আর তো মাত্র কিছুদিনের অপেক্ষা! কোন এক বিষণ্ণ সকালে কিংবা গোধূলি বেলায় পিচঢালা সড়কে হাজারো গাড়ির ভিড় ঠেলে সাঁই সাঁই গতিতে সাইরেন বাজাতে বাজাতে এগিয়ে চলেছে অ্যাম্বুলেন্স। মুখে বোতলজাত অক্সিজেনের মাস্ক। বেঁচে থাকার সে কি দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা! ভেতরে আমি, আপনি নাকি অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম? চারপাশে স্বজনদের আহাজারি, আর্তনাদ। এই দুর্বার গতিতে ছুটে চলা কী শুধুই হাসপাতাল অভিমুখে? নাকি সর্বনাশের মহাসড়কে দৃপ্ত অভিযাত্রা? অনাহুত এই প্রশ্ন না হয় তোলা থাক মহাকালের হাতে! বিপরীতে ফিরে দেখা যাক অল্প কিছুদিন অতীতে।
এই তো কিছুদিন আগের কথা। কোনও এক গোধূলি বেলায় গাঁয়ের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছি। রাস্তার দুইপাশে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজারো প্রজাতির অসংখ্য বৃক্ষরাজি। চারপাশ মুখরিত পরিযায়ী পাখিসহ অসংখ্য দেশীয় পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দে। কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সাদা বক। গরুর ক্ষুরে ধুলা উড়িয়ে ঘরে ফিরছে ক্লান্ত কৃষক। এর কিছুক্ষণ পরেই নামে সন্ধ্যা। নিকষ কালো রাতের আধারে মিটিমিটি আলো জে¦লে রাখে জোনাকিরা। একটু পরপর দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক। নিজের উপস্থিতি জানান দিতে আড়াল থেকে হুতোম পেঁচারা বেরিয়ে আসে সশব্দে। বাংলার প্রকৃতির এই নির্মল জীববৈচিত্র্য এখন ইতিহাসের কুঁড়েঘরে ঠাঁই নেওয়ার উপক্রম প্রায়। হয়ত কোনো এক সময় অনাগত প্রজন্মকে আমাদের জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য জানতে ঘুরে আসতে হবে জাদুঘর।
বিশ্বায়নের প্রবল প্রভাব এবং রমরমা প্রযুক্তির রোশনাই কখন যে আমাদের প্রকৃতির শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে সেটা উপলব্ধিতে আসার আগেই আমরা পেরিয়ে এসেছি অনেকটা পথ। এখন খোলা আকাশের নিচে রৌদ্রস্নানে যেতে ভয় লাগে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে। প্রচণ্ড দাবদাহে কখনো বৃষ্টির দেখা মিললেও মনের গভীরে সংশয় বাসা বাঁধে এসিড বৃষ্টির আতঙ্কে। সতেজ খাবার, মাছ, মাংস, সবজি, ফল আমাদের প্লেট থেকে উঠে গেছে কবে তা আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পাই নি। যখন তখন প্রলয়ংকরী ঝড়, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, শৈত্যপ্রবাহ, ভূমিকম্প এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। প্রকৃতির কী নির্মম প্রতিশোধ!
আমাদের সাজানো গোছানো সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ আজ প্রকৃতির শত্রু শকুনিদের লোলুপ থাবায় ক্ষতবিক্ষত। অবাধে উজাড় হচ্ছে বনভূমি। কখনও কখনও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়ও চলে শতাব্দী প্রাচীন বৃক্ষ নিধন। উন্নয়নের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুরাতন বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা স্মৃতির ক্যানভাসে এখনও দগদগে ঘা। পাহাড়ের বনভূমি উজাড় করে অবাধে চলছে জুম চাষ। পাহাড় খেকোরা নির্বিচারে কেটে চলেছে পাহাড়। দখল করছে বিস্তীর্ণ এলাকা। নদী ও বালু খেকোরা প্রতিনিয়ত দখল-দূষণের প্রতিযোগিতায় মত্ত। গাড়ির তীব্র হর্ন আর যানজটে নাকাল নগরবাসী। বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণ যেন বাড়তি পাওনা। শীতকালে এদেশে এখন বেড়াতে আসতে বেজায় অনীহা অতিথি পাখিদের। হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে যারা এদেশে আসে আমাদের প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করতে তাদের চলে নির্বিচারে শিকার। অতিথি আপ্যায়নের এমন হিংসাত্মক চেতনা কবে লালন করেছে এই বঙ্গভূমি? কলকারখানার বিষাক্ত ও রাসায়নিক বর্জ্যে দূষিত পানিতে আমাদের নদীগুলো এখন প্রবহমান মৃত্যুফাঁদ।
বলছিলাম প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধের কথা। হ্যাঁ প্রকৃতির সাথে শত্রুতার নির্মম পরিণতিও আমরা ভোগ করতে শুরু করেছি ইতোমধ্যে। নিত্য নতুন মারণ রোগ এবং ভাইরাসে পর্যুদস্ত আমাদের জাতীয় জীবন। আক্রান্ত আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। মাত্র কয়েকবছর আগে কোভিড ১৯ খ্যাত করোনা ভাইরাস হাড়ে হাড়ে শিক্ষা দিয়ে গেলো সময়-সুযোগ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্র পেলে কতটা মারাত্মক হতে পারে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফল। ২০১০ সালে সিবিডি’তে দেওয়া বাংলাদেশের চতুর্থ জাতীয় প্রতিবেদন অনুসাওে, পঞ্চাশটিরও বেশি উদ্ভিদ এবং একশ প্রজাতির প্রাণী হুমকির মুখে অবস্থিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আইইউসিএন ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ৩৯০টি বিপন্ন প্রজাতিকে লাল তালিকাভুক্ত করে যার মধ্যে ৫৬টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৬৩টি সরীসৃপ এবং ৪১টি উভচর প্রাণী রয়েছে। যা শুধু পরিবেশগত হুমকি নয়, পরিবেশগত জাতীয় জরুরি অবস্থার পর্যায়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতি যখন বিলুপ্ত হয়, তখন তারা বৈশ্বিক ভারসাম্য, স্থিতিস্থাপকতা এবং পারস্পরিক নির্ভরতাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে উপনীত করে। যা একবার হারিয়ে গেলে সহসা ফিরে পাওয়া অসম্ভবপ্রায়।