‘পরিকল্পিত’ শিল্পায়নের নামে ধলেশ্বরীর ধীর মৃত্যু: সিইটিপি যেখানে এক অচল প্রতিশ্রুতি

  • নাসিমুল শুভ
  • আপডেট সময় ০১:৪৮:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 20

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর তাগিদে হাজারীবাগের ট্যানারি যখন সাভারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তখন দেশের পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষের মনে এক টুকরো আশার আলো জেগেছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিসিক পরিকল্পিত চামড়া শিল্প নগরী’। কিন্তু এক দশকের মাথায় এসে সেই ‘পরিকল্পনা’ এখন ধলেশ্বরী নদীর জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। হাজারীবাগের সেই চেনা বিষাক্ত ক্ষত এখন কেবল তার ভৌগোলিক ঠিকানা পরিবর্তন করে সাভারের ধলেশ্বরীকে এক কৃত্রিম কোমায় পাঠিয়ে দিয়েছে। পরিবেশবিদরা একে দেখছেন পরিবেশ সুরক্ষার নামে একটি রাষ্ট্রীয় ‘পরিকল্পিত পরিবেশগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে।

 

সিইটিপি: আধুনিকতার আড়ালে এক শুভঙ্করের ফাঁকি

সাভারের এই আধুনিক শিল্প নগরীর প্রাণভোমরা হওয়ার কথা ছিল সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি (CETP)। নিয়ম ছিল, ট্যানারির একটি ফোঁটা বিষাক্ত পানিও শোধন ছাড়া নদীতে যাবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, এই সিইটিপি শুরু থেকেই এক অকার্যকর শ্বেতহস্তী।

 

কারখানাগুলোর দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের তুলনায় সিইটিপি-র শোধন ক্ষমতা অনেক কম। তার ওপর ক্রোমিয়াম সেপারেশন ও কঠিন বর্জ্য (Solid Waste) ব্যবস্থাপনার স্থায়ী কোনো সমাধান আজও করা যায়নি। ফলে, প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত, ক্রোমিয়ামযুক্ত ও ক্ষারীয় তরল বর্জ্য কোনো প্রকার স্ক্রিনিং ছাড়াই সরাসরি গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীর বুকে। যে সিইটিপি-কে নদীর সুরক্ষাকবচ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন নদী দূষণের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।

 

দূষণের ভৌগোলিক বিস্তার: বুড়িগঙ্গার বিষ এখন ধলেশ্বরীতে

এই ট্র্যাজেডির ভিন্ন আঙ্গিকটি এখানেই—এটি কেবল একটি কারখানার অনিয়মের গল্প নয়, এটি ‘উন্নয়ন ও পরিবেশের’ মধ্যকার এক চরম বৈপরীত্য। হাজারীবাগে যা ছিল বিশৃঙ্খল ও অপরিকল্পিত, সাভারে এসে তা করা হয়েছে ‘পরিকল্পনার’ সিলমোহর দিয়ে। অর্থাৎ, দূষণকে কমানো যায়নি, কেবল তার স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।

একসময়ের প্রমত্তা ধলেশ্বরী আজ আলকাতরার মতো কালো আর উৎকট গন্ধে ভারী এক মৃত নালায় রূপ নিয়েছে। নদীটির পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (DO) মাত্রা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়, যা যেকোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য অসম্ভব। জেলেরা পেশা বদলেছেন, আর নদীপাড়ের কৃষিজমিগুলো রাসায়নিকের প্রভাবে উর্বরতা হারিয়ে বন্ধ্যা হয়ে পড়ছে।

 

দায় এড়ানোর বৃত্ত ও ধুঁকতে থাকা ভবিষ্যৎ

বিসিক এবং ট্যানারি মালিকদের মধ্যকার চিরন্তন কাদা ছোঁড়াছুড়ির বলি হচ্ছে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। বিসিকের দাবি—ট্যানারিগুলো তাদের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বর্জ্য ফেলছে এবং নিয়মনীতি মানছে না। অন্যদিকে, মালিকপক্ষের অভিযোগ—বিসিকের সরবরাহ করা সিইটিপি-র নকশাতেই গলদ রয়েছে এবং এটি পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে ব্যর্থ।

এই পারস্পরিক দায় এড়ানোর বৃত্তে আটকা পড়ে গেছে ধলেশ্বরী তীরবর্তী লাখো মানুষের জীবন। বাতাসে ভাসছে ক্রোমিয়াম আর হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ত বাষ্প, যা স্থানীয়দের ফুসফুস ও ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

একটি নদীকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে যে শিল্পায়ন, তা টেকসই অর্থনীতির পরিপন্থী। সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সিইটিপি-কে যদি অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কার্যকর এবং আধুনিকায়ন করা না হয়, তবে ধলেশ্বরীর এই বিষাক্ত জোয়ার অচিরেই বুড়িগঙ্গার মতোই আরেকটি নদীর চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস লিখে ফেলবে।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

