পৃথিবীব্যাপী ‘বিপন্ন’ এবং বাংলাদেশে ‘মহাবিপন্ন’ এক প্রাণী উল্লুক। নানান বৈশিষ্ট্যের কারণে এরা বানরের থেকে অধিকতর উন্নত। পুরোপুরিভাবে তারা বৃক্ষচারী প্রাণী। এ দেশের অতিবিরল স্তন্যপায়ী প্রাণী উল্লুক। বনমানুষ, নরবানর, হুতু বান্দর বা কালা বান্দর নামেও পরিচিত। এরাই এ দেশের একমাত্র লেজবিহীন বানর। ইংরেজি নাম ওয়েস্টার্ন হুল্লুক গিবন বা হোয়াইট-ব্রাউড গিবন। গোত্র হাইলোব্যাটিডি ও বৈজ্ঞানিক নাম Hoolock hoolock। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও মিয়ানমারে দেখা যায়। আমাদের মিশ্র চিরসবুজ ও পাতাঝরা বনের বাসিন্দা। বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড়ি বনে উল্লুকের দেখা মেলে। তবে আবাসস্থল ধ্বংস, বনের উঁচু বৃক্ষের অভাব, প্রয়োজনীয় বুনো ফল-লতাপাতাসহ প্রাকৃতিক খাদ্য সংকটে বাংলাদেশ থেকে এরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়া এই প্রাণীটিকে প্রকৃতিতে কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায় এ নিয়ে দেশে পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ক কর্মশালাটি শুরু হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। পরবর্তীতে আরেকটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সবশেষ ‘মহাবিপন্ন’ উল্লুক রক্ষায় জাতীয় কর্ম মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চূড়ান্ত কর্মশালাটি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হবে বলে আয়োজকরা জানান।

সোমবার (১১ নভেম্বর) শ্রীমঙ্গলের টি হ্যাভেন রির্সোটের সেমিনার হলে দিনব্যাপী এক কর্মশালার আয়োজন করে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. জাহাঙ্গীর আলম। উল্লুক বিষয়ক এ কর্মশালায় মাঠ পর্যায়ের মূল্যবান গবেষণা তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. হাবিবুর নাহার।
বাংলাদেশে উল্লুকের সংখ্যা প্রসঙ্গে ড. হাবিবুন নাহার বলেন, গুটিংস এবং আকন্দের উদ্যোগে দেশে উল্লুকের সর্বপ্রথম গণনা শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। তখন ৯শ’টি পরিবারে তিন হাজার সংখ্যা ছিল। পরবর্তীতে ফিরোজ এবং ইসলামের উদ্যোগে ১৯৯২ সালের গণনায় ৫৫টি পরিবারে ২শ’টি উল্লুক প্রাপ্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। ২০০০ সালে দাস এবং তার দল ৯৬টি পরিবারের ২৮২টি উল্লুক রেকর্ডভুক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, উল্লুকের বসবাসের জন্য ঘন ও উপযুক্ত বনের প্রয়োজন যা একমাত্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেই আছে। বাংলাদেশের সব বনভূমি অত্যন্ত ধ্বংসের মুখে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশের বনভূমিতে উল্লুখের সংখ্যা এবং অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। ২০০৬ থেকে ২০২০ এর মধ্যে যেহেতু বাংলাদেশের বনভূমি অনেক হ্রাস পেয়েছে তাই আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করছি উল্লুকের সংখ্যা কমেছে। সর্বশেষ তথ্য সম্পর্কে ড. ড. হাবিবুন বলেন, ২০০৩ সালে দাস ও তার দল বাংলাদেশে উল্লুকের অবস্থানের বিষয়ে দেশে ১৪টি স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালে দেশে ৩৫টি স্থান বের করে ২৫টি স্থানে উল্লুকের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।

২০০৯-২০১০ সালে দেশের ২২টি স্থান পরিমার্জন করা হয় এবং বাকি তিনটি বনভূমি অত্যন্ত হ্রাস পাওয়ায় উল্লুকের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ওই দেশে ২২টি স্থানের উপর জরিপ করে ১৩৫টি পরিবারের প্রায় মোট ৪৬৮টি উল্লুক রেকর্ডভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান। উল্লুক সংরক্ষণবিষয়ক কর্মশালায় বনবিভাগের নানা কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী, বন্যপ্রাণী গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি, বনপ্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠনের প্রতিনিধি, বন সংলগ্ন অধিবাসী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীসহ ২০ জন অংশগ্রহণকারী এতে প্রশিক্ষণ নেন।
ডেস্ক রিপোর্ট 










