সাহিত্য

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে

  • নাজমুল হক ইমন
  • আপডেট সময় ০৮:০২:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • 281

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে

পুরনো একটা দেবদারু গাছ। যে গাছে বাস করে এক ঝাঁক বক আর পানকৌড়ি। কোনো বাসায় বাচ্চা। কোনো বাসায় ডিম। বাচ্চাগুলো উড়তে শেখেনি। কয়েকটা ডেম ফুটে বাচ্চা হবে হবে করছে। গাছ বিক্রি করে দিয়েছে তার মালিক। আজই কেটে নিয়ে যাবে ক্রেতা। সুখে বসবাস করা বক আর পানকৌড়ি আশ্রয়স্থল হারাবে। বাচ্চাগুলোকে কাক, বিড়াল কিংবা কুকুরে সাবাড় করবে। পাখির আসন্ন বিপদের কথা ভেবে বিচলিত গ্রামের একটি লোক। ভেবে-চিন্তে কোনো কুল-কিনারা না পেয়ে ছুটে যান ক্রেতার বাড়িতে। বিনয়ের সাথে অন্তত একদিনের জন্য গাছকাটা বন্ধ রাখতে অনুরোধ জানান। কিন্তু পাখি-বাচ্চা-ডিম নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন গাছের ক্রেতা। তাই লোকটির কথা তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখান করেন তিনি। পাখিদের রক্ষা করতে বিকল্প আর কোনো পথ না পেয়ে লোকটি হাজির হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে। অসহায় পাখিদের প্রাণভিক্ষা চেয়ে একটি আবেদন করেন। মানবিক কারণেই সে আবেদনপত্রে নির্বাহী কর্মকর্তা লিখে দেন ‘বাচ্চাগুলো বড় না হওয়া পর্যন্ত গাছটি না কাটার জন্য অনুরোধ করা হলো।’ সুপারিশকৃত আবেদনপত্রটি নিয়ে তিনি আবার যান গাছের ক্রেতার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে গাছ কাটতে লোকজন করাত নিয়ে হাজির। গাছের ক্রেতা অনিচ্ছাকৃতভাবে গাছ কাটা বন্ধ রাখেন। লোকটির কাছে শোনা, গাছে পাখি-বাচ্চা-ডিমের কথা বিশ্বাস করতে না পেরে সত্যতা যাচাই করতে গাছ কাটতে আসা একজন গাছে ওঠেন। কথার সত্যতা মেলে। পাখিদের জন্য তারও জেগে ওঠে মমতা। গাছের ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে বলেন, কিছু টাকার জন্য আমরা পাখি-বাচ্চা-ডিম নষ্ট করতে পারবো না। গাছের ক্রেতাও তার ভুল বুঝতে পারেন।

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে prokritibarta

গাছ কাটা বন্ধ রাখা হয়। গল্পটা সাজানো-গোছানো কোনো নাটক নয়। ২০০৬ সালের ৭ জুনের সত্যি ঘটনা। ঘটনাস্থল, নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার কুঞ্জবন গ্রাম। লোকটির নাম মনছুর সরকার। বাবা দেলোয়ার সরকার। খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন পাখি প্রেমিকও। বাবার কাছ থেকেই মনছুর সরকার পেয়েছেন পাখি ও প্রকৃতিকে ভালোবাসার অনুপ্রেরণা। অভাবী সংসারে বেশি দূর এগোতে পারে নি মনছুর সরকারের পড়ালেখা। চার বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাই বাধ্য হয়ে তাকেই ঘাড়ে তুলে নিতে হয় সংসারের দায়িত্ব। কিন্তু বারবার পাখি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাঁধাধরা চাকরিতে তার টিকে থাকা হয়ে ওঠেনি কখনো। বর্তমানে বাসাবাড়ি ভাড়া, বাড়ির পাশে ছোট পুকুরে মাছ চাষ ও মুরগি-ছাগল পালন করেই চলছে মনছুর সরকারের সংসার। মনছুর সরকার বলেন, পাখির কষ্টে কষ্ট পাই, পাখির চঞ্চলতায় মনটা বরে ওঠে। ওরা যেন আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে প্রকৃতিতে পাখির মুক্ত বিচরণ দেখে। তাই সংসারের চেয়ে বেশি সময় পার করি পাখিদের সাথে। চেষ্টা করে যাচ্ছি সংরক্ষণেরও। মনছুর সরকারের স্ত্রী শাহিনা সরকার বলেন, বিয়ের পর থেকেই তার পাখি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে দেখছি। অন্যদিকে কোনো খেয়াল নেই তার। ছেলেমেয়ে-সংসার আমাকেই সামলাতে হয়। তারপরও তার কাজ আমার ভালো লাগে।

