‘বিল্ডিং এ সাসটেইনেবল লেদার সেক্টর ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় “ভৈরব পাদুকা শিল্পে শ্রম ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বিষয়ক মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন” বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ ১৬ এপ্রিল ২০২৫ (বুধবার) সকাল ১০.৩০ এ ভৈরব উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে শ্রমিকদের পরিবেশ সুরক্ষা ও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা ও ভৈরব পাদুকা শিল্পের প্রসারে বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
সভায় বক্তারা বলেন, পাদুকা খাত ভৈরবের প্রধান ও বৃহত্তম শিল্প খাত, যা কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত । রাজধানী ঢাকার সাভারের পর দেশের সবচেয়ে বেশি জুতা তৈরী হয় ভৈরব শহরে। ছোট বড় সহ এখানে জুতার কারখানা রয়েছে অন্তত ৮ হাজার। এছাড়াও পাদুকার বিপণন ও কাঁচামাল সরবরাহের জন্য আরও প্রায় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ভৈরবে ব্যবসা করছে। এখানকার কারখানা গুলো থেকে দেশের অনেক নামীদামী ও শীর্ষ ̄স্থানীয় ব্র্যান্ড সমুহ জুতা প্রস্তুত ও সংগ্রহ করে থাকে। বৃহৎ এই শিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু জুতা তৈরী কারখানা । এখানকার অনেক কারখানা মালিক এবং ব্যবসায়ীগণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুতা রপ্তানি করে থাকে ।

সভায় ভৈরব পাদুকা শিল্পের পরিবেশ দূষণ এবং পাদুকা কারখানায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও উৎপন্ন বর্জ্যের দ্বারা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব তুলে ধরার পাশাপাশি শিশুশ্রম নিরসন, নারীর প্রতি বৈষম্য নিরোধ, শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, শ্রম অধিকার নিশ্চিত ও এই শিল্পের টেকশই উন্নয়নে সরকার, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের ভূমিকা ও করনীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি শ্রম বান্ধব, পরিবেশ সম্মত টেকসই চামড়াশিল্প খাত তৈরি করার উপায়গুলো খুঁজে বের করে কার্যকর ভূমিকা পালনে সভায় আলোচনা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার হুবার্ট ব্লুম বলেন বাংলাদেশ গ্লোবাল ফুটওয়্যার ও লেদার মার্কেটে ভালো সাফল্য অর্জন করছে, বিশেষ করে চামড়ার জুতা ও আনুসাঙ্গিক সরঞ্জামে । উন্নয়নের সাথে সাথে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বাড়তে থাকে । সামাজিক কমপ্লায়েন্স বলতে বোঝায় শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য বেতন এবং শোভন কর্মপরিবেশ ।
পাদুকা শিল্পে অনেক নারী ও যুবক কাজ করে, তাদের একটা ভবিষ্যৎ আছে যেটা আমাদের রক্ষা করতে হবে । পরিবেশ কমপ্লায়েন্স বলতে বোঝায় সঠিক বর্জ্য ব্যাবস্থাপনা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে কেমিক্যাল ব্যবহার কমানো । এই কারণে লেদার সেক্টর ইন বাংলাদেশ প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

আলোচনা সভায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু বলেন ভৈরবের পাদুকা শিল্প স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বহু মানুষের জীবিকার উৎস। এখানে শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার ও অপরিশোধিত বর্জ্য দ্বারা পরিবেশ দূষণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ মতো বিষয়গুলো ”বিল্ডিং এ সাসটেইনেবল লেদার সেক্টর ইন বাংলাদেশ“ প্রকল্পের আওতায় আমরা এসব সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের পাশাপাশি একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছি।
চামড়া প্রক্রিয়াকরণে বিভিন্ন রাসায়নিক, রং এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ ব্যবহৃত হয়। কঠিন বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এসব কেমিক্যাল প্রতিনিয়ত মিশে যাচ্ছে নদী, খাল ও জলাশয়ে এবং বাতাসও দূষিত হচ্ছে সমানভাবে। এছাড়া, এসব কঠিন বর্জ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে ফিসারিজ এবং পোল্ট্রি ফিড। ফলে বিষাক্ত কেমিক্যাল চলে যাচ্ছে মানুষের প্রতিদিনের খাবারে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ক্যানসারসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে।
গাছ লাগানোর মাধ্যমে বায়ু দূষণ কমানো, মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব। গাছ পরিবেশকে শীতল রাখে। এছাড়া, গাছের শিকড় মাটির ক্ষয়রোধ করে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াতে সাহায্য করে।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শবনম শারমিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন সংস্থা কে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, ভৈরবে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট তৈরি হলে পাদুকা শিল্পে বিপ্লব ঘটবে, এখানকার শ্রমিকেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এই শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ভৈরবের পাদুকা শিল্পকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করার জন্য সকলকে আহ্বান জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ।
তিনি আরো বলেন, ব্যাংক সহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাদুকা শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে এই শিল্পের অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

ভৈরব বিএনপির সভাপতি জনাব রফিকুল ইসলাম বলেন, চামড়া শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি শিল্প হলেও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। দক্ষ জনশক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় পিছিয়ে পড়ছে পাদুকা শিল্প। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলাদেশে চামড়ার দাম কমলেও বেড়েছে জুতার দাম। পাদুকা শিল্পকে এগিয়ে নিতে সকলকে একসাথে কাজ করার আহবান জানান রফিকুল ইসলাম।
সভায় পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে এই অঞ্চলে এই খাতের শ্রমিকদের সচেতনতা নিয়েও গুরুত্ববহ আলোচনা হয়।
সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম পাদুকা শিল্পে নারীদের প্রতি বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, অনেক কারখানা রয়েছে যেখানে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা নাই । এমনকি মাতৃত্বকালীন ছুটিও নাই । সন্তান সম্ভবা হলে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয় , অথবা চাকরি ছেড়ে দিতে হয় । এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরী করতে না পারলে, পাদুকা শিল্পে নারীকর্মীদের সংখ্যা শূন্যের কোটায় নেমে যাবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন বলেন, কর্মক্ষেত্রের যৌন হয়রানির কারণে পাদুকা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। শ্রম আইনের প্রয়োগ না থাকায় শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করলে পাদুকা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
ভৈরব পাদুকা কারখানা মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আল আমিন মিয়া বলেন, ভৈরবে ৯০ শতাংশ জুতা তৈরি হয় দেশীয় মার্কেটের জন্য। দক্ষ কর্মীর অভাবে আন্তর্জাতিক বাজার দখলে ব্যর্থ হচ্ছে ভৈরব পাদুকা শিল্প। দক্ষ কর্মীর জন্য কমন ফেসিলিটি সেন্টার প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জনবল থাকার পরেও শুধুমাত্র দক্ষতার অভাবে এখানকার শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক মানের জুতা তৈরী করতে পারছে না। একটি কমন ফেসিলিটি সেন্টার স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ভৈরব পাদুকাশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আল আমিন।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ও সলিডার সুইসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রকল্পটিতে যৌথভাবে কাজ করছে ওশি ফাউন্ডেশন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস্।
জোবায়ের আহমেদ 










