পদ্মা চরের কৃষকের হাসি ম্লান হয়ে গেছে

মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর পদ্মার চরে বর্ষার নতুন পানি আসছে। চারদিকে ঢেউ খেলছে। আন্ধারমানিক এলাকায় গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। এটা যেন মিনি কক্সবাজার। চারিদিকে বিস্তৃত চর। নানান ফসলি জমি। নদীপথে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় নিয়ে যেতে হয় মূল পদ্মার চরে। কৃষকদের ব্যস্ততা দেখা যায় নতুন ফসল তোলাতে। চর জুড়ে দেখা মেলে ভুট্টা, বাদাম, তিলসহ ধানের চাষাবাদ। পাকা ফসল তুলতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কারণ এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করেছে একটি সাপ। চরাঞ্চলে সাপের আতঙ্কে জমির ফসল ও গবাদিপশুর খাবার ঘাস সংগ্রহ করতে পারছেন না কৃষকরা। পদ্মা নদীর তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বসবাস করা মানুষ রয়েছেন সাপ আতঙ্কে। ফলে থমকে গেছে তাদের জীবন যাত্রা। ইতিমধ্যে এই চরের অন্তত ছয়জন সাপের দংশনে মারা গেঝছন। কারণ এটা বিষধর সাপ । এই সাপের ইংরেজী নাম রাসেল ভাইপার। বাংলায় চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া।

এই সাপ আগেও আমাদের দেশে ছিল। কিন্তু এখন পরিবেশ প্রতিবেশ ব্যস্থায় ভারসাম্যহীনতার কারণে এর সংখ্যা বেড়েছে। সাপটি নিজের শরীরের ভেতর ডিম ফুটিয়ে একসাথে 40 থেকে 60টি পর্যন্ত বাচ্ছা প্রসব করতে পারে। বাচ্ছাগুলো সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। রাসেল ভাইপার দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নদীর স্রোতে ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই সাপ সাধারণত ঘাসবন, ঝোঁপজঙ্গল, উন্মুক্ত বন, এবং কৃষি জমিতে বাস করে। তবে মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। সাপটি মেটে রঙের হওয়ায় মাটির সাথে মিশে যেতে পারে। মানুষ খেয়াল না করে সাপের খুব কাছে গেলে সাপটি বিপদ দেখে ভয়ে আক্রমণ করে।

রাসেলস ভাইপার  একটি নিশাচর প্রাণী হিসাবে সক্রিয়। প্ররোচিত না হলে কাউকে আক্রমণ করে না। তারা বিদ্যুৎ গতিতে আঘাত করতে পারে। এক মিনিটের 16 সেকেন্ডের কম সময়ে আঘাত করতে পারে। অনেক সময় মানুষ টেরিই পায় সাপে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীতে প্রতিবছর সাপে কাটা মানুষের একটি অংশ এই চন্দ্রবোড়ার কামড়ে মারা যায়। তবে মানুষকে তেড়ে এসে কামড়ায় এটা ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে মাত্র।

পদ্মার চরের নতুন হাট, নটাখোলা, ভগবানেরচর, ফাকের হাট, পাটগ্রাম, হাতিঘাটা, গঙ্গাদধি এলাকায় ঘুরে এসব তথ্য মেলে। এই চরগুলো মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলার মধ্যে পড়েছে। এসব চরে কৃষকদের কাজ করতে ভয় লাগে। সবসময় নিচের দিকে তাকিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ না করলে ভাত জুটে না। অনেকের চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার। এখন সাপের ভয়ে কৃষকরা কাজ করে না। এক দিনে কৃষকের পারিশ্রমিক ৮০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে তাদের সংসার চলে।

চরের পাটগ্রাম এলাকায় ৪ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন কাইয়ুম ব্যাপারী। তিনি বলেন; ফসল তোলার সময় শ্রমিক পাচ্ছি না। কারণ সাপের ভয়ে কেউ কাজ করতে চায় না।জানা যায়, কেউ কেউ পাকা ধান কৃষি শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারেননি। সাপ যখন খুবই ছড়িয়ে পড়ে তখন শ্রমিকরা সাপ দেখে ফিরে আসে। এরপর আর কেউ যায় না। আমার প্রায় এক বিঘা জমির ধান শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারিনি। এরপর একদিন বাণ আসলো সব ধান নষ্ট হয়ে গেল।

