প্রাণবৈচিত্র্য

বনরুই সংরক্ষণ সময়ের দাবি

বনরুই সংরক্ষণ সময়ের দাবি

আমরা জানি প্রকৃতির সুস্থতা ছাড়া আমাদের শারিরীক, মানসিক, অর্থনৈতিক সুস্থতা সম্ভব নয়। কেননা মনুষ্য জাতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকৃতির ওপরেই নির্ভরশীল এবং এ নির্ভরতা শতভাগে শতভাগ। কিছু দিন আগে পর পর তিনটি বনরুই ধরা পড়ল পাচারকারীদের পাচার করার সময়। পাচারকারীরা এসব প্রাণী পাচারের জন্য এখন উত্তরবঙ্গের বুড়িমারী, বাংলাবান্দা, হিলি এসব স্থান বেছে নিয়েছে। তিনটি বনরুই এসব চোরাপথে বের হয়ে যাচ্ছিল। এগুলো জব্দ করে লাউয়াছড়া বনে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাচারকারীদের কি শাস্তি দেয়া হলো তা জানা যায়নি। এসব পাচারকৃত প্রাণীগুলো সাধারণত চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশে পাচার হয়ে থাকে। জানা যায়, এদের মাংস ওইসব এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে সুস্বাদু মাংস হিসেবে খাওয়া হয়। এছাড়া এদের গায়ে শতশত আইশ থাকে যা দিয়ে চাইনিজ মেডিসিন তৈরি করা হয়, সুস্বাদু স্যুপ তৈরি করা হয়। কথিত আছে, এসব ওষুধে নাকি মায়ের দুধের পরিমাণ বাড়ে, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব ও শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি রোগ আরোগ্য হয়। শুধু মাংস এবং আইশই নয়, এদের শক্তিশালী নখ ও হাড় নানাপ্রকার ওষুধ  তৈরিতে কাজে লাগে। তবে এসবই ভুল ধারণা। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ বনরুই পাচারের রেকর্ড আছে বিশ্বে। আমরা এও জানি, যা দৃশ্যমান তার বহুগুণ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এটা হলো আইসবার্গের মতো, ডুবে থাকা অংশ দৃশ্যমান অংশের বহু বহুগুণ বেশি। ২০১৫ সালে প্রায় চার হাজার টন মাংস ফ্রোজেন অবস্থায় ধরা পড়েছে। তারও আগে ২০১৩ সালে ৫৩ টন ধরা পড়েছে। এ প্রেক্ষিতে ধরে নেয়া হয়েছে, বছরে প্রায় চার লাখ বনরুইয়ের চোরাকারবারী চলছে। বনরুইয়ের প্রতি কেজি মাংস ৬০০ ডলার। আরো জানা যায়, স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর ওপরে চোরাকারবারের শীর্ষে রয়েছে বনরুই। আট টন বনরুই নাইজেরিয়া থেকে হংকংয়ে চোরাকারবারে চালান হয়েছে। বিগত পাঁচ দশক ধরে এ ব্যবসা অবিরাম চলছে। চোরাকারবার বা পাচার ছাড়া এদের অস্তিত্ব বিলীনের আরো যেসব কারণ তা হলো স্থানীয় পাহাড়ি লোকজন এদের মেরে খাচ্ছে। বন ধ্বংসকরণও এদের বিলীন হওয়ার একটি বড় কারণ।

আফ্রিকা ও এশিয়াতে ৭ থেকে ৮ প্রজাতির বনরুই থাকলেও সব কটাই মহাবিপন্ন এবং CITES (Convention of International Trade of Endangered species) তালিকায় Appendix-1  এ রয়েছে। অর্থাৎ এদের ধরা, মারা, ব্যবসা, ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কে শোনে কার কথা! মানুষ নামের প্রাণীটি প্রকৃতির প্রতি, প্রাণিকুলের প্রতি মমতা হারিয়ে ফেলেছে। আর আমাদের দেশের প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অবৈধ ব্যবসা চলছে তো চলছেই। এ প্রাণীগুলো প্রকৃতির জন্য মহাআর্শীবাদ। কেননা প্রতিনিয়ত এরা পিঁপড়া ও উইপোকা খেয়ে প্রকৃতির সুস্থতা রক্ষা করছে, অর্থের সাশ্রয় করছে। এদের লম্বা জিহ্বা গর্তে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে বের করে উইপোকা খেয়ে প্রকৃতিকে উইপোকা মুক্ত রাখছে। লক্ষ কোটি টাকার আসবাব, বইখাতা, কাগজপত্র, কাপড় প্রভৃতি রক্ষা করছে।

