সমুদ্রের অদ্ভুত জীবদের মধ্যে একটি হলো জেলিফিশ। নামের সঙ্গে ফিশ থাকলেও এটি আসলে মাছ নয়। বাংলাদেশের সমুদ্রে মাছধরা জেলেদের কাছে এর ডাকনাম নোনা, নুইন্না। দেশের উপকূলীয় এলাকায় সাদা বর্ণের বড় আকৃতির জেলিফিশ ইদানীং বেড়ে গেছে। সুন্দরবন উপকূল, কুয়াকাটা, কক্সবাজার সৈকতে ভেসে আসছে বিপুল সংখ্যক বিশাল সব জেলিফিশ। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জাল ভরে উঠছে জেলিফিশে, জাল এত ভারী হচ্ছে যে টেনে তোলা না গেলে জাল কেটে এই জেলিফিশের জট ছাড়াতে হচ্ছে। হাজার হাজার জেলিফিশ ভেসে সৈকতে আসছে, পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে।
ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই এমন রূপ দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে সুন্দরবন ঘেষা উপকূলে। এমনিতে উষ্ণ সমুদ্রে জেলিফিশ থাকাই স্বাভাবিক কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত জেলিফিশ দেখা যাচ্ছে, এমনটা বলছেন স্থানীয় জেলেরা।
গবেষকরা বলছেন, শীতের শেষে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ খানিকটা বেড়ে যায়।বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ খুব ভালো থাকে, যা জেলিফিশের বংশবিস্তারের জন্য উপযুক্ত সময়।

সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা অনুকূলে থাকায় এই সময়ে জেলিফিশের বংশবিস্তার বেড়ে যায়। মাছের ডিম, প্লাঙ্কটন ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ প্রাণি খেয়ে এরা দ্রুতই বেড়ে ওঠে। প্রজনন মৌসুম হওয়ায় প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে উপকূলীয় এলাকায় জেলিফিশের আধিক্য বেশ বেড়ে যায়।
তবে গত দুই মৌসুমে যে হারে জেলিফিশ উপকূলে দেখা যাচ্ছে তাকে স্বাভাবিক বলছেন না জেলে ও সামুদ্রিক প্রাণী গবেষকরা। তাদের ধারণা, বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশগত কোনো পরিবর্তন হয়েছে, এজন্যই সাম্প্রতিক সময়ে এত জেলিফিশ।
সমুদ্রবিজ্ঞানী ও গবেষকেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কম বৃষ্টিপাত, পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, সামুদ্রিক কচ্ছপের বিচরণ ও সংখ্যা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে ‘জেলিফিশ ব্লুম’ বা উচ্চ প্রজননহারের ঘটনা ঘটছে।
কচ্ছপের সঙ্গে জেলিফিশ বৃদ্ধির সম্পর্ক কী?
কচ্ছপ এবং সামুদ্রিক অনেক মাছ ও প্রাণী জেলিফিশকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। গবেষকদের ধারণা এগুলোর সংখ্যা কমে যাওয়ায় সমুদ্রে প্রতিবেশগত এই ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রে জেলিফিশের প্রধান খাদক হচ্ছে কচ্ছপ। সমুদ্রে জেলিফিশের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এরাই এতদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেও জানাচ্ছেন তারা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সামুদ্রিক কচ্ছপের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও বাংলাদেশের সমুদ্রে কচ্ছপের সংখ্যার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য গবেষকদের কাছে নেই। তারপরও কচ্ছপের সহজলভ্যতা, আবাসভূমিসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর চালানো পর্যবেক্ষণ থেকেই তারা বুঝতে পারছেন যে কচ্ছপের সংখ্যা কমছে।জেলিফিশের সংখ্যা এভাবে বেড়ে যাওয়াও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন সামুদ্রিক প্রাণী গবেষকরা।

কচ্ছপ কমছে কেন?
কচ্ছপ শিকার, এর ডিম সংগ্রহ, প্লাস্টিক দূষণ, জেলেদের অসচেতনতাসহ নানান কারণে সমুদ্রে কচ্ছপের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন গবেষকরা। শুধুমাত্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতেই প্রতিবছর গড়ে অন্তত: ২০টি সামুদ্রিক কচ্ছপের মরদেহ ভেসে আসছে। আর জেলেদের জালে আটকা কচ্ছপ মারা যাচ্ছে অবহেলায়।
সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে বঙ্গোপসাগরের জেলিফিশের যে থিকথিকে উপস্থিতি সেটা বলে দিচ্ছে প্রতিবেশগত সংকট কতটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। যা ভোগাতে পারে জনজীবন এবং অর্থনীতিকেও।
ডেস্ক রিপোর্ট 










