গ্রীষ্মের তিন ফুল

Shot by Mijan

মোঃ মিজানুর রহমান : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে একেকটি ঋতুর আগমন ঘটে। এক ঋতুর সাথে আরেক ঋতুর কিছু ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য থাকে। প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম এবং সর্বশেষ ঋতু বসন্ত। বসন্তকে ঋতুরাজ ও মধুঋতু বলা হয়। বসন্ত ঋতুর ধারাবাহিকতা এসে পড়ে গ্রীষ্ম ঋতুর ওপর। বসন্তকালে অনেক উদ্ভিদের নতুন পাতা গজানো শুরু হয়, সেই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে গ্রীষ্মকালেও। বসন্তকালে প্রকৃতি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, মৌমাছির আনাগোনা শুরু হয়। তেমনি মধুদূত বা মধুসখা অর্থাৎ কোকিলের কুহু… কুহু… ডাকও শুরু হয়। তাই এই ঋতু মধুঋতু যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। বসন্তের ফুলের ধারাবাহিকতা এসে পড়ে গ্রীষ্ম ঋতুতে। ফুলের দিক থেকে গ্রীষ্মকাল কোনো অংশেই বসন্তকালের চেয়ে কম নয়। সর্বোপরি এই ঋতুর শেষ অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ মাসে শুরু হয় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি ফল খাওয়ার সময়। বলা হয় দেশের ৬০ ভাগের বেশি ফল পাওয়া যায় গ্রীষ্মকালে।

গ্রীষ্মকালে দেশি-বিদেশি যে ফুলগুলো আমাদের দেশের প্রকৃতিতে পাওয়া যায় তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে শুধু কয়েকটির নাম উল্লেখ করা হলো। পারুল, জারুল, সোনালু, আছর বা বন আছরা, কৃষ্ণচূডা, পাদাউক, পুত্রঞ্জীব, কনকচূড়া, জ্যাকারান্ডা, গুলাচ বা কাঠগোলাপ, লালসোনাইল (ক্যাসিয়া জাভানিকা), চাঁপা, অর্জুন, বেরিয়া, বাওবাব, চিকরাশি, কেলিকদম, মাকড়িশাল, ইপিল ইপিল, করঞ্জা, পলক জুঁই, পরশপিপুল, রক্তন, কামিনী ইত্যাদি। আমরা এখানে কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালু, চাঁপা নামক চারটি বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা করা হলো।

কৃষ্ণচূড়া : গ্রীষ্মের ফুল প্রসঙ্গ প্রথমে আসে অতি পরিচিত কৃষ্ণচূড়া। গাছটি আমাদের নিজস্ব নয়। আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার। ১৮২৪ সালে মাদাগাস্কার থেকে মরিশাস, পরে ইংল্যান্ড এবং সেখান থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স¤প্রসারিত হয়। বর্তমানে মেলানেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। আমাদের দেশেও অসংখ্য গাছ আছে। ঢাকা শহরের অন্যতম পথতরু কৃষ্ণচূড়া। সংসদ ভবনের উত্তর দিকে একটি সুদৃশ্য বীথি আছে। যদিও ২০১০ সালে আদিনিবাস মাদাগাস্কারে এই উদ্ভিদটি বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

লাল কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি- লেখক

ওষুধ, খাদ্য, কাঠ, জ্বালানির জন্য আদিভূমির বাসিন্দারা বন থেকে কৃষ্ণচূড়া গাছ সংগ্রহ করত। পৃথিবীর অনেক দেশে শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে পার্ক, বাগান বা রাস্তার পাশে দেখা যায়। কৃষ্ণচূড়া বহুবর্ষজীবী, দ্রুতবর্ধনশীল, পত্রমোচী, কাঁটাযুক্ত, মাঝারী আকারের প্রশস্ত ও ছত্রাকার মাথাঅলা বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। অনেক সময় গাছের উচ্চতার চেয়ে প্রশস্ততা বেশি হয়।

