গভীর জলের প্রাণী তিমি নানা কারণে প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদ থেকে নিঃসৃত উচ্ছিষ্টও মহামূল্যবান। এই উচ্ছিষ্টের নাম অ্যাম্বারগ্রিস, একে সাগরের গুপ্তধন এবং ভাসমান সোনাও বলা হয়ে থাকে। আসলে স্পার্ম হোয়েলের পরিপাকতন্ত্রে নিঃসৃত রস জমাট বেঁধে তৈরি হয় অ্যাম্বারগ্রিস। নিজের পরিপাকতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য সামুদ্রিক প্রাণীটি এ ধরনের রস নিঃসরণ করে থাকে এবং এটাই শক্ত হয়ে অ্যাম্বারগ্রিস হয়।
সাধারণত স্পার্ম হোয়েল প্রজাতির তিমির মুখ দিয়ে অথবা পায়ুপথে বের হয় মোমের মতো পদার্থ অ্যাম্বারগ্রিস, এটি দাহ্যও বটে। এর প্রতি কেজির বাজারমূল্য ২কোটি টাকারও বেশি। এই পদার্থ এমনিতে দুষ্প্রাপ্য, কারণ সব স্পার্ম হোয়েলে মানসম্পন্ন অ্যাম্বারগ্রিস উৎপন্ন হয় না। সাধারণত আটলান্টিক সাগর, ব্রাজিল, মাদাগাস্কার, মালদ্বীপ, চীন, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের সমুদ্রতটে মাঝে মাঝে অ্যাম্বারগ্রিস ভেসে আসে।

তবে অ্যাম্বারগ্রিস নিয়ে বাংলাদেশেও হচ্ছে আলোচনা। কারণ উপকূলে পাচারকারীদের কাছে মিলেছে এই দুর্লভ দামী তিমির বমি। এইতো কিছুদিন আগে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ৮ কেজি ৩৯৮ গ্রাম তিমি বমিসহ (অ্যাম্বারগ্রিস) এক যুবককে আটক করেছে বিজিবি। বিজিবি জানিয়েছে, উদ্ধার করা তিমি মাছের বমির দাম প্রায় ২০ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
কেন এত দামী তিমির বমি?
এক কথায় অ্যাম্বারগ্রিস আসলেই ভাসমান সোনা, এর দামেই পরিচয়। দুর্লভ এই পদার্থ দিয়ে দামি পারফিউম বা সুগন্ধি তৈরি হয়। মানুষ বহু আগে থেকেই এটি ব্যবহার করে এলেও এর উৎস ছিল অজ্ঞাত। এমনকি ১৭ লাখ ৫০ হাজার বছরের পুরোনো ফসিলের নমুনাও মিলেছে অ্যাম্বারগ্রিসের। মানুষ এটি কাজে লাগাতে শুরু করে তা-ও অন্তত হাজার বছর আগে থেকে।

তিমির বমির দুষ্প্রাপ্যতা এবং সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহারই একে এতটা মূল্যবান করে তুলেছে। এর ঘ্রাণ বিভিন্ন রকম হতে পারে। কখনো কস্তুরির সঙ্গেও মিল পাওয়া যায়।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের মতে, যদি পারফিউম তৈরির কারখানায় সুগন্ধ বেছে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি গন্ধ পছন্দ করেন, তাহলে অ্যাম্বারগ্রিসের আউন্স-প্রতি মূল্য কয়েক হাজার ডলার হতে পারে।

অ্যামব্রেইন নামক গন্ধহীন একধরনের অ্যালকোহলের কারণে এটি আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে। অ্যাম্বারগ্রিস থেকে এই অ্যালকোহল বের করা হয়। পারফিউমের সুগন্ধ দীর্ঘস্থায়ী করতে ব্যবহার করা হয় অ্যামব্রেইন।
পারফিউম বা সুগন্ধি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান শেইমেনের মালিক নভেম্বার নিকোলাস বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত মূল্যবান পদার্থ, যা তার অনন্য গন্ধ এবং সংরক্ষণকারী গুণাবলির জন্য পরিচিত। এটি যুক্ত করা হলে সুগন্ধ আরও গাঢ় ও স্থায়ী হয়।’
ফরাসি সুগন্ধি তৈরিতে অ্যাম্বারগ্রিস এখনো খুব সাধারণ একটি উপাদান। ফ্রান্স ছাড়াও ইংল্যান্ডসহ আরও কিছু দেশে এর বিপণন বৈধ।
তিমির বমির কারবার নিষিদ্ধ
আঠারো শতকে বিপুল পরিমাণে তিমি শিকার শুরুর আগে বিশ্বে ১১ লাখ স্পার্ম তিমি ছিল। এখন কেবল ৩ লাখ অবশিষ্ট আছে। আর তাই পাছে তিমি শিকারে উৎসাহিত করে, তাই অনেক দেশে সুগন্ধি তৈরিতে অ্যাম্বারগ্রিস নিষিদ্ধ। তেমনি অবৈধ এটি কেনাবেচায়ও। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ।

এদিকে কক্সবাজারে অ্যাম্বারগ্রিস উদ্ধারের পর বিজিবি জানায়, তিমির বমি হিসেবে পরিচিত অ্যাম্বারগ্রিসের বিক্রি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ হয়ে অ্যাম্বারগ্রিসের চোরাচালান বিরল ঘটনা।
২০২২ সালে ভারতের কেরালার ভিঝিনজাম এলাকার সমুদ্রে ২৮ কেজি ওজনের অ্যাম্বারগ্রিস পান জেলেরা। বিপুল পরিমাণে এত দামি এই পদার্থ দেশটির উপকূলীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন জেলেরা। ভারতেও অ্যাম্বারগ্রিস বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ।
এর আগে ২০২১ সালে ইয়েমেনের ৩৫ জেলে এডেন সাগরে একটি মরা তিমি ভাসতে দেখেন। তিমিটি থেকে উৎকট গন্ধ আসছিল, এরপর সেটির পেট কেটে তারা ১২৭ কেজি অ্যাম্বারগ্রিস বের করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ওই অ্যাম্বারগ্রিস বিক্রি করে প্রায় ১৫ লাখ ডলার পান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির দরিদ্র জেলেরা। বদলে যায় তাদের ভাগ্য।
ডেস্ক রিপোর্ট 










