৮ দশকে ২ হাজারের বেশি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ! ভুগছে গোটা বিশ্ব

পৃথিবীর বুকে পারমাণবিক যুগের সূচনা হয় প্রায় ৮০ বছর আগে। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পরমাণু বোমা ফেলে।

সেই বোমায় মুহূর্তেই প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ মারা যায়। এরপর শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধকালীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা, “কোল্ড ওয়ার।“

সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চীন একের পর এক শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

১৯৪৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে এসব দেশ ২,০০০ এর বেশি পরীক্ষা চালায়। কারো মতে, এই পরীক্ষাগুলো বিশ্বের নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করেছে। আবার কারো মতে, এসব পরীক্ষা বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার কারণ।

এসব পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে, জাপানের মতোই আশপাশের মানুষ আহত হয়, বিকিরণে আক্রান্ত হয়, এবং তাঁদের জমি, পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরে ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াও নিজেদের পরীক্ষা চালায়। তবে আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে পরবর্তীতে প্রায় সব পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।

২০০০ সালের পর, শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়া এখন পর্যন্ত পরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছে, সর্বশেষ ২০১৭ সালে।

গবেষক টগজান কাসেনোভা বলেন, “এটি শুধু অতীতের সমস্যা নয়।“ তাঁর মতে, এসব বিস্ফোরণ বহু বছর আগে ঘটলেও, মানুষ এর মূল্য এখনো দিচ্ছে।

এসব পরীক্ষা সাধারণত দূরবর্তী ও কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় করা হতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা ও প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সোভিয়েত ইউনিয়নের কাজাখস্তান ও আর্কটিক সাগরের নোভায়া জেমলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরের কিরিতিমাতি দ্বীপ (পূর্বে ক্রিস্টমাস আইল্যান্ড নামে পরিচিত), ফ্রান্সের আলজেরিয়া ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়া, এবং চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের ‘লোপ নুর’ মরুভূমি।

সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্ক এলাকায়ই ৪৫০ এর বেশি পরীক্ষা চালায়। স্থানীয় মানুষ এসব পরীক্ষার ব্যাপারে কিছুই জানতো না।

বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে বেশ কম বয়সে, আর তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুগতে থাকে জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায়।

এই পরীক্ষাগুলো আসলে কতটা ক্ষতি করেছে তা মাপা কঠিন, তবে নানা গবেষণায় ভয়াবহ কিছু চিত্র উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা পরীক্ষাসমূহ, যা ১৯৫১–১৯৬২ সালের মধ্যে হয়, অনুমান করা হয় এর কারণে ১১,৩০০–২১২,০০০ পর্যন্ত অতিরিক্ত থাইরয়েড ক্যান্সারের ঘটনা ঘটেছে।

কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্কে ক্যান্সার ও শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল। আজও সেখানের চতুর্থ-পঞ্চম প্রজন্ম স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

১৯৪৮–১৯৭০ সালে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মধ্যে, ০.৪% থেকে ৩.৪% পর্যন্ত ক্যান্সারের হার বিকিরণের কারণে হতে পারে।

কিন্তু ১৯৫৪ সালের ‘ক্যাসল ব্রাভো’ নামক পরীক্ষার সময় রঙ্গেলাপ ও আইলিঙ্গিনাই দ্বীপে বসবাসকারী ৮২ জন মানুষের ওপর বরফের মতো তেজস্ক্রিয় ধুলো পড়েছিল। তাদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে দাঁড়ায় ২৮% থেকে ৬৯% পর্যন্ত।

১৯৪৬ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে মোট ৬৭টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, যেগুলোর বিস্ফোরণ ক্ষমতা মিলিয়ে ছিল প্রায় ৭,২৩২টি হিরোশিমা বোমার সমান।

বহু দ্বীপ আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, এবং আজও কিছু জায়গা বিকিরণে দূষিত। সেখানকার নারকেল গাছ ও কাঁকড়া পর্যন্ত তেজস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল।

সময়ের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কেউ কেউ ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, তবে তা সব জায়গায় সমান নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে আইন করে এখন পর্যন্ত ২৭,০০০ মানুষকে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেওয়া হয়েছে।

কাজাখস্তানের ১২ লক্ষ মানুষ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার তালিকায়।

মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের ক্ষতিগ্রস্তরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছু ক্ষতিপূরণ পেলেও তারা মনে করে প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় তা নগণ্য।

ফ্রান্স ২০১০ সালে প্রথম স্বীকার করে যে তাদের পরীক্ষার কারণে বিকিরণে আক্রান্ত আলজেরিয়া ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার মানুষের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল। তবে ২০২১ সাল পর্যন্ত সেই দাবিদারদের মাত্র অর্ধেক ক্ষতিপূরণ পায়।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ৮০ বছর পেরোলেও, এবং ভূ-পৃষ্ঠে বড় আকারে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার কয়েক দশক পরেও, পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার রেশ এখনো পৃথিবীর আবহাওয়ায় মিশে আছে।

মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকা কষ্ট আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই অস্ত্র কেবল আমাদের ইতিহাস নয়, বরং বর্তমানের জন্যও বিশাল এক সংগ্রাম।

 

