শুকিয়ে যাচ্ছে আমাজন নদী!

শুকিয়ে যাচ্ছে আমাজন নদী!

আমাজন একই সঙ্গে অরণ্য এবং নদীর নাম। চিরসবুজ বর্ষাবন আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। আর এই অরণ্যের প্রাণ যুগিয়ে চলা নদীটির নাম আমাজন, যা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। জলবায়ু পরিবর্তন প্রকৃতিতে যে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে তা থেকে বাদ যায়নি আমাজন নদীও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই শুকিয়ে পলির চর জাগছে আমাজন নদীতে। সাম্প্রতিক খরায় আমাজনের পানি শুকিয়েছে রেকর্ড হারে। প্রতি বছরই কম বেশি খরা হলেও খরাগুলো মারাত্মক হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।

ব্রাজিলের ভূতাত্ত্বিক পরিষেবা (এসজিবি) জানিয়েছে, আমাজন অববাহিকার অনেক নদীর পানির স্তর ক্রমাগত খরার মধ্যে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাজনের প্রধান উপনদী মাদেইরার পানির স্তর পোর্তো ভেলহো শহরে রেকর্ড ৪৮ সেন্টিমিটার নিচে নেমে গেছে। গড় সর্বনিম্নের চেয়েও নিচে নেমে গেছে পানির স্তর।

আমাজন বন জাগুয়ার, তাপির, হাওলার বানর, জায়ান্ট আর্মাডিলো, শ্লথ, ক্যাপিবারার মতো দারুণসব প্রাণীর বাসস্থান। অন্যদিকে আমাজন নদী বিখ্যাত গোলাপী ডলফিনের আবাসস্থল। এই নদীকে কেন্দ্র করেই দানবীয় অ্যানাকোন্ডা থেকে শুরু করে কালচে ক্ষুদে কুমির (কেইম্যান) এবং ধারালো দাঁতের পেটলাল পিরানহা মাছের জীবন আবর্তিত হয়। সব মিলিয়ে আমাজন বনের বাস্তুসংস্থানে আমাজন নদীই প্রাণশক্তি।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ আমাজনের পরিস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ রয়েছে। বনাঞ্চলটি আগামী দিনে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কাও রয়েছে।

এর আগে ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে গত বছর, ২০২৩ সালে আমাজনে তীব্র খরা দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এটি ঘটেছে। এল নিনোর প্রভাবে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে। ফলে আমাজনে বেশি গরম ও শুষ্ক অবস্থা বিরাজ করছে।

নিউজউইক-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমাজনের সবচেয়ে বড় শাখা নদী রিও নিগ্রোর পানিরস্তর ক্রমশ কমছে। প্রতিদিন ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) করে সেই স্তর কমছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কেন এই পানিস্তর কমে যাচ্ছে?

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর আমাজনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা, উল্লেখযোগ্যভাবে সেই হার কমছে। এতে গড় বৃষ্টি যা হয়, তাও কমেছে। আমাজন ওয়ার্কিং গ্রুপ-এর দাবি, আমাজনে পানির  ধারা কমতে থাকায় নদীসংলগ্ন যে সব জনপদ রয়েছে, সেগুলো খরার মুখে পড়তে পারে। রেডক্রস রেডক্রিসেন্টের গবেষক সিম্ফিওয়ি স্টুয়ার্ট বলেন, ‘আমাজনে বাস করা বহু সম্প্রদায় কখনো এমন খরা দেখেইনি।

ভয়াবহতার বার্তা দিয়েছিল গোলাপী ডলফিন

আমাজন নদীর গোলাপী ডলফিন একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী যা পৃথিবীতে পাওয়া হাতে গোনা কয়েকটি স্বাদু পানির ডলফিনগুলোর একটি। গতবছর ব্রাজিলের আমাজন নদীর একটি উপনদীতে ( লেক তেফে) এই বিরল ডলফিনের ১৭৮ টি মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই একের পর এক মরদেহ ভেসে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। বিশেষজ্ঞরা নামেন তদন্তে। জানা যায়, ওই উপনদী তথা লেক তেফের পানির তাপমাত্রা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

বিশেষজ্ঞরা দেখেন, লেক তেফের পানির তাপমাত্রা সেসময় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা বছরের এই সময়ের গড় তাপমাত্রা থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি। ব্রাজিলের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন মন্ত্রণালয়ের গ্রুপ মামিরাউয়া ইনস্টিটিউট সেসময় জানিয়েছিল, বিপন্ন প্রজাতির গোলাপি ডলফিনের মড়কের পেছনে কাজ করেছে অতিরিক্ত উষ্ণ পানি।

শুধু গোলাপী ডলফিন নয়, আমাজন অববাহিকায় আরও অনেক প্রাণীর মৃতদেহ মিলছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উষ্ণ নদী এবং কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাওয়া আমাজন মহাবনের প্রাণি-উদ্ভিদকূলের জন্য অশনিসংকেতই দেখাচ্ছে। ২০২১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪, প্রায় প্রতিবছরই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আমাজন নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এমন খবর উঠে আসছে বিশ্বগণমাধ্যমে।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান পরিবেশ অধিদপ্তরের

শুকিয়ে যাচ্ছে আমাজন নদী!