যেখানেই শিকারির কু-নজর পাখিদের ওপর, সেখানেই ছুটে যান মনছুর সরকার। পাখি ও পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে ‘জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন’, ‘পাখি হত্যা করবেন না, এরা প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে’, ‘পাখি কৃষকের পরম বন্ধু, অথবা ‘অভয়ারণ্যগুলো জাতীয় সম্পদে রূপান্তরিত করুন’, ইত্যাদি জনসচেতনতামূলক লেখাসম্বলিত হাজার হাজার লিফলেট নিজের খরচে ছাপিয়ে বিলি করেন। সেই সাথে উপজেলাজুড়ে মাসে একবার মাইকিং করেন। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস পালন করেন নিজের গ্রামে। এলাকার ক্লাবগুলোকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করেন। ক্লাবের সদস্যরা উৎসাহী হয়ে মনছুর সরকারকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন। এলাকায় কোনো পাখি শিকারিকে দেখলে তারা মনছুর সরকারকে খবর দেন অথবা শিকারির কাছ থেকে পাখি শিকার না করার অঙ্গীকারনামা লিখে নিয়ে ছেড়ে দেন। মনছুর সরকারের সংগ্রহে এমন শতাধিক শিকারির অঙ্গীকার নামা সংরক্ষিত আছে। আরো আছে বিভিন্ন ধফতরে পাঠানো প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক চার শতাধিক চিঠির কপি। হাজারো স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় প্রেসক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাখি ও পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে সভা-সমাবেশ করেন। বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতির পাখি চিহ্নিতকরণ, কী কারণে এসব পাখি হারিয়ে যাচ্ছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিকাজে পাখির ভূমিকা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি ব্যাপক কাজ করছেন।

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে prokritibarta

পাখি যে মানুষের বন্ধু, পাখি মারা উচিত নয়, মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ২৭ বছর ধরে তিনি এ কথাগুলোই বোঝাচ্ছেন। এ কাজের জন্য তিনি নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, খুলনা, জয়পুরহাট, গাজীপুর, রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ান। পাখিদের নিয়ে একটা বইও লিখেছেন তিনি। প্রকাশ হয়নি অর্থাভাবে। অথচ পাখি গবেষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই পাণ্ডুলিপির তথ্য থেকে উপকৃত হচ্ছেন নানাভাবে। এছাড়া এলাকার প্রায় ৩০ জন কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে সাত বছর ধরে তার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। তার অনুপ্রেরণায় কুঞ্জবন বাজারের চায়ের দোকানি খয়বর আলী প্রতিদিন পাখিদের দু’বেলা খাবার দেন। খয়বর আলী বলেন, মনছুর ভাইয়ের কাছ থেকে পাখিদের ভালোবাসতে শিখেছি। এক মনছুরের জন্য খয়বর আলীদের মতো অনেক মনছুর আজ জন্ম নিয়েছে মহাদেবপুর উপজেলায়।