বনরুই নিশ্চিহ্ন করার প্রবনতার কারণেই উইপোকার বিস্তার ও আক্রমণ বেড়ে গেছে। বাড়িঘরে চৌদ্দ-পনেরো তলায়ও উইপোকার আগ্রাসন। উইয়ের বিস্তৃতি দ্রুত ঘটে। বনরুই একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কেননা প্রকৃতিতে Reinfroduction -এর জন্য যে সব পদক্ষেপ নেয়া হয় তার কোনোটাই এদের জন্য সম্ভব নয়। যেমন – আবদ্ধ অবস্থায় এরা প্রজনন করে না। কেননা, এদের প্রাকৃতিক Homerange বৃহৎ এলাকাজুড়ে। এরা পিঁপড়া ও উইপোকার নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল, অন্য কিছুর ওপর কখনোই আকৃষ্ট নয়। একটি বনরুই প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ গ্রাম নির্দিষ্ট প্রজাতির পিঁপড়া ও উইপোকা খেয়ে থাকে। এছাড়া আমরা এটাও জানি পতঙ্গভুক প্রাণীর Captive breeding প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে বনরুইতো খাদ্যাভাসের দিক থেকে একেবারে স্বতন্ত্র।

বাংলাদেশের রেকর্ডে দুপ্রজাতির বনরুইয়ের উল্লেখ থাকলেও একটিই (M. crassicaudata) দেখা যায় শুধু সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়। তবে ইদানীং এদের অস্তিত্বের হদিস প্রায় নেই বললেই চলে। পূর্বেও এদের নামমাত্র সংখ্যা ছিল। আফ্রিকা ও এশিয়ায় সব প্রজাতির প্রায় একই অবস্থা। এরা Critically Endangered, বিলুপ্তপ্রায় IUCN মতে।

বনরুইয়ের কতগুলো প্রজাতি আছে গেছো, কতগুলো আবার গর্তে বাস করে। এদের ওজন প্রায় ৩৩ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।  আমাদের দেশের বনরুই (M. crassicaudata) লম্বায় ৮৪ থেকে ১২২ সেন্টিমিটার এবং ১০ থেকে ১৬ কেজি হয়ে থাকে। এদের বিস্তৃতি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকা।

বনরুই বছরের গ্রীষ্মকালীন সময় জোড়া বাঁধে। ৭০ থেকে ১৪০ দিনে বাচ্চা প্রসব করে। প্রজাতিতে পার্থক্য রয়েছে। এরা ১ থেকে ৩টি বাচ্চা প্রসব করে এবং প্রায় দুবছর পর্যন্ত মায়ের তত্ত¡াবধানে চলাফেরা করে। প্রথম ২ থেকে ৪ সপ্তাহ গর্তেই অবস্থান করে। এরপর মায়ের পিঠে চড়ে ঘুড়ে বেড়ায়। প্রায় তিন মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ খায় এবং তারপর দুধ, পিঁপড়া ও উইপোকা খাওয়া শুরু করে। জন্মের সময় থেকে ৩-৪ মাস বাচ্চার আইশগুলো নরম থাকলেও ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। বনরুইয়ের নখর অত্যন্ত শক্তিশালী যা দিয়ে এরা গাছের বাকল বা উইয়ের ঢিবিতে আচর কাটে আর সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পিঁপড়া ও উইপোকা বেড়িয়ে আসে। তখন বাচ্চা নিয়ে এরা ভূড়িভোজ করে। নিশাচর এ প্রাণীর ঘ্রাণ শক্তি প্রখর, দৃষ্টিশক্তি যদিও তুলনামূলক কম। উইপোকা নিধনে এদের জুড়ি নেই।

সাধারণত প্রাণিকুলে পুরুষ প্রজননকালে স্ত্রীর খোঁজে বের হয়, এদের বেলায় তা নয়। পুরুষ নিজের এলাকায় নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে প্রস্রাব ও মল দিয়ে চিহ্নিত করে এবং স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করে। স্ত্রী বনরুই গন্ধ শুকে শুকে ওই এলাকা অর্থাৎ GwUI breeding territory  তে পৌঁছায়। ওই এলাকাটি তুলনামূলক অনেক বড় থাকে। এটিও captive breeding  সম্ভব না হওয়ার জন্য একটি কারণ।