বাকল ধূসর রঙের; সামান্য ফাটা। পাতা যৌগিক, দ্বিপক্ষল। পাতার বিন্যাস একান্তর, তবে পত্রফলকের বিন্যাস বিপরীত। পত্রফলক খুব ছোট ও অসংখ্য, আয়তাকার, গোড়া কিছুটা তেছরা, আগা ভোতা, কিনারা মসৃণ। ওপরের পিঠের রঙ উজ্জ্বল সবুজ, চকচকে, নিচের পিঠ কিছুটা ম্লান। মধ্য শিরা নিচের দিকে গ্রন্থিময়। ফুল প্রান্তিক রেসিম। বৃতি নল ছোট ও কাপ আকারের। ফুলের পাপড়ি ৫টি, উপবৃত্তাকার-গোলাকার। চারটি পাপড়ির রঙ লাল থেকে কমলা। ওপরের পাপড়ি বড়, ভিন্ন রঙের ও কারুকার্যময়। হলুদ কৃষ্ণচূড়ার চারটি পাপড়ি হলুদ এবং বড় পাপড়ির রঙ আংশিক সাদা। ফুল সুগন্ধযুক্ত। ফল শিমজাতীয়, আকারে অনেক বড় ও শক্ত, দেখতে তলোয়ারের মতো। কচি ফল সবুজ, পাকা ফল গাঢ়-ধূসর। ফলে বীজ অনেক। বীজ থেকেই বংশবিস্তার। শীতকালে পাতা ঝরে পড়ে, বসন্তে নতুন পাতা গজায়। বসন্তের শেষে ফুলের আনাগোনা শুরু হয় এবং গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা পর্যন্ত দীর্ঘসময় গাছে ফুল থাকে। হলুদ রঙের ফুল থাকে শুধু গ্রীষ্মকালে। কৃষ্ণচূড়া ফুল যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন এর শাখা-প্রশাখা খুবই নরম। সামান্য ঝড়ে ভেঙে পড়ে। কাঠও মূল্যহীন। জ্বালানি ছাড়া আর কোনো কাজেই লাগে না।

হলুদ কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি- লেখক

পৃথিবীতে লাল, হলুদ ও সাদা জাতের কৃষ্ণচূড়া দেখা যায়। তিন জাতের কৃষ্ণচূড়াই বাংলাদেশে দেখা আছে। Delonix regia পরিবারের কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম উবষড়হরী ৎবমরধ. বাংলায় কৃষ্ণচূড়া বা হলুদ বা সাদা কৃষ্ণচূড়া বলে। ইংরেজিতে বলে Flame Tree, Yellow bloom, Royal poinciana. White Gulmohar, White Poincian.

সোনালু : গ্রীষ্মের আরেকটি আকর্ষণীয় ফুল সোনালু। হাজার হাজার বছর ধরে গাছটি নজরকাড়া, সুন্দর মনোলোভা ফুল দিয়ে আসছে। উপমহাদেশের মানুষ যখন দেবদেবীর পূজা করা শুরু করে তখন দেবদেবীকুলের পদতলে পুষ্প দেয়ার রেওয়াজ চালু হয়। কিন্তু সোনালুই একমাত্র ফুল যেটি পদতলের না দিয়ে কানে পরানো হয়। মহাকবি কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে বর্ণোজ্জ্বল পুষ্পগুচ্ছ সোনালুর কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাক আর্য যুগ বা তার আগে দ্রাবিড় সভ্যতার কাল থেকেই মানুষ সোনালু গাছের সাহায্যে চিকিৎসার শুরু করে। বর্তমানেও এই ফুল মানুষের মনকে আন্দোলিত করে চলেছে। সোনালুর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ ও মিয়ানমার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে। পার্ক, বাগান ও রাস্তার পাশে শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে লাগানো হয়। ঢাকা শহরে অনেক সোনালু গাছ চোখে পরে। ওসমানী উদ্যানে, সংসদ ভবনের সামনে সুন্দও সুন্দর বীথি রয়েছে।