ঝড়ের দিনে মানুষ ভাঙা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়া গাছপালা, আম কুড়ানো ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু মনছুর সরকার খুঁজে ফেরেন অসুস্থ পাখি। খুঁজেও পান। বেশির ভাগই বাচ্চা। আরো খুঁজে পান আহত পাখিকে নিয়ে রসনা বিলাসে তৃপ্তি মেটানো মানুষও। মনছুর তার কয়েকজন বন্ধুদের ডেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন গ্রাম থেকে। তার মনে হয়, ঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষ, গাছপালা আর পশুপাখির কষ্টের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। আহত পাখিগুলোকে নিয়ে তিনি বাসায় ফিরে আসেন। নিজের জ্ঞানের যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা করেন। দিনের পর দিন সেবা-যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। অনাকাংখিতভাবে কোনো কোনো পাখি মারা যায়, আবার কোনো কোনো পাখি সুস্থ হয়ে ফিরে যায় তার আপন রাজ্যে, মুক্ত পরিবেশে। এছাড়া প্রজাতির পাখিদের প্রজনন করিয়েও তিনি প্রতিনিয়ত তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে যাচ্ছেন।

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে prokritibarta

মনছুর সরকারের উদ্যোগেই নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলাকে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। মহাদেবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের দিকে পা বাড়ালেই এখন চোখে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুঘু পাখি। এর পেছনে বড় অবদান মনছুর সরকারের। পাখি আর পরিবেশ নিয়ে দেশজুড়ে এভাবেই কাজ করে মনছুর পার করেছেন জীভনের ২৭ টি বছর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি মেলায় তিনি চারবার পুরস্কৃত হয়েছেন। বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ও বৃক্ষের উপর দলিল প্রণয়নে অংশ নেওয়ার জন্য ‘দ্য ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন ইউনিয়ন’(আইইউসিএন) থেকে ২০০৪ সালের ২১ এপ্রিল তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদফতরের মিট দ্য পিপল প্রোগ্রামের সপ্তম সভার কার্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, মনছুর সরকার তার এলাকায় পাখি সংরক্ষণ ও অন্যান্য পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সভায় সিন্ধান্ত হয়, মনছুর সরকারকে পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হবে, অধিদফতর কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অধিদফতর কর্তৃক প্রকাশিত প্রচারপত্রসমূহ তাকে সরবরাহ করা হবে। এ সভার কার্য বিবরণী মনছুর সরকারকে ডাকে পাঠানো হলেও পরে সে কাজ আর বেশিদূর এগোয়নি। তবে কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেলেও পাখি অন্তঃপ্রাণ মনছুর সরকারের পাখির প্রতি ভালোবাসা কিন্তু এতটুকু কমেনি। ইচ্ছা থাকলেই উপায়টা বের হয়ে আসে। অর্থাভাবের পরও পাখির প্রতি ভালোবাসা মনছুর সরকারকে নিয়ে গেছে ভারত, ভুটান ও নেপালে। ইচ্ছেশক্তি আর পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা থাকার কারণে অর্থ কোনো বাধা তৈরি করতে পারেনি। আজ মনছুর সরকারের মতো আমাদের কিছু মানুষ দরকার, যারা অনিবার্য বিপর্যয় থেকে প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে আমাদের রক্ষা করতে পারেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