বনরুই একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে হাজার চেষ্টা করেও এদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে যে সব দেশে এরা রয়েছে সে সব দেশের সতর্ক হয়ে যেতে হবে, সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে, বন্ধ করতে হবে চোরাচালান। মানুষই এদের একমাত্র শত্রæ। প্রকৃতিতে এদের জীবন সংহার করে এমন প্রাণী নেই বললেই চলে। কেননা শত্রæর অবস্থান টের পেলে এরা নিজেকে গুটিয়ে বলের আকার বানিয়ে ফেলে। শত্রু শক্ত আইশে আবৃত বনরুইয়ের গায়ে দাঁত বসাতে পারে না। উল্লেখ্য, বনরুইকে বাংলায় বনরুই বলা হয় এ জন্য যে এদের আইশ দৃশ্যত রুই মাছের মতো। বনরুই ছাড়া অন্য কোনো স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর শরীর শক্ত আইশে আবৃত নেই। বনরুইকে ইংরেজিতে Pangolin বলা হয় এজন্য যে, মালয় ভাষায় Pengguling অর্থ গোলাকার আকার ধারণ করা। ইংরেজিতে আর একটি নাম Scaly Anteater. কেননা এরা পিঁপড়া খায় এবং গায়ে আইশ রয়েছে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কঠিন আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এ সব প্রাণী পাচারের সাথে সব সময়ই থাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালীরা। এখন সময় এসেছে জনগণের শক্ত পদক্ষেপের, এ সব পাচারকারীদের সম্মুখে নিয়ে আসার। সবার সজাগ দৃষ্টিই পারে বনরুইয়ের মতো প্রাণিকুলকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় শনিবার World Pangolin Day বা বিশ্ব বনরুই দিবস পালিত হয়। এ সব দিবস পালনের উদ্দেশ্য একটাই, বিষয়টির প্রতি যথাযথ নজর দেয়া ও উপলদ্ধি সৃষ্টি করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

 

লেখক: বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিশেষজ্ঞ, প্রফেসর: প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

প্রাণবৈচিত্র্য

বনরুই সংরক্ষণ সময়ের দাবি

আপডেট সময় ০৩:০১:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪

আমরা জানি প্রকৃতির সুস্থতা ছাড়া আমাদের শারিরীক, মানসিক, অর্থনৈতিক সুস্থতা সম্ভব নয়। কেননা মনুষ্য জাতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকৃতির ওপরেই নির্ভরশীল এবং এ নির্ভরতা শতভাগে শতভাগ। কিছু দিন আগে পর পর তিনটি বনরুই ধরা পড়ল পাচারকারীদের পাচার করার সময়। পাচারকারীরা এসব প্রাণী পাচারের জন্য এখন উত্তরবঙ্গের বুড়িমারী, বাংলাবান্দা, হিলি এসব স্থান বেছে নিয়েছে। তিনটি বনরুই এসব চোরাপথে বের হয়ে যাচ্ছিল। এগুলো জব্দ করে লাউয়াছড়া বনে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাচারকারীদের কি শাস্তি দেয়া হলো তা জানা যায়নি। এসব পাচারকৃত প্রাণীগুলো সাধারণত চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশে পাচার হয়ে থাকে। জানা যায়, এদের মাংস ওইসব এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে সুস্বাদু মাংস হিসেবে খাওয়া হয়। এছাড়া এদের গায়ে শতশত আইশ থাকে যা দিয়ে চাইনিজ মেডিসিন তৈরি করা হয়, সুস্বাদু স্যুপ তৈরি করা হয়। কথিত আছে, এসব ওষুধে নাকি মায়ের দুধের পরিমাণ বাড়ে, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব ও শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি রোগ আরোগ্য হয়। শুধু মাংস এবং আইশই নয়, এদের শক্তিশালী নখ ও হাড় নানাপ্রকার ওষুধ  তৈরিতে কাজে লাগে। তবে এসবই ভুল ধারণা। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ বনরুই পাচারের রেকর্ড আছে বিশ্বে। আমরা এও জানি, যা দৃশ্যমান তার বহুগুণ অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এটা হলো আইসবার্গের মতো, ডুবে থাকা অংশ দৃশ্যমান অংশের বহু বহুগুণ বেশি। ২০১৫ সালে প্রায় চার হাজার টন মাংস ফ্রোজেন অবস্থায় ধরা পড়েছে। তারও আগে ২০১৩ সালে ৫৩ টন ধরা পড়েছে। এ প্রেক্ষিতে ধরে নেয়া হয়েছে, বছরে প্রায় চার লাখ বনরুইয়ের চোরাকারবারী চলছে। বনরুইয়ের প্রতি কেজি মাংস ৬০০ ডলার। আরো জানা যায়, স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর ওপরে চোরাকারবারের শীর্ষে রয়েছে বনরুই। আট টন বনরুই নাইজেরিয়া থেকে হংকংয়ে চোরাকারবারে চালান হয়েছে। বিগত পাঁচ দশক ধরে এ ব্যবসা অবিরাম চলছে। চোরাকারবার বা পাচার ছাড়া এদের অস্তিত্ব বিলীনের আরো যেসব কারণ তা হলো স্থানীয় পাহাড়ি লোকজন এদের মেরে খাচ্ছে। বন ধ্বংসকরণও এদের বিলীন হওয়ার একটি বড় কারণ।

