প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার গ্রহণ করেছেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং ইমপ্রেস গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মজুমদার বাবু।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুকিত মজুমদার বাবুসহ পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননার এবারের আয়োজনে দেশে এই প্রথমবার পরিবেশ সংরক্ষণে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রাপ্তির গৌরব অর্জন করলেন প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার।

পুরস্কার মঞ্চে নাম ঘোষণার সঙ্গে মুকিত মজুমদার বাবুর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও দেশের প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার সারাংশ বর্ণনা করেন মন্ত্রীপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
এরপরেই বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে ভালোবাসার লাল-সবুজ পোশাকে মঞ্চে উঠে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাধীনতা পুরস্কারের ক্রেস্ট গ্রহণ করেন মুকিত মজুমদার বাবু।
জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিতে এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ ১৫ ব্যক্তি এবং পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার ১৯৭৭ সাল থেকে প্রদান করা হচ্ছে। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে দেশের জন্য অবদানের জন্য ২০২৬ সালে এই পুরস্কার পাওয়া ১৫ ব্যক্তির মধ্যে একজন প্রকৃতিপ্রেমী ও সবুজে অন্তঃপ্রাণ মুকিত মজুমদার।
পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ১৮ ক্যারেট মানের পঞ্চাশ গ্রাম স্বর্ণের পদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, সম্মানি অর্থ ও একটি সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
সংক্ষেপে মুকিত মজুমদার:
১৯৫৭ সালে ঢাকায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নটরডেম কলেজের পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার্থে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে, পরে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন ব্যবসা। তিনি ইমপ্রেস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। কিন্তু তার পরিচিতি কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছেন ‘প্রকৃতিবন্ধু’ হিসেবে। ব্যবসায়িক সফলতার চূড়ায় থেকেও তার মন সব সময় ছিল প্রকৃতির পাশে। ৭১-এ দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার যুদ্ধের পর আবার তিনি শুরু করেন আরেক যুদ্ধ, দেশের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার যুদ্ধ।
২০০৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ে শুরু করেন পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা গড়তে ধারাবাহিক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ‘প্রকৃতি ও জীবন’। এখন পর্যন্ত প্রায় চার শতাধিক পর্ব প্রচারিত এই অনুষ্ঠান দেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃতিভিত্তিক তথ্যচিত্র সিরিজ।

মুকিত মজুমদার বাবুর নেতৃত্বে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন কাজ করছে নিরলসভাবে। বৃক্ষরোপণ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ শিক্ষা, প্রজাপতি পার্ক প্রতিষ্ঠা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় গাছের পরিচিতি ফলক সংযুক্তি—প্রতিটি উদ্যোগই তার সবুজ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ।
শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষও তার কাজের কেন্দ্রবিন্দু। প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে তিনি চালু করেছেন বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে প্রতিবছর গ্রাম ও চরাঞ্চলের হাজারো অসহায় মানুষ পাচ্ছে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ। করোনাকালে পাঠিয়েছেন চিকিৎসাসামগ্রী, বন্যায় দিয়েছেন ত্রাণ, প্রতি শীতে দিচ্ছেন শীতবস্ত্র। ‘পরিবেশবান্ধব বিকল্প আয়’ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছেন সেলাই মেশিন, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, রিকশা, ইজিবাইক যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
মুকিত মজুমদার বাবুর উদ্যোগে সারাদেশে গড়ে ওঠা ‘প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব’ দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রকৃতি সংরক্ষণে এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ একত্রিত হয়ে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। প্রতি বছর বর্ষাকালে ‘সবুজে সাজাই বাংলাদেশ’ কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো গাছের চারা রোপণের মতো মহতী উদ্যোগের জন্য এই ক্লাব পরিবেশ সুরক্ষার এক উজ্জ্বল মডেল হয়ে উঠেছে।রাজনীতি বিশ্লেষণ

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি প্রতিবছর অংশ নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে, বাংলাদেশের পরিবেশ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন বিশ্বমঞ্চে।
পরিবেশবিষয়ক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মুকিত মজুমদার বাবু ও তার প্রতিষ্ঠান প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১২, এইচএসবিসি-দি ডেইলি স্টার ক্লাইমেট অ্যাওয়ার্ড-২০১২, ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৩, বিজনেস এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড সিঙ্গাপুর-২০১৪, জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১৫, ঢাকা আহছানিয়া মিশন চাঁদ সুলতানা পুরস্কার-২০১৫, ফোবানা অ্যাওয়ার্ড ইউএসএ-২০১৬, পল্লীমা গ্রিন স্বর্ণপদক-২০১৭, এ ফ্রেন্ড অব নেচার-২০২১, মার্ক অ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড ২০২৪-সহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন।
নাসিমুল শুভ 




