সাহিত্য

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে

আপডেট সময় ০৮:০২:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪

পুরনো একটা দেবদারু গাছ। যে গাছে বাস করে এক ঝাঁক বক আর পানকৌড়ি। কোনো বাসায় বাচ্চা। কোনো বাসায় ডিম। বাচ্চাগুলো উড়তে শেখেনি। কয়েকটা ডেম ফুটে বাচ্চা হবে হবে করছে। গাছ বিক্রি করে দিয়েছে তার মালিক। আজই কেটে নিয়ে যাবে ক্রেতা। সুখে বসবাস করা বক আর পানকৌড়ি আশ্রয়স্থল হারাবে। বাচ্চাগুলোকে কাক, বিড়াল কিংবা কুকুরে সাবাড় করবে। পাখির আসন্ন বিপদের কথা ভেবে বিচলিত গ্রামের একটি লোক। ভেবে-চিন্তে কোনো কুল-কিনারা না পেয়ে ছুটে যান ক্রেতার বাড়িতে। বিনয়ের সাথে অন্তত একদিনের জন্য গাছকাটা বন্ধ রাখতে অনুরোধ জানান। কিন্তু পাখি-বাচ্চা-ডিম নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন গাছের ক্রেতা। তাই লোকটির কথা তাচ্ছিল্যভরে প্রত্যাখান করেন তিনি। পাখিদের রক্ষা করতে বিকল্প আর কোনো পথ না পেয়ে লোকটি হাজির হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে। অসহায় পাখিদের প্রাণভিক্ষা চেয়ে একটি আবেদন করেন। মানবিক কারণেই সে আবেদনপত্রে নির্বাহী কর্মকর্তা লিখে দেন ‘বাচ্চাগুলো বড় না হওয়া পর্যন্ত গাছটি না কাটার জন্য অনুরোধ করা হলো।’ সুপারিশকৃত আবেদনপত্রটি নিয়ে তিনি আবার যান গাছের ক্রেতার কাছে। কিন্তু ততক্ষণে গাছ কাটতে লোকজন করাত নিয়ে হাজির। গাছের ক্রেতা অনিচ্ছাকৃতভাবে গাছ কাটা বন্ধ রাখেন। লোকটির কাছে শোনা, গাছে পাখি-বাচ্চা-ডিমের কথা বিশ্বাস করতে না পেরে সত্যতা যাচাই করতে গাছ কাটতে আসা একজন গাছে ওঠেন। কথার সত্যতা মেলে। পাখিদের জন্য তারও জেগে ওঠে মমতা। গাছের ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে বলেন, কিছু টাকার জন্য আমরা পাখি-বাচ্চা-ডিম নষ্ট করতে পারবো না। গাছের ক্রেতাও তার ভুল বুঝতে পারেন।

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে prokritibarta

গাছ কাটা বন্ধ রাখা হয়। গল্পটা সাজানো-গোছানো কোনো নাটক নয়। ২০০৬ সালের ৭ জুনের সত্যি ঘটনা। ঘটনাস্থল, নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার কুঞ্জবন গ্রাম। লোকটির নাম মনছুর সরকার। বাবা দেলোয়ার সরকার। খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন পাখি প্রেমিকও। বাবার কাছ থেকেই মনছুর সরকার পেয়েছেন পাখি ও প্রকৃতিকে ভালোবাসার অনুপ্রেরণা। অভাবী সংসারে বেশি দূর এগোতে পারে নি মনছুর সরকারের পড়ালেখা। চার বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাই বাধ্য হয়ে তাকেই ঘাড়ে তুলে নিতে হয় সংসারের দায়িত্ব। কিন্তু বারবার পাখি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাঁধাধরা চাকরিতে তার টিকে থাকা হয়ে ওঠেনি কখনো। বর্তমানে বাসাবাড়ি ভাড়া, বাড়ির পাশে ছোট পুকুরে মাছ চাষ ও মুরগি-ছাগল পালন করেই চলছে মনছুর সরকারের সংসার। মনছুর সরকার বলেন, পাখির কষ্টে কষ্ট পাই, পাখির চঞ্চলতায় মনটা বরে ওঠে। ওরা যেন আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে প্রকৃতিতে পাখির মুক্ত বিচরণ দেখে। তাই সংসারের চেয়ে বেশি সময় পার করি পাখিদের সাথে। চেষ্টা করে যাচ্ছি সংরক্ষণেরও। মনছুর সরকারের স্ত্রী শাহিনা সরকার বলেন, বিয়ের পর থেকেই তার পাখি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে দেখছি। অন্যদিকে কোনো খেয়াল নেই তার। ছেলেমেয়ে-সংসার আমাকেই সামলাতে হয়। তারপরও তার কাজ আমার ভালো লাগে।

