বর্ষার অথৈ জলরাশিতে যখন বাংলাদেশের হাওরগুলো রূপ নেয় এক একটি জীবন্ত সমুদ্রে, তখন তার বুকে খেলা করে বেড়ায় শত প্রজাতির দেশীয় মাছ। কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ উপহার আর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আজ এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি। হাওরের বুক চিরে এক শ্রেণীর অসাধু মৎস্য শিকারির পাতা নিষিদ্ধ ‘রিং জাল’ বা চায়না দুয়ারি জালের মরণফাঁদ দিন দিন বিপন্ন করে তুলছে আমাদের জলজ পরিবেশকে। নিষিদ্ধ এই জালের অবাধ ব্যবহার শুধু যে মাছের বংশ ধ্বংস করছে তা নয়, বরং পুরো হাওর অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক চরম হুমকির মুখে।
হাওর অঞ্চলের মৎস্য সম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারেন্ট জালের চেয়েও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর এই রিং জাল। বর্ষার শুরুতে যখন ডিমওয়ালা মা মাছগুলো অবমুক্ত পানিতে ডিম ছাড়ার জন্য নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে, ঠিক তখনই এই জালগুলো পেতে রাখা হয়। অত্যন্ত ঘন ও ক্ষুদ্র ফাঁসের এই রিং জালের গঠন এমন যে, একবার কোনো জলজ প্রাণী এর ভেতরে প্রবেশ করলে আর বের হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে রেনু পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ থেকে শুরু করে আইড়, বোয়াল, চিতল, পাবদা, টেংরা বা পুঁটির মতো বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো নির্বিচারে ধরা পড়ছে। এমনকি মাছের খাদ্য হিসেবে পরিচিত জলজ কীটপতঙ্গ এবং ছোট শামুক-ঝিনুকও এই জালের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব শুধু মাছের সংখ্যার ওপরই পড়ছে না, বরং তা আঘাত হানছে হাওরের সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে। ছোট মাছ ও জলজ প্রাণীর অভাব দেখা দেওয়ায় খাদ্যের সংকটে পড়ছে হাওরে আসা অতিথি পাখি এবং স্থানীয় বক, পানকৌড়ি ও চিল। অন্যদিকে, মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী, যারা বংশপরম্পরায় হাওরের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন, তাদের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। প্রাকৃতিক উপায়ে মাছের বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় প্রতি বছরই কমছে দেশীয় মাছের উৎপাদন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের জাতীয় পুষ্টি চাহিদা ও অর্থনীতিতে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা এই বিশাল হাওর অঞ্চলের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। হাট-বাজারগুলোতে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে এই নিষিদ্ধ জাল, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেবল সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
হাওরের এই অমূল্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ। প্রথমত, রিং জাল ও চায়না দুয়ারির মতো ক্ষতিকর জালের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, হাওর পাড়ের সাধারণ জেলে ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তাদের বোঝাতে হবে যে, আজকের এই ক্ষণস্থায়ী অতি-মুনাফা আগামী দিনে তাদের নিজেদেরই জীবিকাহীন করে তুলবে। সরকারের মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় যদি প্রজনন মৌসুমে হাওরে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা যায়, তবেই হয়তো ফিরে আসবে হাওরের সেই চেনা রূপালী ঐশ্বর্য। আমাদের উদাসীনতায় যেন চিরতরে হারিয়ে না যায় দেশীয় মাছের এই স্বর্গরাজ্য।
নাসিমুল শুভ 