পাতাসহ সোনালু ফুল। ছবি- লেখক

সোনালু মাঝারি আকারের, বহুবর্ষজীবী, ধীর বৃদ্ধি সম্পূর্ণ, পত্রমোচী বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি ১০ থেকে ১৫ মিটার উঁচু ও ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার ব্যাসের হয়। বাকল আঁচিলের মতো কিছুটা উঁচু, রঙ সবুজাব ধুসর বা ইটের মতো লাল। ডাল নরম ও নিচের দিকে অবনত। পাতা যৌগিক, জোড়পক্ষল। পাতার বিন্যাস একান্তর, তবে পত্রফলকের বিন্যাস বিপরীত। একটি পাতায় ৪ থেকে ৮ জোড়া পত্রফলক থাকে। পত্রফলক ডিম্বাকার, গোড়া কীলকাকার, সামনে ছুঁচাল, কিনারা মসৃণ। পাতার ওপরের পিঠ উজ্জ্বল সবুজ, নিচের পিঠ ¤øান, উভয় পিঠ মসৃণ। প্রধান শিরা নিচের দিকে গ্রন্থিময়। ফুল কাক্ষিক, পুষ্পমঞ্জরী বৃহৎ, ঝুলন্ত। ফুল উজ্জ্বল হলুদ, সুদর্শন, সুগন্ধযুক্ত। অনেক সময় হালকা হলুদ ফুলও দেখা যায়। পাপড়ি ৫টি, অসম, মসৃণ, বিডিম্বাকার। পুংকেশর ১০টি, গর্ভদণ্ড সরু, বাঁকানো, হালকা সবুজ। ফল অনেক লম্বা, ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত, নলাকার, মসৃণ, কাষ্ঠল। চিকন লম্বা ফলের কারণে সাধারণের কাছে এটি ‘বানরলাঠি’ নামে পরিচিত। কাচা ফলের রঙ সবুজ, পরিপক্ব ফলের রঙ গাঢ় বাদামী থেকে কালো। বসন্তে পাতা শূন্য গাছে শুধু পাকা ফল ঝুলতে থাকে। ফলের ভিতরে মিষ্টি চিটচিটে আঠালো শাঁস থাকে, শাঁসের মধ্যে গোল পয়সা আকারের অসংখ্য বীজ থাকে। বীজ ও পরিপক্ব ডাল কাটিং থেকে বংশবিস্তার।

সোনালু কাঠের রঙ লাল ও খুব শক্ত, ভারি কাজের উপযোগী। ঢেঁকি, সাঁকো, খুঁটি, বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তৈরিতে ও নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। এই কাঠ থেকে ভালো মানের কাঠ-কয়লা পাওয়া যায়। গাছের বাকলে ১২ ভাগ ট্যানিন থাকে, যা চামড়া ট্যান করার কাজে লাগে। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় হাজার হাজার বছর ধরে সোনালু গাছের ফুল, পাতা, গাছ বা মূলের ছাল ও ফলের শাঁস ব্যবহার হচ্ছে।

দুই রঙের সোনালু ফুল গাছ। ছবি- লেখক

বাংলা নাম সোনালু, সোনালি, হোনাইল, বানর বা বান্দর লাঠি। ইংরেজিতে Golden Shower Tree, Indian Laburnum বলা হয়। সোনালুর বৈজ্ঞানিক নাম -Cassia fistula, পরিবার – Fabaceae.

জারুল : জারুল আমাদের অতি পরিচিত। বেশ কয়েক প্রকারের জারুল দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জারুল ফুল ফুটলেও প্রধানত গ্রীষ্মকালে যে জারুল ফোটে সেটি বাংলায় জারুল, কাঁটা জারুল, পাইন্যা জারুল। ইংরেজিতে Pride-of-India, Queens Crape বৈজ্ঞানিক নাম- Lagerstroemia speciosa, পরিবার – Lythraceae.

