উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে রুরাল ইকো ট্যুরিজম উদ্যোগ ‘উত্তরাভিযান’

  • নাসিমুল শুভ
  • আপডেট সময় ০৪:০০:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
  • 2260

উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে রুরাল ইকো ট্যুরিজম উদ্যোগ ‘উত্তরাভিযান’  

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ মিলিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় জনপদ উত্তরবঙ্গ হিসেবে পরিচিত । পাহাড়পুর  বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়, উত্তরা গণভবনসহ কত শত ঐতিহাসিক-প্রত্নস্থান আছে এই জনপদ জুড়ে। রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মা নদী, চলনবিলের মায়াভরা প্রকৃতি, রংপুর অঞ্চলে শীতের শান্ত টলটলে নদীকোলে ঝকঝকে চরাঞ্চল কিংবা পঞ্চগড় থেকে দেখা যাওয়া সোনারোদে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া, অপার্থিব সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক এবং  সাংস্কৃতিকতভাবে দেশের উত্তর জনপদ দারুণ সমৃদ্ধ হলেও এই অঞ্চলের পর্যটনের পালে কেন যে সমৃদ্ধির হাওয়া লাগেনি এটা বড় প্রশ্ন! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং উত্তরবঙ্গে গ্রামভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন সম্ভাবনা এবং তারুণ্যকে কাজে লাগাতে প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া।

আরডিএর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রায়োগিক গবেষণার অংশ হিসেবে সম্প্রতি একটি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনায় গতি আনতে ‘উত্তরাভিযান’ নামে এই রুরাল ইকো-ট্যুরিজম কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আপাতত ১৮ টি গ্রাম বেছে নিয়ে চলছে গ্রামভিত্তিক পর্যটন বিকাশের এই অনন্য উদ্যোগ। প্রকৃতি, বিশেষ পণ্য/আকর্ষণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিশেলে গ্রামীণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত এক পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে কার্যক্রমের বাস্তবায়ন করছে আরডিএ, বগুড়া।

উত্তরাভিযানে পর্যটকরা দেখতে পাবেন উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ও গ্রামীণ জনজীবনের বৈচিত্র্যময় নানা কিছু

কার্যক্রম সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তরবঙ্গের নওগাঁ, নাটোর,জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার প্রাকৃতিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং গ্রামীণ জনপদ, সংস্কৃতি নির্ভর পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে ও বিশ্বদুয়ারে পৌঁছে দিতে সমন্বিত ইকো-ট্যুরিজম কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যাকে তারা নাম দিয়েছেন উত্তরাভিযান (Expedition North)। তারা এই উদ্যোগকে রুরাল-ইকো ট্যুরিজম, অর্থাৎ গ্রামভিত্তিক পরিবেশবান্ধব ও শিক্ষামূলক পর্যটন বলছেন।

একই সঙ্গে এই কার্যক্রমের আওতায় বগুড়ায় ১২০ একরের আরডিএ ক্যাম্পাসকেও পর্যটকদের জন্য বহুমুখীভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবুজের মাঝে আরডিএ ক্যাম্পাসে প্রায় ৭০০ আবাসন সুবধিা সম্পন্ন ও স্থাস্থ্য সম্মত খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা, খেলার মাঠ, পুকুর, পার্ক, প্রদর্শনী খামার ঘুরে বেড়ানোসহ পর্যটকদের জন্য নানা সুবিধাদি আছে আরডিএ ক্যাম্পাসে। এছাড়া রয়েছে আরডিএতে অবস্থান করে উত্তরবঙ্গের প্রত্নতাত্বিক, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিশেষ গ্রাম, সবুজ শিল্প গ্রাম, যমুনা নদী ও চর, চলনবিলে পর্যটন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এ কার্যক্রমের আওতায়। এছাড়া এলাকাগুলোতে আরডিএ, বগুড়া পল্লী উন্নয়নের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন কার্যক্রম ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করা চলমান রয়েছে।

১২০ একরের আরডি, বগুড়ায় আছে পর্যটকদের জন্য আবাসন, খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা

এ বিষয়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বগুড়ার মহাপরিচালক এ. কে. এম অলি উল্যা প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘আমি পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বগুড়ায় যোগদান করার পর ট্যুরিজম পরিচালনা করার জন্য প্রায়োগিক গবেষণার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেখে মুগ্ধ হই। আমি মনে করি এই উদ্যোগের কল্যাণে আরডিএ, বগুড়াকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গের ইকো-ট্যুরিজমে গতিশীলতা আসবে এবং অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে, অর্থাৎ পল্লী উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এই ট্যুরিজমকে অর্থবহ, শিক্ষামূলক এবং আনন্দদায়ক করার লক্ষ্যে আরডিএ, বগুড়া বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং সুন্দরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। ট্যুরিজম বোর্ডের সাথে যুগপৎ কাজ করার জন্য তাদের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও TOAB (Tourism Operator Association of Bangladesh) এর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও  অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আরডিএতে একটি ফলপ্রসু সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। আমি এই উদ্যোগের সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।’