মাঠে কাজ করার সময় সাপ দেখে দৌড়ে পালিয়েছিলেন ভগবানের চর এলাকার বাসিন্দা সবিরুল। আমি কাছে যেয়ে দেখি একটা সাপ ফোঁস ফোঁস করতেছে। পাশে দুটা বা তিনটা বাচ্চা ছিল। হাতের কাস্তে দিয়ে ভয় দেখিয়ে আমরা পালায় আসি। পরে কয়েকজন মিলে লাঠিসোটা নিয়ে সেখানে গেলে বড় সাপটা মারি। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে পাই নাই। অনেকেই বলতেছে এটা রাসেলস ভাইপার। এরপর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখি।

এই চরে নতুন পানির কারণে নিচু স্থানগুলোতে জমেছে অল্প পানি। ডোবাগুলো পানিতে ছুঁই ছুঁই। এলাকাবাসী জানান, এই সময়টায় প্রচুর মাছ ধরেন তারা। কিন্তু সাপের ভয়ে পানিতে নেমে মাছ ধরছেন না। কিন্তু এবার মাছ ধরছেন না অধিকাংশই। কচুরিপানার ভেতরে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় এসব মূলত হাত দিয়ে ধরা হয়। কিন্তু এখন হাত দিয়ে ধরা হয় না বললেই চলে। পদ্মার চরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস। এই এলাকায় সাপের দংশনে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মানুষ যেমন মরেছে সেইসঙ্গে প্রতিদিন মারা হচ্ছে সাপ। যাদের অধিকাংশই রাসেলস ভাইপার নয়। গত শুক্রবার রাতে নতুন হাট এলাকার আনিসুল ইসলামের বাড়িতে একটি সাপ মারা হয়েছে। এরপর দুইজনসহ সাপটা মারে। সাপ মেরে মাটিতে পুঁতে রাখেন তারা। তবে নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি সাপটি রাসেলস ভাইপার কিনা। এভাবে অন্য সাপ মারা পড়ছে।

এই চরেই গত ২১শে জুন সাপের দংশনে মারা যান হোসেন ব্যাপারী। তিনি ২০শে জুন মাঠে কাজ করছিলেন। গবাদি পশুর ঘাস কাটার সময় হঠাৎ পায়ে দংশন দেয় সাপ। প্রথমে তারা সাপের দংশনে কিনা বুঝতে পারেননি। এরপর তার ভাই সাপ পানিতে দেখে নিশ্চিত হন। এরপর একজন ওঝাকে ডেকে আনা হয়। তিনি আরও বলেন, ওঝা একটা গাছের শিকড় চাবাইতে বলেন আর মুখে ধরে রাখতে বলেন। চাবানোর পর দেখি ভাই কিছুটা আরাম পান। হঠাৎ তার গরম লাগা শুরু হয়। আমরা বাতাস করি। যেহেতু আরাম পাইলেন আমরা তখন ভয় পাই নাই আর। কিন্তু রাতে তিনি আবার অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি আরও বলেন, আমরা এক মৌলভি চাচারে ডাকি। চাচা আসার পর দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে বলেন, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাইতে। আমাদের হাসপাতালে যাইতে যাইতে আরও দুই ঘণ্টা লাগে। ভাই অস্থির হয়ে যায় প্রথমে এরপর নিস্তেজ হতে থাকে।

ফরিদপুর মেডিকেলে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসক জানিয়েছিলেন তার কিডনি ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর তিনি সেখানে মারা যান। ডাক্তার বলেন; এত প্রচারণার পরেও ওঝাদের কাছে যাচ্ছেন মানুষ। চরের এক এনজিওকর্মী শারমিন আক্তার বলেন, এলাকায় এখন সাপের আতঙ্ক বেশি। প্রতিদিনই শুনছি সাপ মারা হচ্ছে। আমার ধারণা সেগুলোর সব রাসেলস ভাইপার না। কিন্তু জীবন তো বাঁচাতে হবে তাই মারছে। এখন যত সাপ মারা হচ্ছে তা আগে মারা হতো না। আগে দেখতাম সাপ দেখলে তাড়িয়ে দেয়া হতো। এখন এগিয়ে গিয়ে মারা হচ্ছে। এতে প্রকৃতির একটা ক্ষতি হয়ত হচ্ছে। কিন্তু এই অসহায় মানুষগুলোর আসলে করার কিছু নাই।