সূত্রঃ সিএনএন

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

৮ দশকে ২ হাজারের বেশি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ! ভুগছে গোটা বিশ্ব

আপডেট সময় ১১:৫১:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫

পৃথিবীর বুকে পারমাণবিক যুগের সূচনা হয় প্রায় ৮০ বছর আগে। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পরমাণু বোমা ফেলে।

সেই বোমায় মুহূর্তেই প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ মারা যায়। এরপর শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধকালীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা, “কোল্ড ওয়ার।“

সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চীন একের পর এক শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

১৯৪৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে এসব দেশ ২,০০০ এর বেশি পরীক্ষা চালায়। কারো মতে, এই পরীক্ষাগুলো বিশ্বের নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করেছে। আবার কারো মতে, এসব পরীক্ষা বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ার কারণ।

এসব পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে, জাপানের মতোই আশপাশের মানুষ আহত হয়, বিকিরণে আক্রান্ত হয়, এবং তাঁদের জমি, পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরে ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াও নিজেদের পরীক্ষা চালায়। তবে আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে পরবর্তীতে প্রায় সব পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।

২০০০ সালের পর, শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়া এখন পর্যন্ত পরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছে, সর্বশেষ ২০১৭ সালে।

গবেষক টগজান কাসেনোভা বলেন, “এটি শুধু অতীতের সমস্যা নয়।“ তাঁর মতে, এসব বিস্ফোরণ বহু বছর আগে ঘটলেও, মানুষ এর মূল্য এখনো দিচ্ছে।

এসব পরীক্ষা সাধারণত দূরবর্তী ও কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় করা হতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা ও প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সোভিয়েত ইউনিয়নের কাজাখস্তান ও আর্কটিক সাগরের নোভায়া জেমলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরের কিরিতিমাতি দ্বীপ (পূর্বে ক্রিস্টমাস আইল্যান্ড নামে পরিচিত), ফ্রান্সের আলজেরিয়া ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়া, এবং চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের ‘লোপ নুর’ মরুভূমি।

সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্ক এলাকায়ই ৪৫০ এর বেশি পরীক্ষা চালায়। স্থানীয় মানুষ এসব পরীক্ষার ব্যাপারে কিছুই জানতো না।

বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে বেশ কম বয়সে, আর তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুগতে থাকে জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায়।

এই পরীক্ষাগুলো আসলে কতটা ক্ষতি করেছে তা মাপা কঠিন, তবে নানা গবেষণায় ভয়াবহ কিছু চিত্র উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা পরীক্ষাসমূহ, যা ১৯৫১–১৯৬২ সালের মধ্যে হয়, অনুমান করা হয় এর কারণে ১১,৩০০–২১২,০০০ পর্যন্ত অতিরিক্ত থাইরয়েড ক্যান্সারের ঘটনা ঘটেছে।

কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্কে ক্যান্সার ও শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল। আজও সেখানের চতুর্থ-পঞ্চম প্রজন্ম স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।

১৯৪৮–১৯৭০ সালে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মধ্যে, ০.৪% থেকে ৩.৪% পর্যন্ত ক্যান্সারের হার বিকিরণের কারণে হতে পারে।

কিন্তু ১৯৫৪ সালের ‘ক্যাসল ব্রাভো’ নামক পরীক্ষার সময় রঙ্গেলাপ ও আইলিঙ্গিনাই দ্বীপে বসবাসকারী ৮২ জন মানুষের ওপর বরফের মতো তেজস্ক্রিয় ধুলো পড়েছিল। তাদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে দাঁড়ায় ২৮% থেকে ৬৯% পর্যন্ত।

১৯৪৬ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে মোট ৬৭টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, যেগুলোর বিস্ফোরণ ক্ষমতা মিলিয়ে ছিল প্রায় ৭,২৩২টি হিরোশিমা বোমার সমান।

বহু দ্বীপ আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, এবং আজও কিছু জায়গা বিকিরণে দূষিত। সেখানকার নারকেল গাছ ও কাঁকড়া পর্যন্ত তেজস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল।

সময়ের সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কেউ কেউ ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, তবে তা সব জায়গায় সমান নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে আইন করে এখন পর্যন্ত ২৭,০০০ মানুষকে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেওয়া হয়েছে।

কাজাখস্তানের ১২ লক্ষ মানুষ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার তালিকায়।

মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের ক্ষতিগ্রস্তরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছু ক্ষতিপূরণ পেলেও তারা মনে করে প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় তা নগণ্য।

ফ্রান্স ২০১০ সালে প্রথম স্বীকার করে যে তাদের পরীক্ষার কারণে বিকিরণে আক্রান্ত আলজেরিয়া ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার মানুষের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল। তবে ২০২১ সাল পর্যন্ত সেই দাবিদারদের মাত্র অর্ধেক ক্ষতিপূরণ পায়।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ৮০ বছর পেরোলেও, এবং ভূ-পৃষ্ঠে বড় আকারে পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার কয়েক দশক পরেও, পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার রেশ এখনো পৃথিবীর আবহাওয়ায় মিশে আছে।

মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকা কষ্ট আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই অস্ত্র কেবল আমাদের ইতিহাস নয়, বরং বর্তমানের জন্যও বিশাল এক সংগ্রাম।

 

সূত্রঃ সিএনএন