অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত পাঠক কিংবা টেলিভিশনের সংবাদ স্ক্রলে নজর রাখারা খেয়াল করেছেন কি যে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত একটি খবর প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ে। সেটি হলো দুপুরের মধ্যে বা বিকেলে ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড় হতে পারে। দেশে গ্রীষ্মের শুরু থেকে একেবারে বর্ষার আগ পর্যন্ত সাধারণত বিকেলের দিকে আকাশ কালো করে দমকা হাওয়া-বজ্রসহ যে ঝড়টি আসে তা কালবৈশাখী হিসেবে পরিচিত।
ঝড়ের নাম কালবৈশাখী কেন?
আসলে এর উত্তর রয়েছে এই নামের মধ্যেই। শব্দটি আসলে দুই অংশে গড়া: ‘কাল’ এবং ‘বৈশাখী’। ‘কাল’ মানে ভয়ংকর, ধ্বংসাত্মক এবং বৈশাখী এসেছে বাংলা মাস বৈশাখ থেকে। অর্থাৎ বৈশাখ মাসে যে ভয়ংকর ঝড় দেখা যায়, সেটাই কালবৈশাখী।
বাংলা ক্যালেন্ডারের বৈশাখ মাস (এপ্রিল-মে) হলো গ্রীষ্মের শুরু। এই সময়টা সবচেয়ে গরম, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি, আর প্রকৃতিও থাকে বেশ অস্থির। এই অস্থিরতা থেকেই জন্ম নেয় হঠাৎ করে আসা এই ঝড়।
এই ঝড় শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই নয়; ভারতের আসাম, বিহার, এমনকি বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোয়ও হয়। তবে আমাদের অঞ্চলে এর তীব্রতা আর নাটকীয়তা একটু বেশি, তাই নামটাও বেশ ভয় ধরানো।
কালবৈশাখীর একটা ইংরেজি নামও আছে! একে ‘নরওয়েস্টার’ (Nor’wester) বলা হয়, কারণ এটি বেশিরভাগ সময় উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসে।
কালবৈশাখী কেন হয়, কিভাবে হয়?
এই ঝড়টি মূলত গ্রীষ্মকালীন অতিরিক্ত তাপের কারণে সৃষ্টি হয়। এর বিজ্ঞানসম্মত কারণগুলো হলো:
নিম্নচাপের সৃষ্টি: চৈত্র-বৈশাখ মাসে সূর্যের প্রচণ্ড তাপে ভূপৃষ্ঠের বাতাস খুব গরম ও হালকা হয়ে সরাসরি উপরে উঠে যায়। এতে ওই এলাকায় হঠাৎ বায়ুচাপ কমে গিয়ে নিম্নচাপ তৈরি হয়।
কালো মেঘের গঠন: উপরে ওঠা গরম বাতাস শীতল হয়ে বিশাল আকৃতির কালো মেঘ (কিউমুলোনিম্বাস) তৈরি করে।

বায়ুপ্রবাহ: এই শূন্যস্থান পূরণ করতে আশেপাশের শীতল ও ভারী বাতাস প্রচণ্ড বেগে সেই দিকে ধাবিত হয়। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এই ঠান্ডা বাতাস আসে বলে একে ইংরেজিতে ‘নর’ওয়েস্টার’ (Nor’wester) বলা হয়।
ঝড়বৃষ্টি: গরম ও ঠান্ডা বাতাসের এই সংঘর্ষের ফলে বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি এবং তীব্র বেগে বাতাস বইতে শুরু করে, যা কালবৈশাখী ঝড়ের রূপ নেয়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা খুব দ্রুত ঘটে, কখনো কখনো মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে!
সাধারণ ঝড় গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে হয় গভীর সমুদ্রে নিন্মচাপসহ নানা কারণে। এসব ঝড়ের সময় বিদ্যুৎ নাও চমকাতে পারে বা বজ্রপাত নাও হতে পারে।
কিন্তু কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকায় এবং বজ্রপাত হয়। এ ধরনের ঝড়ে সাইক্লোন বা টর্নেডোর মতো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি না হলেও যে এলাকায় এটি হয় সেখানে বাড়িঘর, জমি বা গাছপালার ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই কালবৈশাখী হয়। এর স্থায়িত্বকাল হয় অল্প। একটি কালবৈশাখী ঝড় তৈরি হয়ে পূর্ণতা লাভের পর ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত এর তীব্রতা থাকে। পরে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত শেষ বিকেলে এবং সন্ধ্যার দিকে কালবৈশাখী হয়। কিন্তু পূর্বাঞ্চলে সন্ধ্যার পরে হয়।
এই ঝড় যেমন ভয়ংকর, তেমনি উপকারীও। এটা গরম কমায়, ধুলা পরিষ্কার করে, মশার উপদ্রব হ্রাস করে আর অনেক সময় ফসলের জন্য দরকারি বৃষ্টি এনে দেয়।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