সাপে কাটলে চরাঞ্চলের মানুষ সাধারণত যান ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে। এ ছাড়াও আসেন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হরিরামপুরে। হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায় চারপাশে নীরবতা। অল্প ক’জন রোগী সেখানে। মেডিকেল অফিসার ডা. রাশেদা নাজনীন বলেন, কয়েক সপ্তাহ হলো এন্টিভেনম আনা হয়েছে। এরমধ্যে গত বুধবার সাপের দংশনের একজন রোগী এসেছিলেন। তিনি চিকিৎসা নিয়ে সম্ভবত মানিকগঞ্জে গেছেন। তিনি আরও বলেন, এন্টিভেনম থাকলেও আমাদের হাসপাতালে সাপের দংশনে রোগীর সার্বিক উন্নত তত্ত্বাবধানের জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই।

এবিষয়ে হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেরুবা পান্না বলেন, রাসেলস ভাইপার সাপের উৎপাত বেড়েছে বলে শুনেছি। মাঝেমধ্যে আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সাপ দেখা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সাপে কাটা রোগীদের অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন সীমিত। তবে জেলা মিটিংয়ে চাহিদার কথা উপস্থাপন করা হয়েছে আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি আমাদের চাহিদা অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন পাব। তিনি আরও বলেন, যদি কাউকে সাপে কামড়ায় তাহলে দেরি না করে ১০০ মিনিটের মধ্যে সরাসরি হাসপাতালে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশনের কার্যকরী উপকার পাওয়া যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

পদ্মা চরের কৃষকের হাসি ম্লান হয়ে গেছে

আপডেট সময় ০২:২০:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই ২০২৪

মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর পদ্মার চরে বর্ষার নতুন পানি আসছে। চারদিকে ঢেউ খেলছে। আন্ধারমানিক এলাকায় গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। এটা যেন মিনি কক্সবাজার। চারিদিকে বিস্তৃত চর। নানান ফসলি জমি। নদীপথে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় নিয়ে যেতে হয় মূল পদ্মার চরে। কৃষকদের ব্যস্ততা দেখা যায় নতুন ফসল তোলাতে। চর জুড়ে দেখা মেলে ভুট্টা, বাদাম, তিলসহ ধানের চাষাবাদ। পাকা ফসল তুলতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কারণ এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করেছে একটি সাপ। চরাঞ্চলে সাপের আতঙ্কে জমির ফসল ও গবাদিপশুর খাবার ঘাস সংগ্রহ করতে পারছেন না কৃষকরা। পদ্মা নদীর তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বসবাস করা মানুষ রয়েছেন সাপ আতঙ্কে। ফলে থমকে গেছে তাদের জীবন যাত্রা। ইতিমধ্যে এই চরের অন্তত ছয়জন সাপের দংশনে মারা গেঝছন। কারণ এটা বিষধর সাপ । এই সাপের ইংরেজী নাম রাসেল ভাইপার। বাংলায় চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া।

এই সাপ আগেও আমাদের দেশে ছিল। কিন্তু এখন পরিবেশ প্রতিবেশ ব্যস্থায় ভারসাম্যহীনতার কারণে এর সংখ্যা বেড়েছে। সাপটি নিজের শরীরের ভেতর ডিম ফুটিয়ে একসাথে 40 থেকে 60টি পর্যন্ত বাচ্ছা প্রসব করতে পারে। বাচ্ছাগুলো সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। রাসেল ভাইপার দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নদীর স্রোতে ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই সাপ সাধারণত ঘাসবন, ঝোঁপজঙ্গল, উন্মুক্ত বন, এবং কৃষি জমিতে বাস করে। তবে মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। সাপটি মেটে রঙের হওয়ায় মাটির সাথে মিশে যেতে পারে। মানুষ খেয়াল না করে সাপের খুব কাছে গেলে সাপটি বিপদ দেখে ভয়ে আক্রমণ করে।