পাতা, কলি ও ফলসহ জারুল ফুল। ছবি- লেখক

জারুল বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের জলাভূমির উদ্ভিদ হলেও জলাভূমি ছাড়াও স্বাভাবিক শুষ্কতায় বাঁচতে পারে। তাই একে শহরে যেমন দেখা যায়, তেমনি পাহাড়ি অঞ্চলেও দেখা যায়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে জারুল গাছ রয়েছে। লাল, বেগুনি ও সাদা রঙের মিশ্রণে ফুলগুলোর প্রস্ফুটন মানুষের মন-প্রাণ আন্দোলিত করে তোলে পুরো গ্রীষ্মকাল, এমনকি বর্ষাকালজুড়েও।

আসাম ও মিয়ানমারের লোকজন ওষুধ ও বিভিন্ন উপকরণের উৎস হিসেবে বন থেকে জারুল গাছ কেটে আনে এবং সেরা কাঠ হিসেবে কেনাবেচাও হয়। ফুলের গাছের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভালো ছায়াদানকারী গাছ হিসেবে পার্ক, বাগান বা রাস্তার পাশে লাগানো হয়। জারুল বহুবর্ষজীবী, দ্রুত বৃদ্ধিসম্পন্ন, মাঝারি আকারের, পত্রমোচী, গোল মাথাঅলা বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয়। বাকল মসৃণ, হালকা বাদামি রঙের। প্রায়ই বাকলের ওপরের অংশ খসে পরে ও ধূসর রঙের নতুন বাকল দেখা যায়। কাঠ সাধারণত সোজা ও লম্বা শিরাময়। পাতা সরল, বিপরীত, মসৃণ, ওপরের পিঠ সবুজ, নিচের পিঠ ম্লান, উপবৃত্তাকার বা আয়তাকার-ভল্লাকার, গোড়া গোলাকার, সামনেটা ভোতা বা সুক্ষ্মাগ্র কিনারা মসৃণ। শিরা জালির মতো, মধ্যশিরা ও পার্শ্বশিরা গ্রন্থিময়। পুষ্পমঞ্জরী প্রান্তিক যৌগিক, শাখায়িত। প্রতিটি শাখায় একাধিক ফুল হয়। কুড়ি শৈলশিরাময় এবং বিবর্ণ মরিচা বর্ণের ঘন ছোট লোম দিয়ে ঢাকা। দলমণ্ডল গোলাপি বা বেগুনি বা সাদা বর্ণের, মসৃণ বলিযুক্ত পাপড়ি দিয়ে গঠিত। পাপড়ি ছয়টি, অর্ধবৃত্তাকার বা গোলাকার-ডিম্বাকার। ফুলের বৃতি শক্ত, ধূসর-সবুজ, রোমশ, ফুলের সাথে যুক্ত। পাপড়ি পড়ে গেলেও বৃতি পরে না, ফলের সাথে যুক্ত থাকে। পুংকেশর অনেক, গর্ভদণ্ড লম্বা। ফুল সুগন্ধি। ফল ক্যাপসুল, ডিম্বাকার ও বৃতিযুক্ত। ফলে অনেক বীজ থাকে। বীজ ত্রিকোণাকার, হালকা বাদামি রঙের, দ্বিপক্ষল বা ডাবল ডানাযুক্ত। বীজ ও মূলের সাকার থেকে বংশবিস্তার।

পাতা, কলি ও ফলসহ জারুল ফুল। ছবি- লেখক

জারুল কাঠের রঙ লালচে সাদা, খুবই টেকসই ও শক্ত। পানির নিচেও কাঠ ভালো থাকে। ফলে এই কাঠ দিয়ে নৌকাসহ নৌকার সব উপকরণ এবং পুল, বাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। জারুলের বাকলে ১২ ভাগ ট্যানিন থাকে। চামড়া ট্যান করা কাজে লাগানো হয়। শিকড় ও পাতা বিরেচক, বাকল উত্তেজক ও জ্বররোধী। শিকড়, পাতা ও ফল অনেক দেশীয় ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

ট্যাগস :

