মোঃ আবদুস সালিম: কয়েক দিন আগে জরুরি কাজে ঢাকার দোহার থানার রাইপাড়া ইউনিয়নের লক্ষ্মীপ্রসাদ গ্রামের একটি সড়ক দিয়ে দোহার বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। পথে লক্ষ্মীপ্রসাদ গ্রামের সড়কের পাশে একটি বাড়ির উঠানে দেখতে পেলাম বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ একসঙ্গে কিছু একটা করছে। রিকশা থেকে নেমে গিয়ে দেখি তারা শামুক নিয়ে কি যেন করছে। তাদের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ছোট বড় নানা ধরনের শামুক। আপনারা এসব দিয়ে কী করছেন জানতে চাইলে ছমিরউদ্দিন নামের একজন শ্রমিক বলেন,
শামুক দিয়া মালিক ব্যবসা করে, আর আমরা এখনকার শ্রমিক।

একটু দূরে গিয়ে দেখতে পেলাম ৮ থেকে ৯ ইঞ্চি লম্বা কাঠের চটার মাথায় ২ থেকে ৩ ইঞ্চি লোহা পুঁতে রাখা হয়েছে। আর জীবন্ত শামুকের পেছনের পেঁচানো অংশে লোহা দিয়ে পেটাচ্ছেন কয়েকজন শ্রমিক। পেছনের অংশ ভাঙা হলে ছুরি দিয়ে শামুকের মুখসহ নরম শরীর টেনে বের করে আনা হচ্ছে। এসব কাজে ব্যস্ত শিশুরাও। এসব দেখে আর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে তারা প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব শামুক বেচাকেনার কাজে তাদের মালিককে সহযোগিতা করছে। বিনিময়ে মজুরি পাচ্ছে। তা দিয়ে সংসার চালাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা শামুক হত্যা করে তার নানামুখী ব্যবহার ঘটাচ্ছে। শামুকের মাংস বস্তায় ভরে খাবার হিসেবে বিক্রি হয় চিংড়ি খামারগুলোতে। প্রতি বস্তায় প্রায় দুই হাজার শামুক ভরা হয়। মাংস বিক্রির পর শামুকের খোলস বা শেল থেকে চুন তৈরি করা হয়। এই চুন পানের সঙ্গে খাওয়া হয়। এমনকি পোলট্রি ফিড হিসেবেও তৈরি ও বিক্রি করা হয়।

দেশের অগণিত মানুষ খাল-বিল-নদী থেকে শামুক সংগ্রহ করে ঘের মালিকদের কাছে পৌঁছায়। এরপর তা ভেঙে খোসা সংগ্রহ করা হয়। অতঃপর পুড়িয়ে চুন ও পোলট্রি ফিড তৈরি করে বাজারজাত করা হয়। শামুকের খোলস মোটামুটি শক্ত। যারা খোলস ভাঙে তাদের দৈনিক মজুরি গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা। এর ভেতরের অংশ (মাংস) চিংড়ি ও সাদা মাছের খাবার হিসেবে ঘেরে ছিটানো হয়। তাতে নাকি দ্রুত বাড়ে মাছের ওজন। এই লোভেই ঘের মালিকরা বেছে নিয়েছে এ পদ্ধতি। অনেক ব্যবসায়ী ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এ সংক্রান্ত ব্যবসা চালাচ্ছে বলেও জানা গেছে। অথচ সামাজিক বন বিভাগ সূত্রে বলা হয়েছে, সরকারি প্রজ্ঞাপনে শামুককে বন্যপ্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে ২০১২ সালের ১০ জুলাই। আইন মোতাবেক বন্যপ্রাণী বিনষ্ট ও ধ্বংসের অপরাধে অপরাধীর এক বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান করা হয়েছে। তাই শামুক ধরা বা নিধন ও বাজারজাত করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়, তা যদি অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধের হয় তবে অসাধু শামুক ব্যবসায়ীরা কী করে পায় ট্রেড লাইসেন্স। অনেকে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তা জেনেও না জানার ভান করছে নিজেদের স্বার্থে। শুধু বলা হয়ে থাকে, এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব। আর তা-ই যদি হয় তা হলে প্রশাসনের লোকেরা জায়গামতো যেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে না কোন স্বার্থে? এমন প্রশ্ন পরিবেশবাদীদের।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শামুক তৃণভোজী প্রাণী। এরা খায় পচা পাতাসহ মাটির পচন। এসব খেয়ে ত্যাগ করে এক ধরনের নির্যাস। এ নির্যাস পানিতে মিশলে সেই পানি প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ হয়। এমনকি মাটির উর্বরা শক্তিও বাড়ে। মাটি ও পানি ঠান্ডা রাখে। অর্থাৎ এরা পরিবেশের যেমন ভারসাম্য রক্ষা করে তেমনি ইকোসিস্টেমও রক্ষা করে বলে জানা গেছে। অনেক সময় শামুকের ডিম ইঁদুরে খায়। এটি একটি খারাপ দিক হলেও পেট ভরা থাকার কারণে ইঁদুর ক্ষেতের ধান আর তেমন খায় না।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতি কেজি চুন বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। চুল্লিতে প্রতি সেটে ২০ থেকে ২৫ ঢোপ শামুকের খোসা পোড়ানো হয়। প্রতি ঢোপে থাকে ৫ থেকে ৬ হাজার শামুক। সেখান থেকে পাওয়া যায় প্রায় চার থেকে পাঁচশো’ কেজি চুন। এ ব্যবসা চলে জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এমন সময়েই বেশি শামুক পাওয়া যায় খাল-বিল-নদী-হাওরে। বর্ষার পানি কমতে শুরু করলে প্রচুর শামুক, ঝিনুক ইত্যাদি ধরা হয়। পানিতে নেমে আবার অনেক সময় খেও টানা জাল দিয়ে এসব ধরা হয়। বড় শামুকের দাম বেশি। কারণ এসবে মাংস ও খোসা বেশি পাওয়া যায়। এ থেকে যা পাওয়া তার মানও অপেক্ষাকৃত ভালো।

পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, অনেক সময় শামুক ধরে এনে বাড়ির উঠানে এবং বস্তায় ভরে ২ থেকে ৩ দিন রেখে দেয়া হয়। তখন তা পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এর পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে খুবই কঠিন। খোসা পোড়ালে ধোঁয়া হয়। সেই ধোঁয়াও দূষিত। এই ধোঁয়া ঝাঁঝালো গন্ধ। বাজে দুর্গন্ধে আশপাশের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। দূষিত হয় পরিবেশ। শামুকের মাংস ও খোসা কিছুটা ক্ষার ধরনের। বেশিদিন তা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করলে শরীরে চর্মরোগ দেখা দেয়। যেটাকে ডাক্তারি ভাষায় কন্টাক ডারমাটাইসিস বলে। এর ক্ষার শ্রমিকের হাতের তালুতে গুঁড়ি গুঁড়ি ছিদ্র করে দেয়। কষ ঝরে সেখান থেকে।
ঝিনুকের মতো শামুকও বেশ স্পর্শকাতর জলজ সম্পদ। পানি বা নদী-খালের পাড়ে চলাচলের সময় মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী এর কাছে আসছে, এমন বুঝতে পারলে এরা মুখ গুটিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। মুখের দিকে চিকন লম্বা মাংসের মতো কিছু অংশ রয়েছে, যা দিয়ে ওরা সামনের দিকে অগ্রসর হয়। এই দৃশ্য দেখতে বেশ সুন্দর লাগে।
ইদানীং হেলিক্স এসপারসা নামক শামুকের খোসা ও মাংস দিয়ে খোসপাঁচড়া, দাউদ, শুকনো ত্বক ইত্যাদিও সমস্যার ক্রিম তৈরি করা হচ্ছে অনেক দেশে। পাশাপাশি জুয়েলারি সামগ্রীও তৈরি করা হচ্ছে। এসব কারণেও শামুকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দ্রুত। এসব বিষয়েও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না। আসলে এ ব্যাপারে সবাইকেই সচেতন হতে হবে।
শামুক নানা ধরনের হয়ে থাকে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মিঠা পানির শামুক, সাগর শামুক, ভূমি শামুক ইত্যাদি। মিঠা পানির শামুক ও ভূমি শামুকের চাহিদাই বেশি। এ কারণে শামুক সংগ্রহকারীদের কাছে এরাই বেশি ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, বর্তমানে নির্বিচারে শামুক এত বেশি সংখ্যায় ধরা পড়ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে শামুকের দেখা মিলবে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পরিবেশের ওপর।
লেখক: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)
নিজস্ব সংবাদ : 