রাসেলস ভাইপার  একটি নিশাচর প্রাণী হিসাবে সক্রিয়। প্ররোচিত না হলে কাউকে আক্রমণ করে না। তারা বিদ্যুৎ গতিতে আঘাত করতে পারে। এক মিনিটের 16 সেকেন্ডের কম সময়ে আঘাত করতে পারে। অনেক সময় মানুষ টেরিই পায় সাপে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীতে প্রতিবছর সাপে কাটা মানুষের একটি অংশ এই চন্দ্রবোড়ার কামড়ে মারা যায়। তবে মানুষকে তেড়ে এসে কামড়ায় এটা ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে মাত্র।

পদ্মার চরের নতুন হাট, নটাখোলা, ভগবানেরচর, ফাকের হাট, পাটগ্রাম, হাতিঘাটা, গঙ্গাদধি এলাকায় ঘুরে এসব তথ্য মেলে। এই চরগুলো মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলার মধ্যে পড়েছে। এসব চরে কৃষকদের কাজ করতে ভয় লাগে। সবসময় নিচের দিকে তাকিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ না করলে ভাত জুটে না। অনেকের চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার। এখন সাপের ভয়ে কৃষকরা কাজ করে না। এক দিনে কৃষকের পারিশ্রমিক ৮০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে তাদের সংসার চলে।

চরের পাটগ্রাম এলাকায় ৪ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন কাইয়ুম ব্যাপারী। তিনি বলেন; ফসল তোলার সময় শ্রমিক পাচ্ছি না। কারণ সাপের ভয়ে কেউ কাজ করতে চায় না।জানা যায়, কেউ কেউ পাকা ধান কৃষি শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারেননি। সাপ যখন খুবই ছড়িয়ে পড়ে তখন শ্রমিকরা সাপ দেখে ফিরে আসে। এরপর আর কেউ যায় না। আমার প্রায় এক বিঘা জমির ধান শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারিনি। এরপর একদিন বাণ আসলো সব ধান নষ্ট হয়ে গেল।

মাঠে কাজ করার সময় সাপ দেখে দৌড়ে পালিয়েছিলেন ভগবানের চর এলাকার বাসিন্দা সবিরুল। আমি কাছে যেয়ে দেখি একটা সাপ ফোঁস ফোঁস করতেছে। পাশে দুটা বা তিনটা বাচ্চা ছিল। হাতের কাস্তে দিয়ে ভয় দেখিয়ে আমরা পালায় আসি। পরে কয়েকজন মিলে লাঠিসোটা নিয়ে সেখানে গেলে বড় সাপটা মারি। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে পাই নাই। অনেকেই বলতেছে এটা রাসেলস ভাইপার। এরপর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখি।

এই চরে নতুন পানির কারণে নিচু স্থানগুলোতে জমেছে অল্প পানি। ডোবাগুলো পানিতে ছুঁই ছুঁই। এলাকাবাসী জানান, এই সময়টায় প্রচুর মাছ ধরেন তারা। কিন্তু সাপের ভয়ে পানিতে নেমে মাছ ধরছেন না। কিন্তু এবার মাছ ধরছেন না অধিকাংশই। কচুরিপানার ভেতরে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় এসব মূলত হাত দিয়ে ধরা হয়। কিন্তু এখন হাত দিয়ে ধরা হয় না বললেই চলে। পদ্মার চরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস। এই এলাকায় সাপের দংশনে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মানুষ যেমন মরেছে সেইসঙ্গে প্রতিদিন মারা হচ্ছে সাপ। যাদের অধিকাংশই রাসেলস ভাইপার নয়। গত শুক্রবার রাতে নতুন হাট এলাকার আনিসুল ইসলামের বাড়িতে একটি সাপ মারা হয়েছে। এরপর দুইজনসহ সাপটা মারে। সাপ মেরে মাটিতে পুঁতে রাখেন তারা। তবে নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি সাপটি রাসেলস ভাইপার কিনা। এভাবে অন্য সাপ মারা পড়ছে।