প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান পরিবেশ অধিদপ্তরের

গ্রীষ্মের তিন ফুল

আপডেট সময় ১২:২০:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪

মোঃ মিজানুর রহমান : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে একেকটি ঋতুর আগমন ঘটে। এক ঋতুর সাথে আরেক ঋতুর কিছু ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য থাকে। প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম এবং সর্বশেষ ঋতু বসন্ত। বসন্তকে ঋতুরাজ ও মধুঋতু বলা হয়। বসন্ত ঋতুর ধারাবাহিকতা এসে পড়ে গ্রীষ্ম ঋতুর ওপর। বসন্তকালে অনেক উদ্ভিদের নতুন পাতা গজানো শুরু হয়, সেই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে গ্রীষ্মকালেও। বসন্তকালে প্রকৃতি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, মৌমাছির আনাগোনা শুরু হয়। তেমনি মধুদূত বা মধুসখা অর্থাৎ কোকিলের কুহু… কুহু… ডাকও শুরু হয়। তাই এই ঋতু মধুঋতু যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। বসন্তের ফুলের ধারাবাহিকতা এসে পড়ে গ্রীষ্ম ঋতুতে। ফুলের দিক থেকে গ্রীষ্মকাল কোনো অংশেই বসন্তকালের চেয়ে কম নয়। সর্বোপরি এই ঋতুর শেষ অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ মাসে শুরু হয় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদি ফল খাওয়ার সময়। বলা হয় দেশের ৬০ ভাগের বেশি ফল পাওয়া যায় গ্রীষ্মকালে।

গ্রীষ্মকালে দেশি-বিদেশি যে ফুলগুলো আমাদের দেশের প্রকৃতিতে পাওয়া যায় তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে শুধু কয়েকটির নাম উল্লেখ করা হলো। পারুল, জারুল, সোনালু, আছর বা বন আছরা, কৃষ্ণচূডা, পাদাউক, পুত্রঞ্জীব, কনকচূড়া, জ্যাকারান্ডা, গুলাচ বা কাঠগোলাপ, লালসোনাইল (ক্যাসিয়া জাভানিকা), চাঁপা, অর্জুন, বেরিয়া, বাওবাব, চিকরাশি, কেলিকদম, মাকড়িশাল, ইপিল ইপিল, করঞ্জা, পলক জুঁই, পরশপিপুল, রক্তন, কামিনী ইত্যাদি। আমরা এখানে কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালু, চাঁপা নামক চারটি বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা করা হলো।

কৃষ্ণচূড়া : গ্রীষ্মের ফুল প্রসঙ্গ প্রথমে আসে অতি পরিচিত কৃষ্ণচূড়া। গাছটি আমাদের নিজস্ব নয়। আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার। ১৮২৪ সালে মাদাগাস্কার থেকে মরিশাস, পরে ইংল্যান্ড এবং সেখান থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স¤প্রসারিত হয়। বর্তমানে মেলানেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। আমাদের দেশেও অসংখ্য গাছ আছে। ঢাকা শহরের অন্যতম পথতরু কৃষ্ণচূড়া। সংসদ ভবনের উত্তর দিকে একটি সুদৃশ্য বীথি আছে। যদিও ২০১০ সালে আদিনিবাস মাদাগাস্কারে এই উদ্ভিদটি বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

লাল কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি- লেখক

ওষুধ, খাদ্য, কাঠ, জ্বালানির জন্য আদিভূমির বাসিন্দারা বন থেকে কৃষ্ণচূড়া গাছ সংগ্রহ করত। পৃথিবীর অনেক দেশে শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে পার্ক, বাগান বা রাস্তার পাশে দেখা যায়। কৃষ্ণচূড়া বহুবর্ষজীবী, দ্রুতবর্ধনশীল, পত্রমোচী, কাঁটাযুক্ত, মাঝারী আকারের প্রশস্ত ও ছত্রাকার মাথাঅলা বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। অনেক সময় গাছের উচ্চতার চেয়ে প্রশস্ততা বেশি হয়।