আফ্রিকা ও এশিয়াতে ৭ থেকে ৮ প্রজাতির বনরুই থাকলেও সব কটাই মহাবিপন্ন এবং CITES (Convention of International Trade of Endangered species) তালিকায় Appendix-1  এ রয়েছে। অর্থাৎ এদের ধরা, মারা, ব্যবসা, ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কে শোনে কার কথা! মানুষ নামের প্রাণীটি প্রকৃতির প্রতি, প্রাণিকুলের প্রতি মমতা হারিয়ে ফেলেছে। আর আমাদের দেশের প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অবৈধ ব্যবসা চলছে তো চলছেই। এ প্রাণীগুলো প্রকৃতির জন্য মহাআর্শীবাদ। কেননা প্রতিনিয়ত এরা পিঁপড়া ও উইপোকা খেয়ে প্রকৃতির সুস্থতা রক্ষা করছে, অর্থের সাশ্রয় করছে। এদের লম্বা জিহ্বা গর্তে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে বের করে উইপোকা খেয়ে প্রকৃতিকে উইপোকা মুক্ত রাখছে। লক্ষ কোটি টাকার আসবাব, বইখাতা, কাগজপত্র, কাপড় প্রভৃতি রক্ষা করছে।

বনরুই নিশ্চিহ্ন করার প্রবনতার কারণেই উইপোকার বিস্তার ও আক্রমণ বেড়ে গেছে। বাড়িঘরে চৌদ্দ-পনেরো তলায়ও উইপোকার আগ্রাসন। উইয়ের বিস্তৃতি দ্রুত ঘটে। বনরুই একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কেননা প্রকৃতিতে Reinfroduction -এর জন্য যে সব পদক্ষেপ নেয়া হয় তার কোনোটাই এদের জন্য সম্ভব নয়। যেমন – আবদ্ধ অবস্থায় এরা প্রজনন করে না। কেননা, এদের প্রাকৃতিক Homerange বৃহৎ এলাকাজুড়ে। এরা পিঁপড়া ও উইপোকার নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল, অন্য কিছুর ওপর কখনোই আকৃষ্ট নয়। একটি বনরুই প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২০০ গ্রাম নির্দিষ্ট প্রজাতির পিঁপড়া ও উইপোকা খেয়ে থাকে। এছাড়া আমরা এটাও জানি পতঙ্গভুক প্রাণীর Captive breeding প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে বনরুইতো খাদ্যাভাসের দিক থেকে একেবারে স্বতন্ত্র।

বাংলাদেশের রেকর্ডে দুপ্রজাতির বনরুইয়ের উল্লেখ থাকলেও একটিই (M. crassicaudata) দেখা যায় শুধু সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়। তবে ইদানীং এদের অস্তিত্বের হদিস প্রায় নেই বললেই চলে। পূর্বেও এদের নামমাত্র সংখ্যা ছিল। আফ্রিকা ও এশিয়ায় সব প্রজাতির প্রায় একই অবস্থা। এরা Critically Endangered, বিলুপ্তপ্রায় IUCN মতে।