উত্তরবঙ্গে গ্রামভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম ভাবনার শুরুটা তুলে ধরেছেন আরডিএ’র যুগ্ম পরিচালক এবং রুরাল ইকো ট্যুরিজমের কো অর্ডিনেটর ড. মাকছুদ আলম খান।

তিনি প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সাধারণ ধারণা হলো ট্যুরিজম শুধু মাত্র সমুদ্র, পাহাড় পর্বত, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল ও দর্শনীয় স্থানই হলো ট্যুরিস্ট  স্পট। এ সমস্ত এলাকাতেই ট্যুরিস্টদের ভীড়  দেখা যায়। কিন্তু এসবের বাইরেও গ্রাম  বাংলার  সৌন্দর্য, সেখানকার জীবনযাত্রা, প্রকৃতি, নদী, চর এলাকা, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাও যে ট্যুরিজমের আকর্ষণ হতে পারে সে বিষয়ে তেমন কোন উদ্যোগ পরিচালিত হয়নি। বিশ্বের নানা দেশে দেখা যায় যে, ছোট ছোট এ সমস্ত আকর্ষণকেও সুন্দরভাবে উপস্থাপনার মাধ্যমে অনেক বড় ট্যুরিজম আকর্ষণে পরিণত করছে এবং ট্যুরিজমকে অনেকটা শিক্ষামূলক করে তুলছে। এর মাধ্যমে ট্যুরিস্টরা আনন্দ উপভোগের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইংল্যান্ডে বেশ কিছু ইউনিভার্সিটিতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পাঠদান বন্ধ থাকে। সে সময়ে হলগুলোর আবাসনকে অনেক কম ভাড়ায় ট্যুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ট্যুরিস্টরা এই আবাসন সুবিধা ব্যবহার করে ভার্সিটির আশেপাশের দর্শনীয় স্থান পরিভ্রমণ করছে। এতে করে খুব কম খরচে ট্যুরিজম পরিচালিত হচ্ছে। এ বিষয়টি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এ রকম ক্যাম্পাস ট্যুরিজমের কোনো প্রচলনই আমার দেশে নেই।’

আরডিএ ক্যাম্পাসে সহশিক্ষা কার্যক্রমে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উত্তরাভিযান সংশ্লিষ্টরা

ড. মাকছুদ বলেন, ‘বিদেশে পর্যটকদের আকর্ষণের এই চর্চা কিভাবে দেশের কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে ভাবতে থাকি। এক পর্যায়ে মনে হয়, দেশের উত্তরাঞ্চলে ট্যুরিজমের বিভিন্ন উপাদান থাকলেও তা অবহেলিত। সেই চিন্তা থেকে আরডিএ, বগুড়ার আবাসন, ক্যাফেটেরিয়া, অডিটরিয়ামসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আরডিএ, বগুড়াকে হাব (কেন্দ্র) করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ট্যুরিজম স্পট, বিশেষগ্রাম, নদী ও চর এলাকাগুলোকে যুক্ত করে এ ধরনের ট্যুরিজমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এতে করে ট্যুরিস্টরা কম খরচে আরডিএ, বগুড়াতে অবস্থান করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ট্যুরিজম স্পটে পরিভ্রমণ  করতে পারবে এবং আরডিএ সকল ধরনের সুবিধা প্রদান করতে পারবে, এ চিন্তা থেকেই মূলত আরডিএ ইকো-ট্যুরিজম কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করেছে। এ বছরের এপ্রিল মাস থেকে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু শিক্ষা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এ ট্যুরিজমের আওতায় উত্তরবঙ্গে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।’

এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে আরডিএ-কে পরামর্শসহায়তা করছে গবেষণা সংস্থা ‘ডাহুক’। সংস্থাটির পরিচালক মাগফি রেজা সিদ্দিক ‘উত্তরাভিযান’-এর বিস্তারিত জানিয়ে তিনি প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘মূলত উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের যোগাযোগ ও সার্বিক সংযুক্তি বাড়ানো, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে নতুন নতুন পর্যটন উদ্যোগগুলোকে সক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ হচ্ছে। এছাড়া এই অঞ্চলের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পুরো বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত ও সহজল্ভ্য করতে এই কার্যক্রম। মাগফি রেজা সিদ্দিক আরও বলেন, ‘বরেন্দ্রভুমিকে একটি পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দেশের পর্যটনে অন্যান্য এলাকায় পরিবেশের যে ক্ষতিসাধন হয়েছে উত্তরবঙ্গে যেন তেমন না হয় সে ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থেকেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।’

