সূর্য উঠার আগেই তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলোর পাশে বসে আট হাজার ৫৮৬ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্গার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় শীত শীত ভোরেও চমৎকার ভিউ পাচ্ছি। ঠিক ছয়টা বাজতেই সূর্যি মামা উঁকি দিল ও তার লাল আভায় কাঞ্চনজঙ্গাকে রাঙাতে লাগল। এভাবে মিনিট বিশেক কাঞ্চনজঙ্ঘাকে রাঙিয়ে ধীরে ধীরে সূর্যি মামা উপরে উঠে গেল। আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোরম সৌন্দর্য উপভোগশেষে আমরাও ইঞ্চিনচালিত ভ্যানে ছুটলাম তেঁতুলিয়া থেকে দশ কিলোমিটার দূরের শালবাহান ইউনিয়নের তুলসিয়া বিলের দিকে। শীতে বিলটি নানা প্রজাতির জলজ পাখিতে ভরপুর থাকে। আর বিলের পেছনে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তাইতো ওর বুকে উড়ন্ত পাখির ছবি তুলতে যাচ্ছি ওখানে। সঙ্গী হিসেবে আছেন বড় ভাই মোঃ মিজানুর রহমান।
মহানন্দার পাড়ের ডাকবাংলো থেকে বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে খালের মতো সরু গোবরা নদীর পাড়ঘেঁষে চলতে লাগলাম। সুনসান পরিবেশ ও চমৎকার আবহাওয়া। কিন্তু রোদের তেজটা একটু বেশি। শালবাহান যাওয়ার তাড়া থাকলেও চমৎকার পরিবেশ দেখে ভ্যান থেকে না নেমে পারলাম না। নদী ও আশপাশটা ঘুরে কিছু ছবি তুললাম। এমন সময় নদীর উল্টোদিকে আখ ক্ষেতের দিকে নজর গেল। চড়ুই পাখির (House Sparrow) মতো দেখতে ২৫ থেকে ৩০টি পাখির একটি ঝাঁক এসে আখ ফুলের ওপর নামল। বেশিরভাগ পাখিই ফুলের বীচি খেতে শুরু করল। কয়েকটি পাখি পাশের মরা গাছের শুকনো ডালে বসল। দ্রুত পাখিগুলোর ছবি তুললাম। আখের বীচি খাওয়ারত পাখিগুলোকে সাধারণ চড়ুইয়ের মতোই মনে হলো। আসলে তীর্যকভাবে রোদ পড়ায় পাখিগুলো সূর্যের দিকে বসে থাকায় বেশিরভাগ ছবিই কালচে হয়ে গেল। ছবি তুলতে তুলতে আখ ক্ষেতের কাছে চলে আসা পাখিগুলো ক্ষেতের ভিতর ঢুকে গেল। কাজেই ওদের ছবি তোলা আর সম্ভব হলো না। শালবাহান যাওয়ার তাড়া থাকায় নতুন কোনো প্রজাতির চড়–ইয়ের কথা মাথায় না আসায় ওদের নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামালাম না। ফলে পাখিগুলোকে শনাক্তও করা হলো না। এগারো নভেম্বর ২০১৭-এর ঘটনা এটি।

পরের বছর অক্টোবরে পারিবারিক ভ্রমণে ভুটান গিয়ে ১৬ ও ১৮ অক্টোবর যথাক্রমে রাজধানী থিম্ফুর ওয়াংচু নদী পাড় ও পারো সিটির একটি ঝোপ থেকে একই প্রজাতির চড়–ইয়ের চমৎকার সব ছবি তুললাম। কিন্তু, তেঁতুলিয়ায় তোলা চড়–ইগুলোর কথা মনেই এল না, কারণ ওগুলো পূর্ণবয়স্ক ছিল না। তাই দেখতে কিছুটা ভিন্ন রকম লাগছিল। দীর্ঘ চার বছর পর ২৮ নভেম্বর রাতে খোকন থৌনাজাম নামে শ্রীমঙ্গলের এক পক্ষী আলোকচিত্রীর পাঠানো কয়েকটি বঘেরি পাখির (Bunting – চড়ুই পাখির সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে ওদের) ছবি শনাক্ত করতে গিয়ে প্রায় কাছাকাছি রঙের একটি পাখির ছবি দেখে তেঁতুলিয়ায় তোলা চড়–ইগুলোর কথা মনে পড়ল। আর তখনই তেঁতুলিয়ায় তোলা চড়ুইয়ের কালচে ছবিগুলোতে কিছুটা আলো বাড়িয়ে লক্ষ্য করলাম ওদের মাথার রঙ সাধারণ চড়–ইয়ের মতো ধূসর নয় বরং লালচে। তাছাড়া বুকে কিছুটা হলদের ছোঁয়াও রয়েছে। খোকনের পাঠানো বঘেরি পাখির