বাকল ধূসর রঙের; সামান্য ফাটা। পাতা যৌগিক, দ্বিপক্ষল। পাতার বিন্যাস একান্তর, তবে পত্রফলকের বিন্যাস বিপরীত। পত্রফলক খুব ছোট ও অসংখ্য, আয়তাকার, গোড়া কিছুটা তেছরা, আগা ভোতা, কিনারা মসৃণ। ওপরের পিঠের রঙ উজ্জ্বল সবুজ, চকচকে, নিচের পিঠ কিছুটা ম্লান। মধ্য শিরা নিচের দিকে গ্রন্থিময়। ফুল প্রান্তিক রেসিম। বৃতি নল ছোট ও কাপ আকারের। ফুলের পাপড়ি ৫টি, উপবৃত্তাকার-গোলাকার। চারটি পাপড়ির রঙ লাল থেকে কমলা। ওপরের পাপড়ি বড়, ভিন্ন রঙের ও কারুকার্যময়। হলুদ কৃষ্ণচূড়ার চারটি পাপড়ি হলুদ এবং বড় পাপড়ির রঙ আংশিক সাদা। ফুল সুগন্ধযুক্ত। ফল শিমজাতীয়, আকারে অনেক বড় ও শক্ত, দেখতে তলোয়ারের মতো। কচি ফল সবুজ, পাকা ফল গাঢ়-ধূসর। ফলে বীজ অনেক। বীজ থেকেই বংশবিস্তার। শীতকালে পাতা ঝরে পড়ে, বসন্তে নতুন পাতা গজায়। বসন্তের শেষে ফুলের আনাগোনা শুরু হয় এবং গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা পর্যন্ত দীর্ঘসময় গাছে ফুল থাকে। হলুদ রঙের ফুল থাকে শুধু গ্রীষ্মকালে। কৃষ্ণচূড়া ফুল যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন এর শাখা-প্রশাখা খুবই নরম। সামান্য ঝড়ে ভেঙে পড়ে। কাঠও মূল্যহীন। জ্বালানি ছাড়া আর কোনো কাজেই লাগে না।

হলুদ কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি- লেখক

পৃথিবীতে লাল, হলুদ ও সাদা জাতের কৃষ্ণচূড়া দেখা যায়। তিন জাতের কৃষ্ণচূড়াই বাংলাদেশে দেখা আছে। Delonix regia পরিবারের কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম উবষড়হরী ৎবমরধ. বাংলায় কৃষ্ণচূড়া বা হলুদ বা সাদা কৃষ্ণচূড়া বলে। ইংরেজিতে বলে Flame Tree, Yellow bloom, Royal poinciana. White Gulmohar, White Poincian.

সোনালু : গ্রীষ্মের আরেকটি আকর্ষণীয় ফুল সোনালু। হাজার হাজার বছর ধরে গাছটি নজরকাড়া, সুন্দর মনোলোভা ফুল দিয়ে আসছে। উপমহাদেশের মানুষ যখন দেবদেবীর পূজা করা শুরু করে তখন দেবদেবীকুলের পদতলে পুষ্প দেয়ার রেওয়াজ চালু হয়। কিন্তু সোনালুই একমাত্র ফুল যেটি পদতলের না দিয়ে কানে পরানো হয়। মহাকবি কালিদাস তাঁর মেঘদূত কাব্যে বর্ণোজ্জ্বল পুষ্পগুচ্ছ সোনালুর কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাক আর্য যুগ বা তার আগে দ্রাবিড় সভ্যতার কাল থেকেই মানুষ সোনালু গাছের সাহায্যে চিকিৎসার শুরু করে। বর্তমানেও এই ফুল মানুষের মনকে আন্দোলিত করে চলেছে। সোনালুর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ ও মিয়ানমার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে। পার্ক, বাগান ও রাস্তার পাশে শোভাময় উদ্ভিদ হিসেবে লাগানো হয়। ঢাকা শহরে অনেক সোনালু গাছ চোখে পরে। ওসমানী উদ্যানে, সংসদ ভবনের সামনে সুন্দও সুন্দর বীথি রয়েছে।

