জাপানের ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানার ছোট্ট বানর পাঞ্চ। এখন ইন্টারনেটে ভাইরাল এই বানর। আছে লাখ লাখ ভক্ত। বিশ্বজুড়ে যার তুমুল জনপ্রিয়তা। তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনের গল্পটি মোটেও আনন্দের নয়; বরং খানিকটা আবেগের।
জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির বানর ‘পাঞ্চ’। জন্মের পরই মা তাকে ফেলে চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে চিড়িয়াখানার কর্মীরা তাকে ওরাংওটাংয়ের একটি পুতুল খেলতে দেন। মায়ের আদর না পাওয়া পাঞ্চের সেই পুতুল আঁকড়ে ধরে থাকার দৃশ্য এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।

মায়ের ভালোবাসা পায়নি সে। উল্টো জুটেছে অন্য বানরদের অবহেলা আর মারধর। এই নিঃসঙ্গ অবস্থায় একটি খেলনা পুতুলই তার একমাত্র ভরসা। ছড়িয়ে পড়া শুরুর দিকের ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, অন্য বানরেরা তাড়িয়ে দেওয়ার পর পুতুলটি নিয়ে একা একা ঘুরছে পাঞ্চ। আর যখনই কেউ তাকে জ্বালাতন করছে, ভয়ে সে পুতুলটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরছে।
পাঞ্চকে কেন ছেড়ে গেল ওর মা? কেন প্রাণীরা এমন করে?
এ নিয়ে কথা বলেছেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাইমেট (বানর ও বনমানুষ জাতীয় প্রাণী) বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহি। তিনি জানান, বানরের এমন আচরণ সাধারণত দেখা যায় না। তবে বয়স, স্বাস্থ্য ও অনভিজ্ঞতার কারণে কখনো কখনো এমনটা ঘটতে পারে।
পাঞ্চের প্রসঙ্গ টেনে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, পাঞ্চের মা এবারই প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছে। ফলে তার মধ্যে মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাঞ্চের জন্ম হয়েছিল তীব্র দাবদাহের মধ্যে। চারপাশের এমন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইয়ে মায়েরা অনেক সময় নিজের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতে আবার মা হওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ কারণে পরিবেশের বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিতে পড়া ছানাকে তারা অবলীলায় ফেলে যেতে পারে।
মা ফেলে যাওয়ার পর পাঞ্চের বুকে আঁকড়ে ধরার জন্য প্রথমে বিভিন্ন আকারের তোয়ালে পেঁচিয়ে দিয়েছিলেন চিড়িয়াখানার কর্মীরা। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। এরপরই বিকল্প হিসেবে ওই ওরাংওটাং পুতুলটি দেওয়া হয়।

চিড়িয়াখানার রক্ষক কোসুকে শিকানো বলেন, ‘জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির ছানারা পেশিশক্তি বাড়াতে জন্মের পরপরই মায়ের শরীর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কোনো কিছু ধরে রাখার মাধ্যমে তারা একধরনের নিরাপত্তাবোধও করে। কিন্তু মায়ের আদর না পাওয়ায় পাঞ্চের আসলে আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই ছিল না।’
পুতুল দেওয়ার কারণ হিসেবে এই কর্মী আরও বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, দেখতে বানরের মতো হওয়ায় এই পুতুলটি হয়তো পাঞ্চকে ভবিষ্যতে দলের অন্য বানরদের সঙ্গে সহজে মিশতে সাহায্য করবে।’
ওরাংওটাংয়ের পুতুলটি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহি বলেন, ‘পাঞ্চের বয়স এখন মাত্র ছয় মাস। এ বয়সে তার মাতৃস্নেহ খুব দরকার। পুতুলটি তার কাছে মায়ের শূন্যস্থান পূরণের কাজ করছে বলে মনে হয়।’

অ্যালিসন বেহি আরও বলেন, পাঞ্চের প্রতি অন্য বানরদের এই আচরণ আসলে ‘উত্ত্যক্ত’ করা বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটি তাদের স্বাভাবিক সামাজিক আচরণেরই অংশ।
ম্যাকাক প্রজাতি
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির সংরক্ষণ মনোবিজ্ঞানী কার্লা লিচফিল্ড জানান, জাপানি ম্যাকাক বেশ বুদ্ধিমান প্রাণী। এ কারণে জাপানে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় এই বানরগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চার বছরের মধ্যেই পাঞ্চ পূর্ণবয়স্ক হয়ে যাবে। তখন কিন্তু তাদের আর আদুরে মনে হবে না, সামলানোও কঠিন হয়ে পড়বে। বানরদের জায়গা অন্য বানরদের সঙ্গেই। এরা সামাজিক প্রাণী। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য এদের নিজেদের প্রজাতির সঙ্গেই থাকা প্রয়োজন।’

লিচফিল্ড বলেন, ‘পাঞ্চের এই ঘটনাটি আমাদের আবাসস্থল ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চিড়িয়াখানার প্রাণীদের কল্যাণের মতো বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একই সঙ্গে প্রাণীজগৎ ও মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরে।’
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















