জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের গভীর থেকে ভীতিকর বার্তা

জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের গভীর থেকে ভীতিকর বার্তা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রাও বাড়ছে। গভীর সমুদ্র বলতে সাগরের দুই কিলোমিটার গভীরত্বে অথবা তারও নীচে বোঝায়। কিন্তু পৃথিবীর সমুদ্রাঞ্চলের প্রায় পঞ্চাশ ভাগই এই গভীরতায়। আমাদের গ্রহের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এই নীরব, হিমশীতল জলভাগের গুরুত্ব অসীম। কিন্তু এখানেও তাপ বৃদ্ধি দিচ্ছে ভীতিকর সতর্কবার্তা।

সমুদ্রের নিচে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সামুদ্রিক প্রাণীদের বাসস্থানে বেশি প্রভাব পড়ছে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের মাত্রা ও পুষ্টির ঘনত্বও প্রভাবিত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিআইএসআরও এবং চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের একদল বিজ্ঞানী।

সিএসআইআরও’র বিজ্ঞানীরা বলছেন, গভীর সমুদ্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে চলেছে, এবং তার মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় হল সমুদ্রের গভীরতম স্তরগুলির তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এ’ধরণের সর্বাধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে দক্ষিণ মেরু এবং উত্তর আটলান্টিকের কাছ থেকে।

দু’টি এলাকাতেই অতি ঠাণ্ডা, লবণাক্ত পানি ওপর থেকে নীচে নেমে আসে – যার ফলে বিশ্বের জলভাগজুড়ে সামুদ্রিক প্রবাহগুলির সৃষ্টি হয়, এবং সেই সামুদ্রিক প্রবাহগুলিই আবার আমাদের জলবায়ু নির্ধারণ করে। যেমন ওই  সামুদ্রিক প্রবাহ ব্যতীত উত্তর ইউরোপে এরকম বাসযোগ্য পরিবেশ সম্ভব ছিল না।

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিআইএসআরও ও চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রা জানতে গবেষণা করছেন। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’- এ গভীর সমুদ্রের নিচে চালানো তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সমুদ্রের গভীরে তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে। সামুদ্রিক উষ্ণায়নের এই তথ্য উপেক্ষা করার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল প্রভাব সম্পর্কে জানা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা থাকলেও গভীর সমুদ্রের তথ্য বেশ কম জানা যায়। কিন্তু গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করে। এতে প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি থেকে শুরু করে সামুদ্রিক জীবের বাসস্থানের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। তাপপ্রবাহ বাড়ার কারণে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

এদিকে,যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক এন্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের গবেষকরা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ মেরুর মাঝে দক্ষিণ সমুদ্রের তাপমাত্রা প্রতি দশ বছরে এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের একশো ভাগের তিন ভাগ করে বাড়ছে। আসলে সমুদ্রগুলি হল এক ধরণের কার্বন ‘‘সিঙ্ক”, যেখানে প্রধানত কার্বন ডাইঅক্সাইড ধরা থাকে। মানুষের কার্যাবলীর ফলে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড সৃষ্টি হয়, সাগর তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ শুষে নেয়। আকাশে-বাতাসে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড আছে, পৃথিবীর সমুদ্রগুলিতে তার প্রায় ৫০ গুণ ধরা আছে৷ মানুষ প্রতিবছর প্রায় ছয় বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ করে।

বর্তমানে পৃথিবীর সমুদ্রগুলো এখনও কার্বন শুষে চলেছে। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঠিক সেটাই বদলাতে পারে। সেই সঙ্গে থাকবে সামুদ্রিক প্রবাহগুলির পরিবর্তন। প্রবাহের পরিবর্তনের ফলে সাগরের পানির পুষ্টিরও পরিবর্তন ঘটবে। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এই পরিবর্তন?   

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আরো পর্যবেক্ষণ চাই, আরো তথ্য চাই। আপাতত আমরা গভীর সমুদ্র সম্পর্কে যা জানি, তার চেয়ে মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে আমাদের ধারণা বেশী!