বাংলার জলাভূমির এক বিস্ময় নাটোরের চলন বিল

পরামর্শক হিসেবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগে যুক্ত হওয়া নিয়ে এই তরুণ বলেন, ‘দেশে মাত্র কয়েকটি চেনা পর্যটন কেন্দ্রে প্রতি মৌসুমে উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গে পর্যটন আকর্ষণগুলোতে পর্যটক টানার ব্যবস্থা করে একটা ভারসাম্য নিয়ে আসার চেষ্টা করছি আমরা। এতে উত্তরবঙ্গে পর্যটনের বিকাশ হবে সেই সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশবান্ধব কুটিরশিল্প পণ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদানের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবে। এই প্রচেষ্টায় আমরা উত্তরবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় পড়া তরুণদেরও সম্পৃক্ত করতে চাই।’

কেবল কথায় নয় কাজেও এগিয়ে চলেছে আরডিএ’র রুরাল ইকো ট্যুরিজম কার্যক্রম। ইতোমধ্যে উত্তরাভিযান নামের একটি তথ্যচিত্র সম্বলিত পুস্তিকাও প্রকাশিত হয়েছে। এতে উত্তরবঙ্গে ভ্রমণেচ্ছু পর্যটকদের সুবিধার্থে কয়েকটি জেলার ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জলাশয়, বিশেষ গ্রামের নামসহ সচিত্র-সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে।

উত্তরবঙ্গের জনজীবন, ভূপ্রকৃতি, নিসর্গ, নদী, লোকসংস্কৃতি ও স্থাপত্যশৈলীর নিজস্বতা গড়ে উঠেছে হাজার বছরের ধারাবাহিক চর্যা ও চর্চায়। দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময়খাত পর্যটনের সম্প্রসারণে ইকো-ট্যুরিজম ‘উত্তরাভিযান’, উত্তরবঙ্গের জন্যও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করবে এই প্রত্যাশা অংশীজনদের।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে রুরাল ইকো ট্যুরিজম উদ্যোগ ‘উত্তরাভিযান’

আপডেট সময় ০৪:০০:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ মিলিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় জনপদ উত্তরবঙ্গ হিসেবে পরিচিত । পাহাড়পুর  বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়, উত্তরা গণভবনসহ কত শত ঐতিহাসিক-প্রত্নস্থান আছে এই জনপদ জুড়ে। রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মা নদী, চলনবিলের মায়াভরা প্রকৃতি, রংপুর অঞ্চলে শীতের শান্ত টলটলে নদীকোলে ঝকঝকে চরাঞ্চল কিংবা পঞ্চগড় থেকে দেখা যাওয়া সোনারোদে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া, অপার্থিব সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক এবং  সাংস্কৃতিকতভাবে দেশের উত্তর জনপদ দারুণ সমৃদ্ধ হলেও এই অঞ্চলের পর্যটনের পালে কেন যে সমৃদ্ধির হাওয়া লাগেনি এটা বড় প্রশ্ন! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং উত্তরবঙ্গে গ্রামভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন সম্ভাবনা এবং তারুণ্যকে কাজে লাগাতে প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া।

আরডিএর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রায়োগিক গবেষণার অংশ হিসেবে সম্প্রতি একটি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনায় গতি আনতে ‘উত্তরাভিযান’ নামে এই রুরাল ইকো-ট্যুরিজম কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আপাতত ১৮ টি গ্রাম বেছে নিয়ে চলছে গ্রামভিত্তিক পর্যটন বিকাশের এই অনন্য উদ্যোগ। প্রকৃতি, বিশেষ পণ্য/আকর্ষণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিশেলে গ্রামীণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত এক পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে কার্যক্রমের বাস্তবায়ন করছে আরডিএ, বগুড়া।

উত্তরাভিযানে পর্যটকরা দেখতে পাবেন উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ও গ্রামীণ জনজীবনের বৈচিত্র্যময় নানা কিছু