‘পরিকল্পিত’ শিল্পায়নের নামে ধলেশ্বরীর ধীর মৃত্যু: সিইটিপি যেখানে এক অচল প্রতিশ্রুতি

আপডেট সময় ০১:৪৮:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর তাগিদে হাজারীবাগের ট্যানারি যখন সাভারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তখন দেশের পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষের মনে এক টুকরো আশার আলো জেগেছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিসিক পরিকল্পিত চামড়া শিল্প নগরী’। কিন্তু এক দশকের মাথায় এসে সেই ‘পরিকল্পনা’ এখন ধলেশ্বরী নদীর জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। হাজারীবাগের সেই চেনা বিষাক্ত ক্ষত এখন কেবল তার ভৌগোলিক ঠিকানা পরিবর্তন করে সাভারের ধলেশ্বরীকে এক কৃত্রিম কোমায় পাঠিয়ে দিয়েছে। পরিবেশবিদরা একে দেখছেন পরিবেশ সুরক্ষার নামে একটি রাষ্ট্রীয় ‘পরিকল্পিত পরিবেশগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে।

 

সিইটিপি: আধুনিকতার আড়ালে এক শুভঙ্করের ফাঁকি

সাভারের এই আধুনিক শিল্প নগরীর প্রাণভোমরা হওয়ার কথা ছিল সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপি (CETP)। নিয়ম ছিল, ট্যানারির একটি ফোঁটা বিষাক্ত পানিও শোধন ছাড়া নদীতে যাবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, এই সিইটিপি শুরু থেকেই এক অকার্যকর শ্বেতহস্তী।

 

কারখানাগুলোর দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের তুলনায় সিইটিপি-র শোধন ক্ষমতা অনেক কম। তার ওপর ক্রোমিয়াম সেপারেশন ও কঠিন বর্জ্য (Solid Waste) ব্যবস্থাপনার স্থায়ী কোনো সমাধান আজও করা যায়নি। ফলে, প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত, ক্রোমিয়ামযুক্ত ও ক্ষারীয় তরল বর্জ্য কোনো প্রকার স্ক্রিনিং ছাড়াই সরাসরি গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীর বুকে। যে সিইটিপি-কে নদীর সুরক্ষাকবচ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন নদী দূষণের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।

 

দূষণের ভৌগোলিক বিস্তার: বুড়িগঙ্গার বিষ এখন ধলেশ্বরীতে

এই ট্র্যাজেডির ভিন্ন আঙ্গিকটি এখানেই—এটি কেবল একটি কারখানার অনিয়মের গল্প নয়, এটি ‘উন্নয়ন ও পরিবেশের’ মধ্যকার এক চরম বৈপরীত্য। হাজারীবাগে যা ছিল বিশৃঙ্খল ও অপরিকল্পিত, সাভারে এসে তা করা হয়েছে ‘পরিকল্পনার’ সিলমোহর দিয়ে। অর্থাৎ, দূষণকে কমানো যায়নি, কেবল তার স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।

একসময়ের প্রমত্তা ধলেশ্বরী আজ আলকাতরার মতো কালো আর উৎকট গন্ধে ভারী এক মৃত নালায় রূপ নিয়েছে। নদীটির পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (DO) মাত্রা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়, যা যেকোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য অসম্ভব। জেলেরা পেশা বদলেছেন, আর নদীপাড়ের কৃষিজমিগুলো রাসায়নিকের প্রভাবে উর্বরতা হারিয়ে বন্ধ্যা হয়ে পড়ছে।

 

দায় এড়ানোর বৃত্ত ও ধুঁকতে থাকা ভবিষ্যৎ

বিসিক এবং ট্যানারি মালিকদের মধ্যকার চিরন্তন কাদা ছোঁড়াছুড়ির বলি হচ্ছে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। বিসিকের দাবি—ট্যানারিগুলো তাদের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বর্জ্য ফেলছে এবং নিয়মনীতি মানছে না। অন্যদিকে, মালিকপক্ষের অভিযোগ—বিসিকের সরবরাহ করা সিইটিপি-র নকশাতেই গলদ রয়েছে এবং এটি পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে ব্যর্থ।

এই পারস্পরিক দায় এড়ানোর বৃত্তে আটকা পড়ে গেছে ধলেশ্বরী তীরবর্তী লাখো মানুষের জীবন। বাতাসে ভাসছে ক্রোমিয়াম আর হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ত বাষ্প, যা স্থানীয়দের ফুসফুস ও ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

একটি নদীকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে যে শিল্পায়ন, তা টেকসই অর্থনীতির পরিপন্থী। সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সিইটিপি-কে যদি অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কার্যকর এবং আধুনিকায়ন করা না হয়, তবে ধলেশ্বরীর এই বিষাক্ত জোয়ার অচিরেই বুড়িগঙ্গার মতোই আরেকটি নদীর চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস লিখে ফেলবে।