পাতাসহ সোনালু ফুল। ছবি- লেখক

সোনালু মাঝারি আকারের, বহুবর্ষজীবী, ধীর বৃদ্ধি সম্পূর্ণ, পত্রমোচী বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি ১০ থেকে ১৫ মিটার উঁচু ও ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার ব্যাসের হয়। বাকল আঁচিলের মতো কিছুটা উঁচু, রঙ সবুজাব ধুসর বা ইটের মতো লাল। ডাল নরম ও নিচের দিকে অবনত। পাতা যৌগিক, জোড়পক্ষল। পাতার বিন্যাস একান্তর, তবে পত্রফলকের বিন্যাস বিপরীত। একটি পাতায় ৪ থেকে ৮ জোড়া পত্রফলক থাকে। পত্রফলক ডিম্বাকার, গোড়া কীলকাকার, সামনে ছুঁচাল, কিনারা মসৃণ। পাতার ওপরের পিঠ উজ্জ্বল সবুজ, নিচের পিঠ ¤øান, উভয় পিঠ মসৃণ। প্রধান শিরা নিচের দিকে গ্রন্থিময়। ফুল কাক্ষিক, পুষ্পমঞ্জরী বৃহৎ, ঝুলন্ত। ফুল উজ্জ্বল হলুদ, সুদর্শন, সুগন্ধযুক্ত। অনেক সময় হালকা হলুদ ফুলও দেখা যায়। পাপড়ি ৫টি, অসম, মসৃণ, বিডিম্বাকার। পুংকেশর ১০টি, গর্ভদণ্ড সরু, বাঁকানো, হালকা সবুজ। ফল অনেক লম্বা, ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত, নলাকার, মসৃণ, কাষ্ঠল। চিকন লম্বা ফলের কারণে সাধারণের কাছে এটি ‘বানরলাঠি’ নামে পরিচিত। কাচা ফলের রঙ সবুজ, পরিপক্ব ফলের রঙ গাঢ় বাদামী থেকে কালো। বসন্তে পাতা শূন্য গাছে শুধু পাকা ফল ঝুলতে থাকে। ফলের ভিতরে মিষ্টি চিটচিটে আঠালো শাঁস থাকে, শাঁসের মধ্যে গোল পয়সা আকারের অসংখ্য বীজ থাকে। বীজ ও পরিপক্ব ডাল কাটিং থেকে বংশবিস্তার।

সোনালু কাঠের রঙ লাল ও খুব শক্ত, ভারি কাজের উপযোগী। ঢেঁকি, সাঁকো, খুঁটি, বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তৈরিতে ও নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। এই কাঠ থেকে ভালো মানের কাঠ-কয়লা পাওয়া যায়। গাছের বাকলে ১২ ভাগ ট্যানিন থাকে, যা চামড়া ট্যান করার কাজে লাগে। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় হাজার হাজার বছর ধরে সোনালু গাছের ফুল, পাতা, গাছ বা মূলের ছাল ও ফলের শাঁস ব্যবহার হচ্ছে।

দুই রঙের সোনালু ফুল গাছ। ছবি- লেখক

বাংলা নাম সোনালু, সোনালি, হোনাইল, বানর বা বান্দর লাঠি। ইংরেজিতে Golden Shower Tree, Indian Laburnum বলা হয়। সোনালুর বৈজ্ঞানিক নাম -Cassia fistula, পরিবার – Fabaceae.

জারুল : জারুল আমাদের অতি পরিচিত। বেশ কয়েক প্রকারের জারুল দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জারুল ফুল ফুটলেও প্রধানত গ্রীষ্মকালে যে জারুল ফোটে সেটি বাংলায় জারুল, কাঁটা জারুল, পাইন্যা জারুল। ইংরেজিতে Pride-of-India, Queens Crape বৈজ্ঞানিক নাম- Lagerstroemia speciosa, পরিবার – Lythraceae.

