গতকাল শনিবার এক দিনেই দেশের ছয় জেলায় বজ্রাঘাতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১২ জন। নিহতদের মধ্যে ৯ জনই কৃষক। যারা জীবিকার তাগিদে খোলা মাঠে ছিলেন, আর সেখানেই প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বজ্রপাত।
বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তালগাছ লাগানো, বজ্রনিরোধক ও লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনসহ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়। একে দুর্যোগও ঘোষণা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বজ্রপাতে হতাহত কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল প্রকল্প, বড় গাছ কাটা বন্ধ না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরির চেষ্টা না থাকায় মৃত্যু রোধ হচ্ছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১১ থেকে এ বছরের গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১৫ বছরে বজ্রপাতে ৪ হাজার ৩৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বজ্রপাতে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সময় মে, জুন ও আগস্ট মাস। তখন আকাশে বজ্রমেঘের ঘনত্ব বেশি থাকে।
গত বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘ব্রিজিং সায়েন্স উইথ কমিউনিটিজ: ডেভেলপিং আ কমিউনিটিবেজড লাইটনিং আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জানমাল বজ্রপাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ জরিপে অংশ নেওয়া হাওরবাসীর ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, সতর্কবার্তা পেলেও তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন না।
গবেষণা অনুযায়ী, বজ্রপাতের সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৬২ শতাংশ ঘটনা ঘটে মে মাসে। জুনে ঘটে ২৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং আগস্টে ২১ দশমিক ৪২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের মানুষ। বিদ্যুৎ ঝলকানির সময় প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি হয়, যা সূর্যের তাপের চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এ সময় প্রায় ৩০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যেখানে আমাদের ঘরবাড়িতে মাত্র ২২০ ভোল্ট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা বজ্রপাতের আগাম বার্তা পান, তাদের মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ বার্তা অগ্রাহ্য করেন। সাড়ে ৫ শতাংশ মানুষ সতর্কতার পরও হাওরে কাজ চালিয়ে যান। ১১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দেরিতে বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, সতর্কবার্তার পর তারা ১০ থেকে ৩০ মিনিট সময় পান নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে। প্রতিবছর হাওরাঞ্চলের ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বজ্রাঘাতে হতাহত হন। ১৭ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে মাঠের ফসল নষ্ট হয় বা গবাদি পশু মারা যায়।
কেন বাড়ছে বজ্রপাত?
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, পরিবেশগত পরিবর্তন বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট, বায়ুদূষণ এবং গাছপালা ধ্বংসের কারণে দেশের তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু এবং উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর সংঘর্ষে তৈরি হচ্ছে বজ্রমেঘ। এই সংঘর্ষ যত তীব্র হচ্ছে, বজ্রপাতের ঘটনাও তত বাড়ছে। আরেকটি বড় কারণ– গাছপালা কমে যাওয়া। আগে মাঠের পাশে তাল, বাবলা, রেইনট্রি গাছ থাকত, যা বজ্রপাতের আঘাত নিজের দিকে টেনে নিত। এখন খোলা মাঠে মানুষ ও গবাদিপশুই সবচেয়ে উঁচু বস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছে–ফলে বজ্রপাত সরাসরি তাদের ওপর আঘাত করছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মালিক বলেন, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিয়ে আসছে। ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগের পূর্বাভাসের পাশাপাশি নদীবন্দরগুলোর জন্য নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে ‘নাউকাস্টিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা প্রদান শুরু হয়েছে, যেখানে স্যাটেলাইট তথ্য ও গ্লোবাল লাইটনিং ডিটেকশন সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে। তবু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কারণ, সতর্কবার্তা থাকলেও তা সব সময় মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না বা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।
সচেতনতার অভাবে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অর্থাৎ বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে এখন সবচেয়ে বেশি দরকার সরকারি-বেসরকারি প্রচারণা।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 










