পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য মিঠাপানির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাবে বর্তমান বিশ্ব এক ভয়াবহ ওয়াটার ক্রাইসিস বা পানি সংকটের সম্মুখীন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় দুই বিলিয়নেরও (২০০ কোটি) বেশি মানুষ বর্তমানে নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকটে ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কবাণীতে বলছে, যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা পানির অভাবজনিত তীব্র চাপের মুখে পড়বে।

এই সংকট কেবল প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এবং সম্পদের অসম বণ্টনের ফলেই ঘনীভূত হচ্ছে। পানির অভাব কেবল তৃষ্ণা মেটানোর সমস্যা নয়, এটি সরাসরি একটি দেশের ইকোনমি বা অর্থনীতি, মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর আঘাত হানছে।
অধিক জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে পৃথিবীতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, যার প্রতিটি ধাপে প্রচুর পরিমাণ ফ্রেশ ওয়াটার বা মিঠা পানি ব্যয় হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় বড় সিটি বা মেগাসিটিগুলোতে পানির সাপ্লাই চেইন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরবানাইজেশন বা নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং কংক্রিটের আধিক্যের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে শহরগুলোতে ওয়াটার টেবিল বা পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে।
পানির এই সংকটের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে প্রাকৃতিক পানি চক্র বিঘ্নিত হচ্ছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসি-র বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কোথাও হঠাৎ করে ফ্লাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা হচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী ড্রাউট বা খরার প্রকোপ বাড়ছে। হিমালয় বা আল্পস পর্বতমালার মতো বিশাল বিশাল গ্লেসিয়ার বা হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে বাড়লেও ভবিষ্যতে এগুলো পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যেহেতু বিশ্বের একটি বড় অংশের কৃষি ও পানের পানি নদীর ওপর নির্ভরশীল, তাই হিমবাহ গলে যাওয়া মানেই হলো ভবিষ্যতে কয়েকশ কোটি মানুষের পানির উৎস হারিয়ে যাওয়া।
কৃষি সেচ এবং কলকারখানার প্রয়োজনে আমরা যে হারে পানি তুলছি, প্রকৃতি সেই হারে তা রিচার্জ বা পুনরায় পূর্ণ করতে পারছে না। অনেক দেশে কৃষকরা ডিপ টিউবওয়েল বা গভীর নলকূপ ব্যবহার করে এত বেশি পানি উত্তোলন করছেন যে, মাটির নিচের পাথুরে স্তরগুলো ধসে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।
কেবল পানির পরিমাণ কমে যাওয়াই নয়, বরং বিদ্যমান পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়াও একটি ভয়াবহ সমস্যা। পানিদূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ। কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদী এবং হ্রদে মিশে পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। এর পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ জলজ পরিবেশকে ধ্বংস করছে।

সব মিলিয়ে জীবনের উৎস পানির সংকট ক্রমে মারাত্মক হয়ে উঠছে। বর্তমানে চলমান তেল সংকটে হয়তো জীবন বাঁচবে কিন্তু পানীয় জলের সংকটে জীবন হবে দুর্বিষহ। এই পরিস্থিতিতে এখনই বিশ্বের সবচেয়ে দামী সম্পদ, পানীয় জল রক্ষায় জীবনধারা পরিবর্তন, অতিলোভ থেকে সরে আসা এবং পানির অপচয় রোধের আহ্বান জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 