এই চরেই গত ২১শে জুন সাপের দংশনে মারা যান হোসেন ব্যাপারী। তিনি ২০শে জুন মাঠে কাজ করছিলেন। গবাদি পশুর ঘাস কাটার সময় হঠাৎ পায়ে দংশন দেয় সাপ। প্রথমে তারা সাপের দংশনে কিনা বুঝতে পারেননি। এরপর তার ভাই সাপ পানিতে দেখে নিশ্চিত হন। এরপর একজন ওঝাকে ডেকে আনা হয়। তিনি আরও বলেন, ওঝা একটা গাছের শিকড় চাবাইতে বলেন আর মুখে ধরে রাখতে বলেন। চাবানোর পর দেখি ভাই কিছুটা আরাম পান। হঠাৎ তার গরম লাগা শুরু হয়। আমরা বাতাস করি। যেহেতু আরাম পাইলেন আমরা তখন ভয় পাই নাই আর। কিন্তু রাতে তিনি আবার অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি আরও বলেন, আমরা এক মৌলভি চাচারে ডাকি। চাচা আসার পর দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে বলেন, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাইতে। আমাদের হাসপাতালে যাইতে যাইতে আরও দুই ঘণ্টা লাগে। ভাই অস্থির হয়ে যায় প্রথমে এরপর নিস্তেজ হতে থাকে।

ফরিদপুর মেডিকেলে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসক জানিয়েছিলেন তার কিডনি ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর তিনি সেখানে মারা যান। ডাক্তার বলেন; এত প্রচারণার পরেও ওঝাদের কাছে যাচ্ছেন মানুষ। চরের এক এনজিওকর্মী শারমিন আক্তার বলেন, এলাকায় এখন সাপের আতঙ্ক বেশি। প্রতিদিনই শুনছি সাপ মারা হচ্ছে। আমার ধারণা সেগুলোর সব রাসেলস ভাইপার না। কিন্তু জীবন তো বাঁচাতে হবে তাই মারছে। এখন যত সাপ মারা হচ্ছে তা আগে মারা হতো না। আগে দেখতাম সাপ দেখলে তাড়িয়ে দেয়া হতো। এখন এগিয়ে গিয়ে মারা হচ্ছে। এতে প্রকৃতির একটা ক্ষতি হয়ত হচ্ছে। কিন্তু এই অসহায় মানুষগুলোর আসলে করার কিছু নাই।

সাপে কাটলে চরাঞ্চলের মানুষ সাধারণত যান ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে। এ ছাড়াও আসেন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হরিরামপুরে। হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায় চারপাশে নীরবতা। অল্প ক’জন রোগী সেখানে। মেডিকেল অফিসার ডা. রাশেদা নাজনীন বলেন, কয়েক সপ্তাহ হলো এন্টিভেনম আনা হয়েছে। এরমধ্যে গত বুধবার সাপের দংশনের একজন রোগী এসেছিলেন। তিনি চিকিৎসা নিয়ে সম্ভবত মানিকগঞ্জে গেছেন। তিনি আরও বলেন, এন্টিভেনম থাকলেও আমাদের হাসপাতালে সাপের দংশনে রোগীর সার্বিক উন্নত তত্ত্বাবধানের জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই।

এবিষয়ে হরিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেহেরুবা পান্না বলেন, রাসেলস ভাইপার সাপের উৎপাত বেড়েছে বলে শুনেছি। মাঝেমধ্যে আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সাপ দেখা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সাপে কাটা রোগীদের অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন সীমিত। তবে জেলা মিটিংয়ে চাহিদার কথা উপস্থাপন করা হয়েছে আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি আমাদের চাহিদা অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন পাব। তিনি আরও বলেন, যদি কাউকে সাপে কামড়ায় তাহলে দেরি না করে ১০০ মিনিটের মধ্যে সরাসরি হাসপাতালে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশনের কার্যকরী উপকার পাওয়া যাবে।