পাতা, কলি ও ফলসহ জারুল ফুল। ছবি- লেখক

জারুল বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলের জলাভূমির উদ্ভিদ হলেও জলাভূমি ছাড়াও স্বাভাবিক শুষ্কতায় বাঁচতে পারে। তাই একে শহরে যেমন দেখা যায়, তেমনি পাহাড়ি অঞ্চলেও দেখা যায়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে জারুল গাছ রয়েছে। লাল, বেগুনি ও সাদা রঙের মিশ্রণে ফুলগুলোর প্রস্ফুটন মানুষের মন-প্রাণ আন্দোলিত করে তোলে পুরো গ্রীষ্মকাল, এমনকি বর্ষাকালজুড়েও।

আসাম ও মিয়ানমারের লোকজন ওষুধ ও বিভিন্ন উপকরণের উৎস হিসেবে বন থেকে জারুল গাছ কেটে আনে এবং সেরা কাঠ হিসেবে কেনাবেচাও হয়। ফুলের গাছের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভালো ছায়াদানকারী গাছ হিসেবে পার্ক, বাগান বা রাস্তার পাশে লাগানো হয়। জারুল বহুবর্ষজীবী, দ্রুত বৃদ্ধিসম্পন্ন, মাঝারি আকারের, পত্রমোচী, গোল মাথাঅলা বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচু হয়। বাকল মসৃণ, হালকা বাদামি রঙের। প্রায়ই বাকলের ওপরের অংশ খসে পরে ও ধূসর রঙের নতুন বাকল দেখা যায়। কাঠ সাধারণত সোজা ও লম্বা শিরাময়। পাতা সরল, বিপরীত, মসৃণ, ওপরের পিঠ সবুজ, নিচের পিঠ ম্লান, উপবৃত্তাকার বা আয়তাকার-ভল্লাকার, গোড়া গোলাকার, সামনেটা ভোতা বা সুক্ষ্মাগ্র কিনারা মসৃণ। শিরা জালির মতো, মধ্যশিরা ও পার্শ্বশিরা গ্রন্থিময়। পুষ্পমঞ্জরী প্রান্তিক যৌগিক, শাখায়িত। প্রতিটি শাখায় একাধিক ফুল হয়। কুড়ি শৈলশিরাময় এবং বিবর্ণ মরিচা বর্ণের ঘন ছোট লোম দিয়ে ঢাকা। দলমণ্ডল গোলাপি বা বেগুনি বা সাদা বর্ণের, মসৃণ বলিযুক্ত পাপড়ি দিয়ে গঠিত। পাপড়ি ছয়টি, অর্ধবৃত্তাকার বা গোলাকার-ডিম্বাকার। ফুলের বৃতি শক্ত, ধূসর-সবুজ, রোমশ, ফুলের সাথে যুক্ত। পাপড়ি পড়ে গেলেও বৃতি পরে না, ফলের সাথে যুক্ত থাকে। পুংকেশর অনেক, গর্ভদণ্ড লম্বা। ফুল সুগন্ধি। ফল ক্যাপসুল, ডিম্বাকার ও বৃতিযুক্ত। ফলে অনেক বীজ থাকে। বীজ ত্রিকোণাকার, হালকা বাদামি রঙের, দ্বিপক্ষল বা ডাবল ডানাযুক্ত। বীজ ও মূলের সাকার থেকে বংশবিস্তার।

পাতা, কলি ও ফলসহ জারুল ফুল। ছবি- লেখক

জারুল কাঠের রঙ লালচে সাদা, খুবই টেকসই ও শক্ত। পানির নিচেও কাঠ ভালো থাকে। ফলে এই কাঠ দিয়ে নৌকাসহ নৌকার সব উপকরণ এবং পুল, বাড়ি নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। জারুলের বাকলে ১২ ভাগ ট্যানিন থাকে। চামড়া ট্যান করা কাজে লাগানো হয়। শিকড় ও পাতা বিরেচক, বাকল উত্তেজক ও জ্বররোধী। শিকড়, পাতা ও ফল অনেক দেশীয় ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।