আপডেট সময় ০৬:৪১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ অক্টোবর ২০২৪

আমাজন একই সঙ্গে অরণ্য এবং নদীর নাম। চিরসবুজ বর্ষাবন আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। আর এই অরণ্যের প্রাণ যুগিয়ে চলা নদীটির নাম আমাজন, যা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। জলবায়ু পরিবর্তন প্রকৃতিতে যে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে তা থেকে বাদ যায়নি আমাজন নদীও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই শুকিয়ে পলির চর জাগছে আমাজন নদীতে। সাম্প্রতিক খরায় আমাজনের পানি শুকিয়েছে রেকর্ড হারে। প্রতি বছরই কম বেশি খরা হলেও খরাগুলো মারাত্মক হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।

ব্রাজিলের ভূতাত্ত্বিক পরিষেবা (এসজিবি) জানিয়েছে, আমাজন অববাহিকার অনেক নদীর পানির স্তর ক্রমাগত খরার মধ্যে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাজনের প্রধান উপনদী মাদেইরার পানির স্তর পোর্তো ভেলহো শহরে রেকর্ড ৪৮ সেন্টিমিটার নিচে নেমে গেছে। গড় সর্বনিম্নের চেয়েও নিচে নেমে গেছে পানির স্তর।

আমাজন বন জাগুয়ার, তাপির, হাওলার বানর, জায়ান্ট আর্মাডিলো, শ্লথ, ক্যাপিবারার মতো দারুণসব প্রাণীর বাসস্থান। অন্যদিকে আমাজন নদী বিখ্যাত গোলাপী ডলফিনের আবাসস্থল। এই নদীকে কেন্দ্র করেই দানবীয় অ্যানাকোন্ডা থেকে শুরু করে কালচে ক্ষুদে কুমির (কেইম্যান) এবং ধারালো দাঁতের পেটলাল পিরানহা মাছের জীবন আবর্তিত হয়। সব মিলিয়ে আমাজন বনের বাস্তুসংস্থানে আমাজন নদীই প্রাণশক্তি।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ আমাজনের পরিস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ রয়েছে। বনাঞ্চলটি আগামী দিনে ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কাও রয়েছে।

এর আগে ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে গত বছর, ২০২৩ সালে আমাজনে তীব্র খরা দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এটি ঘটেছে। এল নিনোর প্রভাবে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে। ফলে আমাজনে বেশি গরম ও শুষ্ক অবস্থা বিরাজ করছে।

নিউজউইক-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমাজনের সবচেয়ে বড় শাখা নদী রিও নিগ্রোর পানিরস্তর ক্রমশ কমছে। প্রতিদিন ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) করে সেই স্তর কমছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কেন এই পানিস্তর কমে যাচ্ছে?

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর আমাজনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা, উল্লেখযোগ্যভাবে সেই হার কমছে। এতে গড় বৃষ্টি যা হয়, তাও কমেছে। আমাজন ওয়ার্কিং গ্রুপ-এর দাবি, আমাজনে পানির  ধারা কমতে থাকায় নদীসংলগ্ন যে সব জনপদ রয়েছে, সেগুলো খরার মুখে পড়তে পারে। রেডক্রস রেডক্রিসেন্টের গবেষক সিম্ফিওয়ি স্টুয়ার্ট বলেন, ‘আমাজনে বাস করা বহু সম্প্রদায় কখনো এমন খরা দেখেইনি।

ভয়াবহতার বার্তা দিয়েছিল গোলাপী ডলফিন

আমাজন নদীর গোলাপী ডলফিন একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী যা পৃথিবীতে পাওয়া হাতে গোনা কয়েকটি স্বাদু পানির ডলফিনগুলোর একটি। গতবছর ব্রাজিলের আমাজন নদীর একটি উপনদীতে ( লেক তেফে) এই বিরল ডলফিনের ১৭৮ টি মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই একের পর এক মরদেহ ভেসে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। বিশেষজ্ঞরা নামেন তদন্তে। জানা যায়, ওই উপনদী তথা লেক তেফের পানির তাপমাত্রা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

বিশেষজ্ঞরা দেখেন, লেক তেফের পানির তাপমাত্রা সেসময় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা বছরের এই সময়ের গড় তাপমাত্রা থেকে ১০ ডিগ্রি বেশি। ব্রাজিলের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন মন্ত্রণালয়ের গ্রুপ মামিরাউয়া ইনস্টিটিউট সেসময় জানিয়েছিল, বিপন্ন প্রজাতির গোলাপি ডলফিনের মড়কের পেছনে কাজ করেছে অতিরিক্ত উষ্ণ পানি।

শুধু গোলাপী ডলফিন নয়, আমাজন অববাহিকায় আরও অনেক প্রাণীর মৃতদেহ মিলছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উষ্ণ নদী এবং কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাওয়া আমাজন মহাবনের প্রাণি-উদ্ভিদকূলের জন্য অশনিসংকেতই দেখাচ্ছে। ২০২১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪, প্রায় প্রতিবছরই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আমাজন নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এমন খবর উঠে আসছে বিশ্বগণমাধ্যমে।