“লুটিয়ে পড়ে জটিল জটা, ঘন পাতার গহন ঘটা, হেথা হোথায় রবির ছটা, পুকুর-ধারে বট। দশ দিকেতে ছড়িয়ে শাখা, কঠিন বাহু আঁকাবাঁকা, স্তব্ধ যেন আছে আঁকা, শিরে আকাশ-পট।।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের প্রকৃতি, জীবন ও সংসারে এতোটাই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন যে, তাঁকে ছাড়া নিশ্বাস নেওয়াটাও বুঝি দায়! বলবো একটি বটগাছের গল্প। সেখানেও তাঁর জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থিতি! বটগাছ নিয়ে এই জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানারকম প্রবাদ বা উপকথা। এর কতটা সংস্কার আর কতটা কুসংস্কার সেসব বিচারের দায়ভার না হয় অনাগত কালের হাতেই ছেড়ে দিলাম। তবে এই পবিত্র বঙ্গভূমিতে কোথাও একটি বটগাছ আছে অথচ সেটাকে নিয়ে কোন সরস বা রূপকথার গল্প থাকবে না; এমনটা হতেই পারে না! চলুন জেনে নেওয়া যাক এমনই একটি বট গাছ সম্পর্কে।

বট গাছটির অবস্থান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার মালিয়াট ইউনিয়নের বেথুলী মৌজার সুইতলা-মল্লিকপুরে। বিবিসির জরিপে ১৯৮৪ সালে এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম খ্যাত, ১১ একর জমি জুড়ে এ বটগাছের অবস্থান ও নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা জটিলতা, রয়েছে কল্পকথাও। ডালপালা, পাতায় পরিপূর্ণ বিশালাকার গাছের নিচে পড়তো না বৃষ্টির পানিও। মাঘ মাসের প্রবল শীতেও গরম অনুভূত হতো গাছতলায়, আর প্রচণ্ড গরমে বুলিয়ে দিতো শীতলতার পরশ। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত পথিকেরা শুয়ে-বসে জিরিয়ে নিতো গাছ তলায়। অনেকের ধারণা, পরিশ্রান্ত মানুষেরা শুয়ে-বসে বিশ্রাম নেওয়ার কারণেই এটি পরিচিতি লাভ করে সুইতলার বটগাছ নামে (প্রকৃত পক্ষে অত্র অঞ্চলে সুইতলা নামে কোন স্থানের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না)। কারও কারও কাছে সুইতলা মল্লিকপুরের বটগাছ আবার অনেকের কাছে এটি বেথুলীর বটগাছ। কালীগঞ্জ শহর থেকে সরু পিচ ঢালা পথে ১০-১২ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে আস্ত একটা সবুজ দৈত্য! না, না, দৈত্য নাম শুনে আবার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটা রূপকথা কিংবা আলিফ লায়লার সেই অত্যাশ্চর্য কোনো দৈত্য নয়। এই সবুজ দৈত্য স্নেহের পরশ মিশিয়ে উদ্ধত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে শতশত বছর ধরে। সুইতলা মল্লিকপুরবাসীকে আগলে রেখেছে পরম মমতায়।

স্বাভাবিকভাবেই বটগাছ বিশালাকৃতির হয়ে থাকে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকে তার ডালপালা। তেমনইভাবে সুইতলা-মল্লিকপুরের বট গাছটিও চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে তার স্নেহের বাহু। গাছটির উচ্চতা আনুমানিক ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট। যদিও মূল বটগাছটি এখন আর নেই, তবুও অসংখ্য ডালপালা নেমে বর্তমানে কমবেশি ৫২টি বটগাছে রূপ নিয়েছে এটি। ২০০৯ সাল থেকে বটগাছটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে সামাজিক বন বিভাগ যশোর। গাছটি কে বা কারা লাগিয়েছে বা গাছটির উৎপত্তি সম্পর্কে যদিও কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় নি, তবুও ধারণা করা হয় প্রায় দুইশ’ থেকে তিনশ’ বছর পূর্বে এর জন্ম। অত্র অঞ্চলে আগে কুমারদের বসতি ছিল। সেনদের জায়গায় একটি পাতকুয়া ছিল। কোনো পাখি হয়ত কুয়োর ওপর বটের বীজ এনে ফেলে। সে বীজ থেকে চারা গজায়। জায়গাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। গাছটি আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠে, শেকড় গেঁড়ে বসে বিরাট এলাকা জুড়ে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গাছের গোঁড়ায় পূজা-অর্চনা শুরু করেন। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখনও পূজা হয় এখানে। যে কুয়ার পাড়ে গাছটির জন্ম সেটি কে, কখন খনন করেছিল তারও কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। জানা যায়, কুয়ার স্থানটি ১৯২৬ সালের রেকর্ডের পূর্বে বেথুলী গ্রামের ভূষণ সাহার পরিবারের কারো নামে ছিল, যদিও বর্তমানে সরকারের খাস জমির অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় লোকজনের মুখে গাছটি সম্পর্কে নানারকম কথা শোনা যায়। কথিত আছে কয়েক বছর আগে কুদরতউল্লাহ নামে একজন গাছের ডাল কাটলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরু হয় রক্তবমি। বটগাছ আগলে ধরে কান্নাকাটি করেন কুদরতের স্ত্রী, ভিক্ষা চাই স্বামীর প্রাণ । পরিশেষে সুস্থ হয়ে ওঠে তার স্বামী। এ রকম অনেক কল্প কাহিনি ঘোরাফেরা করে মল্লিকপুরবাসীদের মুখে মুখে।

১৩৬০ বঙ্গাব্দের দিকে বটগাছটিকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেথুলী বা মল্লিকপুরের বাজার। এই বাজারের প্রথম দোকানি ছিলেন মল্লিকপুরের বেলায়েত আলী, বেথুলীর স্বরজিত কুমার সাহা, মমতাজ ডাক্তার, মল্লিকপুরের মুনছুর বিশ্বাস ও মথুরাপুরের হামিদুল। চাপরাইল গ্রামের গৌরপদ অধিকারী এবং হাজারী লাল অধিকারীর আর্থিক সহায়তায় বটতলায় কালীপূজার জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি স্থায়ী পিঁড়ি। অযত্ন-অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নানামুখী অত্যাচারের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই বটগাছটির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন প্রায়, বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্রও। মল্লিকপুর গ্রামের বেলায়েত আলী নিজ সন্তানের মতো ভালোবাসতেন বটবৃক্ষটিকে। বেঁচে থাকা পর্যন্ত তিনিই সবকিছু দেখাশোনা করতেন। যার জন্য তিনিই সর্বপ্রথম এই বটগাছের কাছে দোকান স্থাপন করেন, প্রতিষ্ঠা করেন বাজার।

১৯৮২ সালের আগ পর্যন্ত কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটি গাছ এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম বটগাছ হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়- ‘মল্লিকপুরের বটগাছই এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম’। ১৯৯৮ সালে কালীগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা সুশেন চন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় একটি ফুলের বাগান তৈরি করা হয় সেখানে। বটগাছের চারপাশ ঘিরে নির্মাণ করেন প্রাচীর। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম বটগাছটি দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা আসেন প্রতিনিয়ত। যার দরুন ঝিনাইদহ জেলা পরিষদ ১৯৯০ সালে বটগাছের পাশেই নির্মাণ করে একটি রেস্ট হাউজ। বিশালাকৃতির এই বটগাছটির দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাখির কলরব, ছায়াঘেরা শীতল পরিবেশ মন্ত্রমুগ্ধ করে সকল বয়স-শ্রেণি-পেশার মানুষদের।
জয়ন্ত সরকার 




















