নদী সংরক্ষণ-সচেতনতা ও বিশ্ব নদী দিবস-২০২৪ কে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব নদী দিবস উদযাপন ও মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওর্য়াড ২০২৪ প্রদান।
আজ শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে ‘বিশ্ব নদী দিবস উদযাপন ও মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৪’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

অনুষ্ঠানে নদী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা তিনজন ব্যক্তিকে মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড-২০২৪ প্রদান করা হয়। এ বছর ব্যক্তি ক্যাটাগরিতে মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড পান প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু, গবেষণা ক্যাটাগরিতে গবেষণা সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ ও সাংবাদিকতা ক্যাটাগরিতে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি ইফতেখার মাহমুদ।
সুদূর কানাডা থেকে অ্যাওয়ার্ড পাওয়া তিনজন ব্যক্তিকে শুভেচ্ছা ও অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করে ভিডিও বার্তা পাঠান বিশ্বে প্রথম নদী দিবস পালনের উদ্যোক্তা মার্ক এঞ্জেলো। এছাড়া অনুষ্ঠানে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এর নির্মিত বাংলাদেশের নদীর ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নদীকে দূষণমুক্ত করতে ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। পলিথিন প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে। নদী শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিতের অংশ হিসেবে নদীকে দূষণমুক্ত করতে হবে। নদী রক্ষা ও দূষণমুক্ত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

ব্যক্তি ক্যাটাগরিতে মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড ২০২৪ প্রাপ্ত প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষ, সমস্যার ব্যাপ্তি অনেক বেড়ে গেছে। এখন আমরা এই মানুষেরা যদি সচেতন না হই তাহলে বাংলাদেশ ভাল থাকবে না, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকেও ভাল রাখতে পারবো না। আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ক্ষমতা আছে, এই ক্ষমতার সাথে যদি মমতা মিশাই তাহলেই ভাল কিছু হবে। এই কাজটি করতে হবে বাংলাদেশের জন্য। ক্ষমতা এবং মমতাকে এক করে যখন কিছু করবো তখনই ভাল কিছু হবে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সুইডেন অ্যাম্বাসির পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রম, আয়োজক প্রতিষ্ঠান নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুর রব মোল্লা, হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়কারী প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান, পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এইচ এম সুমন, কর্ণফুলী সুরক্ষা পরিষদের সেক্রেটারি শেখ দিদারুল ইসলাম চৌধুরী, বিআইডব্লউিটিএয়ের পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন ও প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর এ এম এম খাইরুল আনাম ।
মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওর্য়াড কেন?
বিআইডব্লিউটিএর তথ্য বলছে, ১৯৭১ সালে দেশে নৌপথ ছিল প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। কিন্তু বর্তমানে তা মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। তারপরও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আবার মাছে-ভাতে অভ্যস্থ বাঙালির জন্য নদীর মৎস সম্পদের গুরুত্বও কম নয়। অথচ সেই নদীর অস্থিত্বই আজ বিপন্ন।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট নদ-নদীর সংখ্যা ১০০৮ টি। কিন্তু আসল পরিস্থিতি হলো, এমন বহু নদীর নাম আছে এখন শুধু কাগজে কলমে। দখল ও ভরাটের কবলে পড়ে বাস্তবে এখন আর অনেক নদীর অস্থিত্ব নেই। কিছু নদী আছে মারাত্মক দূষণের কবলে পড়ে পরিণত হয়েছে বিষস্রোতায়। আবার পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাার মতো বড় নদীগুলোও দখল দূষণ ভরাট ও নাব্যতা সংকটে ধুঁকছে।
এমন পরিস্থিতিতে নদী বাঁচাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বহু ব্যক্তি/সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানাভাবে এগিয়ে এসেছে। জনসচেতনতা সৃষ্টি, দখল-দূষণ রোধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করাসহ নিরন্তর তারা নানা আঙ্গিকে কাজ করে চলেছে। তারপরও নদী বাঁচানোর এ উদ্যোগ আরো ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন বিশাল কর্মস্পৃহা। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন নদীপ্রেমি মানুষ/সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সে কর্মস্পৃহা বাড়াতেই মার্ক এঞ্জেলো নদী অ্যাওর্য়াড প্রবর্তন করছে।
মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড কারা মনোনীত হবেন?
এ প্রশ্নের উত্তওে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যন মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন,‘দেশের ভেতরে এবং বাইরে নদী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি / সংগঠক/এক্টিভিস্ট/ গবেষক/লেখক/সাংবাদিক/আইনজীবী/পরামর্শক প্রতিবছর ‘মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড’ -এর জন্য বিবেচিত হবেন। এছাড়া নদী বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সংগঠন, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানও এ পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে।
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ শনিবার ( বিশ্ব নদী দিবসের আগের দিন) গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অ্যাওর্য়াড প্রাপ্তদের হাতে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠন তুলে দেবে মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড।

মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড নাম করনের কারণ?
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন এমন একজনের নামানুসারে এই পুরস্কার প্রবর্তন করছে, যিনি গোটা বিশ্বজুড়েই পরিচিত আপাদমস্তক একজন নদী অন্তপ্রাণ মানুষ হিসেবে। ১৯৫১ সালে কানাডায় জন্মগ্রহণকারী এই অসীম মানুষটির নাম মার্ক এঞ্জেলো। তিনি শুধু একজন নদী সংরক্ষণবাদীই নন, একইসঙ্গে একজন নদী বিষয়ক লেখক, বক্তা, শিক্ষক, গবেষক এবং পরিব্রাজকও। ৭৫ বছর ছুঁই ছুঁই মার্ক অ্যাঞ্জেলো এরই মধ্যে চষে ফেলেছেন বিশ্বের হাজারটিও বেশি নদী। কাজ করেছেন নদীর স্বাস্থ্য রক্ষা, জলজ প্রাণ রক্ষা, নদী বাঁচাতে নানা গবেষণার সঙ্গী হিসেবে। নদী বিষয়ক নানা বৈশ্বিক সভা সেমিনারে তাঁর বক্তব্য প্রশংসিত ও পরামর্শ গুরুত্ব সহকারে গৃহীত হয়েছে। বর্ণমালার ক্রমানুসারে আজও একের পর এক নদীর নাম বলে যেতে পারেন তিনি। তাঁর ভাষায়, নদী হলো আমাদের গ্রহের ধমনী।
নদী নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মার্ক এঞ্জেলো এরইমধ্যে অর্জন করেছেন নিজ দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘অর্ডার অব কানাডা’ বা ‘ওসি’ এবং আরেক চূড়ান্ত সম্মানকজনক পদক ‘অর্ডার অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ বা ‘ওবিসি’। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৮০ সালে প্রথম বিশ্বে পালিত হয় নদী দিবস। পরে ২০০৫ সাল থেকে জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো এই দিবস পালনে এগিয়ে আসে। এছাড়া মার্ক এঞ্জেলো ব্রিটিশ-কলম্বিয়া নদী দিবস পালনেরও উদ্যোক্তা।
২০০৯ সালে মার্ক এঞ্জেলো ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (বিসিআইটি) রিভারস ইনস্টিটিউটের এমিরেটাস চেয়ার নিযুক্ত হন। তার আগে তিনি বিসিআইটিতে মাছ, বন্যপ্রাণী প্রকল্পে দীর্ঘ সময় প্রধান সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশে বিশ্ব নদী দিবস পালন শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। এরপর অনেকবারই মার্ক এঞ্জেলো বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন, নদী পরিব্রাজক দলসহ বাংলাদেশের নদী কর্মীদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এমন একজন নদীপ্রেমি মানুষের নামানুসারে বাংলাদেশে ‘মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওর্য়াড’ প্রবর্তন করতে পেরে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন সম্মানিত বোধ করছে।
জোবায়ের আহমেদ 










