেকে তিনি প্রায় দুই ফুট দৈর্ঘ্যের গুঁড়ি বা কাঠের টুকরা সংগ্রহ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ কাঠ স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।


​গোপাল দাসের কারখানায় জীবনগাছের কাঠের নিয়মিত ব্যবহার এ প্রজাতির কাঠের ব্যবহারিক সম্ভাবনার একটি মাঠপর্যায়ের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কাঠের গুণমান ও সরবরাহব্যবস্থা আরও উন্নত করা সম্ভব হলে স্থানীয়ভাবে ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
​ডাহুকের পরিচালক মাগফি রেজা সিদ্দিক বলেন, জীবনগাছের বাণিজ্যিক উৎপাদনচক্র তুলনামূলকভাবে স্বল্প হওয়ায় এ প্রজাতিকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোক্তা উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত গাছ স্থানীয় কাঠের মিলে প্রক্রিয়াজাত হয়ে কারখানায় ক্রীড়াসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হলে কৃষক, কাঠ ব্যবসায়ী, কারিগর ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি স্থানীয় মূল্যশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আঞ্চলিক পরিসর সম্প্রসারণের সুযোগ
​জীবনগাছের কাঠের ব্যবহার উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্রিকেট ব্যাট ও অন্যান্য ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কারিগর রয়েছেন। এসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে জীবনগাছের চাষ বা সামাজিক বনায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদনের জন্য স্থানীয়ভাবে কাঁচামালের একটি উৎস গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
​ডাহুকের অনুসন্ধানে জীবনগাছকে শুধু কাঠ উৎপাদনকারী প্রজাতি হিসেবে নয়, বরং কৃষি, বনায়ন, কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সম্ভাব্য মূল্যশৃঙ্খলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

​কাঠের বাইরের ব্যবহার নিয়েও অনুসন্ধান
​জীবনগাছের পাতা, ফল, বীজ ও অন্যান্য অংশের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান করছে ডাহুক। এ বিষয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামকে অবহিত করা হয়।


​জয়পুরহাট এলাকার প্রান্তিক কৃষক ও ছাগলের খামারমালিক মোজাম্মেল মিয়া জানান, স্থানীয়ভাবে ছাগল পালনের ক্ষেত্রে জীবনগাছের পাতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাঁর খামার ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতায় এ ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জীবনগাছের পাতার সম্ভাব্য অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে পাতার পুষ্টিমান, নিরাপদ ব্যবহার এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

আশা করা হচ্ছে,​ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচলিত জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার আওতায় আনা গেলে জীবনগাছের সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে অধিকতর নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

​সামাজিক বনায়নে দেশীয় প্রজাতির সম্ভাবনা
​সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রেও জীবনগাছের সম্ভাব্য ব্যবহার যাচাই চলছে। দ্রুতবর্ধনশীল দেশীয় প্রজাতি হিসেবে সামাজিক বনায়নে এর উপযোগিতা নির্ধারণের জন্য পরীক্ষামূলক উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে ডাহুক।

​তবে প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, কোনো প্রজাতি দেশীয় হওয়াই সামাজিক বনায়নের জন্য সর্বত্র উপযোগিতার নিশ্চয়তা দেয় না। মাটির ধরন, পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবহার, গাছের বৃদ্ধির হার, কাঠের গুণমান, জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য বাজার—এসব বিষয় সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এ কারণে জীবনগাছকে সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্য প্রজাতি হিসেবে বিবেচনার আগে পরীক্ষামূলক চাষ এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ডাহুক।

পূর্বাচলে সাইট পরিদর্শন
​জীবনগাছভিত্তিক সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকার সামাজিক বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পূর্বাচলের একটি সম্ভাব্য সাইট পরিদর্শন করা হয়েছে। সাইটটির পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা এবং স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে বনায়ন কার্যক্রমের সমন্বয়ের সুযোগ সরেজমিনে পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এ পরিদর্শন করা হয়।

​ডাহুকের কর্ণধার জানান, পূর্বাচলের পরিকল্পনায় নগরায়ণের পাশাপাশি জলাভূমি, সবুজ এলাকা, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ও বৃক্ষসম্পদের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত দেশীয় প্রজাতিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত বনায়নের সুযোগ থাকলে তা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রয়োজন সমন্বিত গবেষণা ও পরীক্ষামূলক উদ্যোগ
​এই উদ্ভাবনী তরুণ আরও জানান, জীবনগাছকে ঘিরে ডাহুকের কার্যক্রম বর্তমানে গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। বৃহত্তর পরিসরে এর উৎপাদন সম্প্রসারণের আগে গাছটির বৃদ্ধির হার, কাঠের গুণমান, উৎপাদন ব্যয়, বাজার চাহিদা এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

​একই সঙ্গে সামাজিক বনায়নে এর সম্ভাব্য ভূমিকা নির্ধারণের জন্য মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে প্রজাতিটির সম্পর্কও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

​তবে মাঠপর্যায়ে ক্রিকেট ব্যাট উৎপাদনে এর কাঠের ব্যবহার, স্থানীয় পর্যায়ে পাতা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বনায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই—এই তিনটি ক্ষেত্র জীবনগাছকে নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।

​ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মাগফি রেজা বলেন, একটি অবহেলিত দেশীয় প্রজাতিকে কেন্দ্র করে কৃষক, বনায়ন, স্থানীয় কাঠশিল্প, ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না—জীবনগাছ নিয়ে ডাহুকের বর্তমান অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন সেটিই। এর উত্তর নির্ভর করবে আরও গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের ফলাফলের ওপর।