বনরুইয়ের কতগুলো প্রজাতি আছে গেছো, কতগুলো আবার গর্তে বাস করে। এদের ওজন প্রায় ৩৩ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।  আমাদের দেশের বনরুই (M. crassicaudata) লম্বায় ৮৪ থেকে ১২২ সেন্টিমিটার এবং ১০ থেকে ১৬ কেজি হয়ে থাকে। এদের বিস্তৃতি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকা।

বনরুই বছরের গ্রীষ্মকালীন সময় জোড়া বাঁধে। ৭০ থেকে ১৪০ দিনে বাচ্চা প্রসব করে। প্রজাতিতে পার্থক্য রয়েছে। এরা ১ থেকে ৩টি বাচ্চা প্রসব করে এবং প্রায় দুবছর পর্যন্ত মায়ের তত্ত¡াবধানে চলাফেরা করে। প্রথম ২ থেকে ৪ সপ্তাহ গর্তেই অবস্থান করে। এরপর মায়ের পিঠে চড়ে ঘুড়ে বেড়ায়। প্রায় তিন মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ খায় এবং তারপর দুধ, পিঁপড়া ও উইপোকা খাওয়া শুরু করে। জন্মের সময় থেকে ৩-৪ মাস বাচ্চার আইশগুলো নরম থাকলেও ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। বনরুইয়ের নখর অত্যন্ত শক্তিশালী যা দিয়ে এরা গাছের বাকল বা উইয়ের ঢিবিতে আচর কাটে আর সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পিঁপড়া ও উইপোকা বেড়িয়ে আসে। তখন বাচ্চা নিয়ে এরা ভূড়িভোজ করে। নিশাচর এ প্রাণীর ঘ্রাণ শক্তি প্রখর, দৃষ্টিশক্তি যদিও তুলনামূলক কম। উইপোকা নিধনে এদের জুড়ি নেই।

সাধারণত প্রাণিকুলে পুরুষ প্রজননকালে স্ত্রীর খোঁজে বের হয়, এদের বেলায় তা নয়। পুরুষ নিজের এলাকায় নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে প্রস্রাব ও মল দিয়ে চিহ্নিত করে এবং স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করে। স্ত্রী বনরুই গন্ধ শুকে শুকে ওই এলাকা অর্থাৎ GwUI breeding territory  তে পৌঁছায়। ওই এলাকাটি তুলনামূলক অনেক বড় থাকে। এটিও captive breeding  সম্ভব না হওয়ার জন্য একটি কারণ।

বনরুই একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে হাজার চেষ্টা করেও এদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে যে সব দেশে এরা রয়েছে সে সব দেশের সতর্ক হয়ে যেতে হবে, সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে, বন্ধ করতে হবে চোরাচালান। মানুষই এদের একমাত্র শত্রæ। প্রকৃতিতে এদের জীবন সংহার করে এমন প্রাণী নেই বললেই চলে। কেননা শত্রæর অবস্থান টের পেলে এরা নিজেকে গুটিয়ে বলের আকার বানিয়ে ফেলে। শত্রু শক্ত আইশে আবৃত বনরুইয়ের গায়ে দাঁত বসাতে পারে না। উল্লেখ্য, বনরুইকে বাংলায় বনরুই বলা হয় এ জন্য যে এদের আইশ দৃশ্যত রুই মাছের মতো। বনরুই ছাড়া অন্য কোনো স্তন্যপ্রায়ী প্রাণীর শরীর শক্ত আইশে আবৃত নেই। বনরুইকে ইংরেজিতে Pangolin বলা হয় এজন্য যে, মালয় ভাষায় Pengguling অর্থ গোলাকার আকার ধারণ করা। ইংরেজিতে আর একটি নাম Scaly Anteater. কেননা এরা পিঁপড়া খায় এবং গায়ে আইশ রয়েছে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কঠিন আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এ সব প্রাণী পাচারের সাথে সব সময়ই থাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালীরা। এখন সময় এসেছে জনগণের শক্ত পদক্ষেপের, এ সব পাচারকারীদের সম্মুখে নিয়ে আসার। সবার সজাগ দৃষ্টিই পারে বনরুইয়ের মতো প্রাণিকুলকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় শনিবার World Pangolin Day বা বিশ্ব বনরুই দিবস পালিত হয়। এ সব দিবস পালনের উদ্দেশ্য একটাই, বিষয়টির প্রতি যথাযথ নজর দেয়া ও উপলদ্ধি সৃষ্টি করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

 

লেখক: বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিশেষজ্ঞ, প্রফেসর: প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়