অন্তত একটির সঙ্গে তেঁতুলিয়ার পাখিটির পালকের রঙের কিছুটা মিল পাওয়া গেলেও ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখলাম তেঁতুলিয়ার পাখিগুলো মোটেও বঘেরি নয় বরং এক প্রজাতির চড়–ই। আসলে বঘেরি ও চড়–ইরা কাছাকাছি গোত্রের পাখি। ওদের চঞ্চু ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে। কাজেই পাখিটির পরিচয় নিশ্চিত হতে বিশিষ্ট পাখি বিশেষজ্ঞ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোঃ মনিরুল হাসান খানের কাছে পাঠালাম। পাশাপাশি বিভিন্ন ফিল্ডগাইডের বান্টিং ও চড়–ইয়ের ছবি এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে ভুটানে তোলা চড়–ইয়ের সঙ্গে বেশ মিল খুঁজে পেলাম। ঠিক তখনি ড. মনিরুলের মেসেজ এল। তার মেসেজ অনুয়ায়ী দেশের পক্ষীতালিকায় ৭১৮ নম্বর পাখিটি সংযোজন করতে পেরে মনটা আনন্দে ভরে উঠল।
তেঁতুলিয়ার আখ ক্ষেতে দেখা চড়–ইগুলো এদেশের নতুন পাখি Russet Sparrow, Cinnamon Sparrow ev Cinnamon Tree Sparrow। তবে নতুন হওয়ায় ওর কোনো বাংলা নাম নেই। কিন্তু পালকের রঙ, ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বিবেচনায় দারুচিনি চড়–ই, মরচে রঙা চড়–ই বা গেছো চড়–ই বলা যায় সহজেই। Passeriformes eM© I Passeridae গোত্রের চড়–ই পাখিটিকে হিন্দিতে বলে লাল গৌরিয়া। আর সম্ভবত এই লাল গৌরিয়ার অনুবাদে পশ্চিমবঙ্গে লালচে চড়–ই। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম চধংংবৎ Passer cinnamomeus.. আফগানিস্তানের নুরিস্থান হয়ে কাশ্মির, ভারতের অন্যান্য পার্বত্য রাজ্য, নেপাল ও ভুটানের পার্বত্য এলাকা হয়ে চীনের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ওরা বিস্তৃত। এছাড়াও ভারতের মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও মিজোরাম হয়ে মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত ওদের আরেকটি উপ-প্রজাতির বিস্তৃতির রয়েছে। শীতে থাইল্যান্ড, উত্তর কোরিয়া ও জাপানেও দেখা মেলে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে কম দূরত্বে ওরা ভারতের মেঘালয়ে বাস করে; এরপর পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও সিকিম। কিন্তু মেঘালয়ের পাশে সিলেটে দেখা না গিয়ে দার্জিলিং, সিকিম ও ভুটানের বেশ খানিকটা দূরে তেঁতুলিয়ায় দেখা গেল পাখিটিকে। ২০১৭ সালে প্রথমবার দেখা যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত দেশের কোথাও অতি বিরল পাখিটিকে দেখা যাওয়ার রেকর্ড নেই। বর্তমানে বিশ্বে পাখিটি স্বল্পঝুঁকিসম্পন্ন (Least Concern) বলে বিবেচিত।

দারুচিনি চড়–ই মোটা চঞ্চুযুক্ত পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ১৪ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার। ওজন ১৭.০ থেকে ২২.