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ধারণা করছে যে, বর্তমানে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ ২.৩৩ মিলিয়ন হেক্টর যা মোট ভূমির ১৫.৭৮ শতাংশ। যদিও বন বিভাগের তথ্যানুসারে এর পরিমাণ ২.৫৭ মিলিয়ন হেক্টর, যা মোট ভূমির ১৭.৩৩ শতাংশ। গত দুই দশকে বাংলাদেশ প্রায় ৮৩৯০ হেক্টর জলীয় প্রাথমিক বনভূমি হারিয়েছে। যা উল্লিখিত সময়ে মোট বৃক্ষরোপণের ৩.৫ শতাংশ। সার্বিকভাবে জলীয় প্রাথমিক বনভূমি হ্রাসের পরিমাণ ৮.৭ শতাংশ। একই সময়ে এই বদ্বীপের ফুসফুসখ্যাত জলাভূমিগুলো মারাত্মকভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ফলে জলজ প্রাণিজগতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যা আমাদের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হ্যাঁ, সুস্থ এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীববৈচিত্র্যই পারে আমাদের এই মাতৃভূমির নৈসর্গিক দৃশ্য রূপায়ণে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য কী? অধ্যাপক হ্যামিল্টনের মতে, “পৃথিবীর নানাধরনের উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অণুজীবের মধ্যে জিনগত, প্রজাতিগত এবং পরিবেশগত বৈচিত্র্যই হচ্ছে জীববৈচিত্র্য”। এটি সুনির্দিষ্ট একটি প্রতিবেশ ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন প্রকার জীবন্ত উপাদানের পারস্পরিক সহাবস্থান। মার্কিন জীববিজ্ঞানী ই. এ. নরসে এবং তার সহযোগীদের সূত্র অনুযায়ী জৈব বৈচিত্র্য হলো জল, স্থল সকল জায়গায় সকল পরিবেশে থাকা সকল ধরনের জীব এবং উদ্ভিদের বিচিত্রতা। পৃথিবীর দশ বিলিয়ন ভাগের একভাগ অংশতেই পঞ্চাশ মিলিয়ন প্রজাতির বিভিন্ন জীব-জন্তু এবং উদ্ভিদের বসবাস। জীববৈচিত্র্যকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। যেমন:- ১. ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনইপি) অনুসারে, জীববৈচিত্র্য হলো কোনো অঞ্চলের অন্তর্গত সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণির জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতন্ত্রেও বিভিন্নতা। ২. সি. জে. ব্যারো’র মতে, “জীববৈচিত্র্য হলো একটি অঞ্চলের অর্থাৎ একটি বাস্তুতন্ত্রেও অন্তর্গত বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে বৈচিত্র্য। এমনকি একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যও জীববৈচিত্র্যেও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কোনো একটি অঞ্চলের অন্তর্গত প্রাকৃতিক বাসস্থান এবং ঐ বাসস্থানে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীবের প্রজাতি এবং তাদের জিনগত বৈচিত্র্যেও সমাহারকে জীববৈচিত্র বা বায়োডাইভারসিটি বলে।
১৯৯২ সালে কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি বা সিবিডি নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে। এই চুক্তির আলোকে ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস চালু হয়। ঐ বছর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই দিনটিকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রথমদিকে ২৯ ডিসেম্বও দিবসটি পালিত হলেও ২০০০ সাল থেকে মে মাসের ২২ তারিখে দিবসটি বৈশ্বিকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রত্যেক বছর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উদ্যাপনের একটি নির্দিষ্ট থিম নির্ধারণ করা হয়। চলতি বছরের জন্য নির্ধারিত থিমটি হচ্ছে, “হারমনি উইথ নেচার অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট” অর্থাৎ প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান ও টেকসই উন্নয়ন”। যা পরিবেশের ক্ষতি মোকাবিলা করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এই থিমটির মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সংকটের প্রকৃতি এবং তার সমাধানের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ প্রণয়ন এবং জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে দুর্বল বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জবাবদিহিতার তীব্র অভাব সার্বিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সুতরাং সমন্বিত এবং কার্যকরী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং টেকসই বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো।
চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি, প্রকৃতিবার্তা
মুকিত মজুমদার বাবু 




