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান পরিবেশ অধিদপ্তরের

জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের গভীর থেকে ভীতিকর বার্তা

আপডেট সময় ০১:৩৬:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৪

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রাও বাড়ছে। গভীর সমুদ্র বলতে সাগরের দুই কিলোমিটার গভীরত্বে অথবা তারও নীচে বোঝায়। কিন্তু পৃথিবীর সমুদ্রাঞ্চলের প্রায় পঞ্চাশ ভাগই এই গভীরতায়। আমাদের গ্রহের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এই নীরব, হিমশীতল জলভাগের গুরুত্ব অসীম। কিন্তু এখানেও তাপ বৃদ্ধি দিচ্ছে ভীতিকর সতর্কবার্তা।

সমুদ্রের নিচে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সামুদ্রিক প্রাণীদের বাসস্থানে বেশি প্রভাব পড়ছে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের মাত্রা ও পুষ্টির ঘনত্বও প্রভাবিত হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিআইএসআরও এবং চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের একদল বিজ্ঞানী।

সিএসআইআরও’র বিজ্ঞানীরা বলছেন, গভীর সমুদ্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে চলেছে, এবং তার মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় হল সমুদ্রের গভীরতম স্তরগুলির তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এ’ধরণের সর্বাধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে দক্ষিণ মেরু এবং উত্তর আটলান্টিকের কাছ থেকে।

দু’টি এলাকাতেই অতি ঠাণ্ডা, লবণাক্ত পানি ওপর থেকে নীচে নেমে আসে – যার ফলে বিশ্বের জলভাগজুড়ে সামুদ্রিক প্রবাহগুলির সৃষ্টি হয়, এবং সেই সামুদ্রিক প্রবাহগুলিই আবার আমাদের জলবায়ু নির্ধারণ করে। যেমন ওই  সামুদ্রিক প্রবাহ ব্যতীত উত্তর ইউরোপে এরকম বাসযোগ্য পরিবেশ সম্ভব ছিল না।

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিআইএসআরও ও চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রা জানতে গবেষণা করছেন। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’- এ গভীর সমুদ্রের নিচে চালানো তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সমুদ্রের গভীরে তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে। সামুদ্রিক উষ্ণায়নের এই তথ্য উপেক্ষা করার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল প্রভাব সম্পর্কে জানা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা থাকলেও গভীর সমুদ্রের তথ্য বেশ কম জানা যায়। কিন্তু গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করে। এতে প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি থেকে শুরু করে সামুদ্রিক জীবের বাসস্থানের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। তাপপ্রবাহ বাড়ার কারণে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

এদিকে,যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক এন্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের গবেষকরা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ মেরুর মাঝে দক্ষিণ সমুদ্রের তাপমাত্রা প্রতি দশ বছরে এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের একশো ভাগের তিন ভাগ করে বাড়ছে। আসলে সমুদ্রগুলি হল এক ধরণের কার্বন ‘‘সিঙ্ক”, যেখানে প্রধানত কার্বন ডাইঅক্সাইড ধরা থাকে। মানুষের কার্যাবলীর ফলে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড সৃষ্টি হয়, সাগর তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ শুষে নেয়। আকাশে-বাতাসে যে কার্বন ডাইঅক্সাইড আছে, পৃথিবীর সমুদ্রগুলিতে তার প্রায় ৫০ গুণ ধরা আছে৷ মানুষ প্রতিবছর প্রায় ছয় বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ করে।

বর্তমানে পৃথিবীর সমুদ্রগুলো এখনও কার্বন শুষে চলেছে। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঠিক সেটাই বদলাতে পারে। সেই সঙ্গে থাকবে সামুদ্রিক প্রবাহগুলির পরিবর্তন। প্রবাহের পরিবর্তনের ফলে সাগরের পানির পুষ্টিরও পরিবর্তন ঘটবে। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এই পরিবর্তন?   

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আরো পর্যবেক্ষণ চাই, আরো তথ্য চাই। আপাতত আমরা গভীর সমুদ্র সম্পর্কে যা জানি, তার চেয়ে মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে আমাদের ধারণা বেশী!