৫ গ্রাম। উপ-প্রজাতিভেদে আকার ও ওজনের সামান্য পার্থক্য হয়। দেহের নিচের অংশের হলুদ রঙের কমবেশির মাধ্যমে তিনটি উপ-প্রজাতিকে আলাদা করা যায়। সাধারণ চড়–ইয়ের স্ত্রী-পুরুষের মতো এদেরও স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য থাকে। প্রজননকালে পুরুষের মাথা থেকে কোমরের পালক হয় উজ্জ্বল লাল। থুতনিতে থাকে ছোট্ট কালচে দাঁড়ি। চোখের আশপাশটা কালচে ও উপরে সরু সাদা টান। গাল ও ঘাড়ের দুপাশটা হালকা ধূসর। দেহের নিচের হালকা ধূসরের উপর থাকে হলদে আভা। কাঁধ ও ডানার বড় পালক-ঢাকনি খয়েরি। মাঝের পালক-ঢাকনির গোড়া কালো ও আগা সাদা। ডানার বাকি অংশ কালো আভাসহ হালকা-বাদামী। প্রজননহীন পুরুষের পালক কিছুটা মলিন ও দেহের উপরটা কমলাটে। অন্যদিকে, স্ত্রীর দেহের উপরটা হালকা বাদামী ও নিচটা হালকা ধূসর; দেখতে কতকটা স্ত্রী সাধারণ চড়–ইয়ের মতো। তবে, পালকে কিছুটা গাঢ় ও লালচে ভাব রয়েছে। চোখের উপরের টানটি অষ্পষ্ট ও হালকা পীতাভ। চোখের পাশ দিয়ে গাঢ় বাদামী রেখা চলে গেছে। ডানা ধুসরাভ-বাদামী। পিঠের উপরে কালো ও হলুদ দাগছোপ। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো হলেও পালকের রঙ হালকা। প্রজননকালীন পুরুষের চঞ্চু কালো; অন্য সময় শিঙ-রঙা। গাঢ় আগাসহ স্ত্রীর চঞ্চু হলদে। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চোখের মণি খয়েরি। পা হালকা থেকে গোলাপী-বাদামী।
মূলত উঁচু পার্বত্য এলাকা ও হালকা বনের বাসিন্দা হলেও শহর, গ্রামাঞ্চল, বনবাগান, উন্মুক্ত এলাকা ও সমুদ্রের কাছাকাছিও বসবাস করতে পারে। শীতের আভাসে উন্মুক্ত চষা জমি, নদীমাতৃক তৃণভূমি এবং ঝোপঝাড় ও গাছগাছড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা যায়। স্বভাবের দিক থেকে গেছো ও ঘর চড়–ইয়ের সঙ্গে বেশ মিল। মূলত মাটিতে খাবার খেলেও দিনের বেশিরভাগ সময়ই খোলামেলা ডালপালার উপর বসে থাকে। পরিযায়নের আবাসে জনবসতি থেকে দূরে বড় ঝাঁকে খাবার খোঁজে। দলবদ্ধভাবে গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে রাত কাটায়। ধান, গম, শস্যদানাসহ বিভিন্ন গুল্মজাতীয় গাছ ও আগাছার বীজ খায়। প্রজননকালে পোকমাকড়ও খায়। ছানাগুলোকে পোকামাকড়ের শুককীট খাওয়ায়। বিভিন্ন প্রজাতির চড়–ইয়ের মধ্যে ওদের স্বর সবচেয়ে মধুর। সচরাচর ‘চিপ, চিউইপ-চিইইপ-চিরাপ, চ্রিরিট-চ্রিরিট-চ্রিরিট’ স্বরে ডাকে।
উপ-প্রজাতিভেদে প্রজনন মৌসুমের হেরফের ঘটে। এদেশের যে উপ-প্রজাতির দারুচিনি চড়–ই দেখা গেছে তাদের প্রজননকাল মে থেকে জুলাই। ওরা সচরাচর গাছের প্রাকৃতিক খোঁড়লে বাসা বানায়; তবে কাঠঠোকরা ও চিলের পরিত্যক্ত বাসাও ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও ছাদ, পাথুরে দেয়াল, বাঁধ, বৈদ্যুতিক বাক্স ইত্যাদিতেও বাসা বানাতে পারে। ঘাস দিয়ে বাসার গদি এবং পশম ও পালক দিয়ে লাইনিং বানায়। পুরুষ বাসার জায়গা নির্ধারণ করে। এরপর স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে বাসা বানায়। বছরে দুবার ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬টি। লম্বাটে সাদা ডিমগুলোতে ধূসরের আভা ও তার উপর বাদামী ফোটা ও দাগছোপ থাকে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেয়া ও ছানা লালনপালনের কাজ স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে করে। ডিম ফোটে গড়ে ১৩ দিনে। ছানারা ১৪ থেকে ১৫ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল প্রায় ৫ বছর।
লেখক: বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, প্রাণীচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
আ ন ম আমিনুর রহমান 