কার্যক্রম সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তরবঙ্গের নওগাঁ, নাটোর,জয়পুরহাট, গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার প্রাকৃতিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং গ্রামীণ জনপদ, সংস্কৃতি নির্ভর পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে ও বিশ্বদুয়ারে পৌঁছে দিতে সমন্বিত ইকো-ট্যুরিজম কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যাকে তারা নাম দিয়েছেন উত্তরাভিযান (Expedition North)। তারা এই উদ্যোগকে রুরাল-ইকো ট্যুরিজম, অর্থাৎ গ্রামভিত্তিক পরিবেশবান্ধব ও শিক্ষামূলক পর্যটন বলছেন।

একই সঙ্গে এই কার্যক্রমের আওতায় বগুড়ায় ১২০ একরের আরডিএ ক্যাম্পাসকেও পর্যটকদের জন্য বহুমুখীভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবুজের মাঝে আরডিএ ক্যাম্পাসে প্রায় ৭০০ আবাসন সুবধিা সম্পন্ন ও স্থাস্থ্য সম্মত খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা, খেলার মাঠ, পুকুর, পার্ক, প্রদর্শনী খামার ঘুরে বেড়ানোসহ পর্যটকদের জন্য নানা সুবিধাদি আছে আরডিএ ক্যাম্পাসে। এছাড়া রয়েছে আরডিএতে অবস্থান করে উত্তরবঙ্গের প্রত্নতাত্বিক, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিশেষ গ্রাম, সবুজ শিল্প গ্রাম, যমুনা নদী ও চর, চলনবিলে পর্যটন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এ কার্যক্রমের আওতায়। এছাড়া এলাকাগুলোতে আরডিএ, বগুড়া পল্লী উন্নয়নের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন কার্যক্রম ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করা চলমান রয়েছে।

১২০ একরের আরডি, বগুড়ায় আছে পর্যটকদের জন্য আবাসন, খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা

এ বিষয়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বগুড়ার মহাপরিচালক এ. কে. এম অলি উল্যা প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘আমি পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বগুড়ায় যোগদান করার পর ট্যুরিজম পরিচালনা করার জন্য প্রায়োগিক গবেষণার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দেখে মুগ্ধ হই। আমি মনে করি এই উদ্যোগের কল্যাণে আরডিএ, বগুড়াকে কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গের ইকো-ট্যুরিজমে গতিশীলতা আসবে এবং অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে, অর্থাৎ পল্লী উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এই ট্যুরিজমকে অর্থবহ, শিক্ষামূলক এবং আনন্দদায়ক করার লক্ষ্যে আরডিএ, বগুড়া বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং সুন্দরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। ট্যুরিজম বোর্ডের সাথে যুগপৎ কাজ করার জন্য তাদের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও TOAB (Tourism Operator Association of Bangladesh) এর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও  অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আরডিএতে একটি ফলপ্রসু সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। আমি এই উদ্যোগের সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।’

উত্তরবঙ্গে গ্রামভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম ভাবনার শুরুটা তুলে ধরেছেন আরডিএ’র যুগ্ম পরিচালক এবং রুরাল ইকো ট্যুরিজমের কো অর্ডিনেটর ড. মাকছুদ আলম খান।

তিনি প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সাধারণ ধারণা হলো ট্যুরিজম শুধু মাত্র সমুদ্র, পাহাড় পর্বত, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল ও দর্শনীয় স্থানই হলো ট্যুরিস্ট  স্পট। এ সমস্ত এলাকাতেই ট্যুরিস্টদের ভীড়  দেখা যায়। কিন্তু এসবের বাইরেও গ্রাম  বাংলার  সৌন্দর্য, সেখানকার জীবনযাত্রা, প্রকৃতি, নদী, চর এলাকা, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাও যে ট্যুরিজমের আকর্ষণ হতে পারে সে বিষয়ে তেমন কোন উদ্যোগ পরিচালিত হয়নি। বিশ্বের নানা দেশে দেখা যায় যে, ছোট ছোট এ সমস্ত আকর্ষণকেও সুন্দরভাবে উপস্থাপনার মাধ্যমে অনেক বড় ট্যুরিজম আকর্ষণে পরিণত করছে এবং ট্যুরিজমকে অনেকটা শিক্ষামূলক করে তুলছে। এর মাধ্যমে ট্যুরিস্টরা আনন্দ উপভোগের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইংল্যান্ডে বেশ কিছু ইউনিভার্সিটিতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পাঠদান বন্ধ থাকে। সে সময়ে হলগুলোর আবাসনকে অনেক কম ভাড়ায় ট্যুরিস্টদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ট্যুরিস্টরা এই আবাসন সুবিধা ব্যবহার করে ভার্সিটির আশেপাশের দর্শনীয় স্থান পরিভ্রমণ করছে। এতে করে খুব কম খরচে ট্যুরিজম পরিচালিত হচ্ছে। এ বিষয়টি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এ রকম ক্যাম্পাস ট্যুরিজমের কোনো প্রচলনই আমার দেশে নেই।’

আরডিএ ক্যাম্পাসে সহশিক্ষা কার্যক্রমে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উত্তরাভিযান সংশ্লিষ্টরা

ড. মাকছুদ বলেন, ‘বিদেশে পর্যটকদের আকর্ষণের এই চর্চা কিভাবে দেশের কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে ভাবতে থাকি। এক পর্যায়ে মনে হয়, দেশের উত্তরাঞ্চলে ট্যুরিজমের বিভিন্ন উপাদান থাকলেও তা অবহেলিত। সেই চিন্তা থেকে আরডিএ, বগুড়ার আবাসন, ক্যাফেটেরিয়া, অডিটরিয়ামসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আরডিএ, বগুড়াকে হাব (কেন্দ্র) করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ট্যুরিজম স্পট, বিশেষগ্রাম, নদী ও চর এলাকাগুলোকে যুক্ত করে এ ধরনের ট্যুরিজমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এতে করে ট্যুরিস্টরা কম খরচে আরডিএ, বগুড়াতে অবস্থান করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ট্যুরিজম স্পটে পরিভ্রমণ  করতে পারবে এবং আরডিএ সকল ধরনের সুবিধা প্রদান করতে পারবে, এ চিন্তা থেকেই মূলত আরডিএ ইকো-ট্যুরিজম কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করেছে। এ বছরের এপ্রিল মাস থেকে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু শিক্ষা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এ ট্যুরিজমের আওতায় উত্তরবঙ্গে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।’

এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে আরডিএ-কে পরামর্শসহায়তা করছে গবেষণা সংস্থা ‘ডাহুক’। সংস্থাটির পরিচালক মাগফি রেজা সিদ্দিক ‘উত্তরাভিযান’-এর বিস্তারিত জানিয়ে তিনি প্রকৃতিবার্তাকে বলেন, ‘মূলত উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের যোগাযোগ ও সার্বিক সংযুক্তি বাড়ানো, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে নতুন নতুন পর্যটন উদ্যোগগুলোকে সক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ হচ্ছে। এছাড়া এই অঞ্চলের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পুরো বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত ও সহজল্ভ্য করতে এই কার্যক্রম। মাগফি রেজা সিদ্দিক আরও বলেন, ‘বরেন্দ্রভুমিকে একটি পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দেশের পর্যটনে অন্যান্য এলাকায় পরিবেশের যে ক্ষতিসাধন হয়েছে উত্তরবঙ্গে যেন তেমন না হয় সে ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থেকেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।’

বাংলার জলাভূমির এক বিস্ময় নাটোরের চলন বিল

পরামর্শক হিসেবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগে যুক্ত হওয়া নিয়ে এই তরুণ বলেন, ‘দেশে মাত্র কয়েকটি চেনা পর্যটন কেন্দ্রে প্রতি মৌসুমে উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গে পর্যটন আকর্ষণগুলোতে পর্যটক টানার ব্যবস্থা করে একটা ভারসাম্য নিয়ে আসার চেষ্টা করছি আমরা। এতে উত্তরবঙ্গে পর্যটনের বিকাশ হবে সেই সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশবান্ধব কুটিরশিল্প পণ্য ও সাংস্কৃতিক উপাদানের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবে। এই প্রচেষ্টায় আমরা উত্তরবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় পড়া তরুণদেরও সম্পৃক্ত করতে চাই।’

কেবল কথায় নয় কাজেও এগিয়ে চলেছে আরডিএ’র রুরাল ইকো ট্যুরিজম কার্যক্রম। ইতোমধ্যে উত্তরাভিযান নামের একটি তথ্যচিত্র সম্বলিত পুস্তিকাও প্রকাশিত হয়েছে। এতে উত্তরবঙ্গে ভ্রমণেচ্ছু পর্যটকদের সুবিধার্থে কয়েকটি জেলার ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জলাশয়, বিশেষ গ্রামের নামসহ সচিত্র-সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে।

উত্তরবঙ্গের জনজীবন, ভূপ্রকৃতি, নিসর্গ, নদী, লোকসংস্কৃতি ও স্থাপত্যশৈলীর নিজস্বতা গড়ে উঠেছে হাজার বছরের ধারাবাহিক চর্যা ও চর্চায়। দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময়খাত পর্যটনের সম্প্রসারণে ইকো-ট্যুরিজম ‘উত্তরাভিযান’, উত্তরবঙ্গের জন্যও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করবে এই প্রত্যাশা অংশীজনদের।