যেখানেই শিকারির কু-নজর পাখিদের ওপর, সেখানেই ছুটে যান মনছুর সরকার। পাখি ও পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে ‘জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন’, ‘পাখি হত্যা করবেন না, এরা প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে’, ‘পাখি কৃষকের পরম বন্ধু, অথবা ‘অভয়ারণ্যগুলো জাতীয় সম্পদে রূপান্তরিত করুন’, ইত্যাদি জনসচেতনতামূলক লেখাসম্বলিত হাজার হাজার লিফলেট নিজের খরচে ছাপিয়ে বিলি করেন। সেই সাথে উপজেলাজুড়ে মাসে একবার মাইকিং করেন। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস পালন করেন নিজের গ্রামে। এলাকার ক্লাবগুলোকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করেন। ক্লাবের সদস্যরা উৎসাহী হয়ে মনছুর সরকারকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন। এলাকায় কোনো পাখি শিকারিকে দেখলে তারা মনছুর সরকারকে খবর দেন অথবা শিকারির কাছ থেকে পাখি শিকার না করার অঙ্গীকারনামা লিখে নিয়ে ছেড়ে দেন। মনছুর সরকারের সংগ্রহে এমন শতাধিক শিকারির অঙ্গীকার নামা সংরক্ষিত আছে। আরো আছে বিভিন্ন ধফতরে পাঠানো প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক চার শতাধিক চিঠির কপি। হাজারো স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় প্রেসক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাখি ও পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে সভা-সমাবেশ করেন। বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতির পাখি চিহ্নিতকরণ, কী কারণে এসব পাখি হারিয়ে যাচ্ছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিকাজে পাখির ভূমিকা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি ব্যাপক কাজ করছেন।

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে prokritibarta

পাখি যে মানুষের বন্ধু, পাখি মারা উচিত নয়, মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ২৭ বছর ধরে তিনি এ কথাগুলোই বোঝাচ্ছেন। এ কাজের জন্য তিনি নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, খুলনা, জয়পুরহাট, গাজীপুর, রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ান। পাখিদের নিয়ে একটা বইও লিখেছেন তিনি। প্রকাশ হয়নি অর্থাভাবে। অথচ পাখি গবেষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই পাণ্ডুলিপির তথ্য থেকে উপকৃত হচ্ছেন নানাভাবে। এছাড়া এলাকার প্রায় ৩০ জন কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে সাত বছর ধরে তার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। তার অনুপ্রেরণায় কুঞ্জবন বাজারের চায়ের দোকানি খয়বর আলী প্রতিদিন পাখিদের দু’বেলা খাবার দেন। খয়বর আলী বলেন, মনছুর ভাইয়ের কাছ থেকে পাখিদের ভালোবাসতে শিখেছি। এক মনছুরের জন্য খয়বর আলীদের মতো অনেক মনছুর আজ জন্ম নিয়েছে মহাদেবপুর উপজেলায়।

ঝড়ের দিনে মানুষ ভাঙা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়া গাছপালা, আম কুড়ানো ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু মনছুর সরকার খুঁজে ফেরেন অসুস্থ পাখি। খুঁজেও পান। বেশির ভাগই বাচ্চা। আরো খুঁজে পান আহত পাখিকে নিয়ে রসনা বিলাসে তৃপ্তি মেটানো মানুষও। মনছুর তার কয়েকজন বন্ধুদের ডেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন গ্রাম থেকে। তার মনে হয়, ঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষ, গাছপালা আর পশুপাখির কষ্টের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। আহত পাখিগুলোকে নিয়ে তিনি বাসায় ফিরে আসেন। নিজের জ্ঞানের যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা করেন। দিনের পর দিন সেবা-যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। অনাকাংখিতভাবে কোনো কোনো পাখি মারা যায়, আবার কোনো কোনো পাখি সুস্থ হয়ে ফিরে যায় তার আপন রাজ্যে, মুক্ত পরিবেশে। এছাড়া প্রজাতির পাখিদের প্রজনন করিয়েও তিনি প্রতিনিয়ত তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে যাচ্ছেন।

মনের সুর মিশেছে যার পাখির সুরে prokritibarta

মনছুর সরকারের উদ্যোগেই নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলাকে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। মহাদেবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের দিকে পা বাড়ালেই এখন চোখে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুঘু পাখি। এর পেছনে বড় অবদান মনছুর সরকারের। পাখি আর পরিবেশ নিয়ে দেশজুড়ে এভাবেই কাজ করে মনছুর পার করেছেন জীভনের ২৭ টি বছর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি মেলায় তিনি চারবার পুরস্কৃত হয়েছেন। বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ও বৃক্ষের উপর দলিল প্রণয়নে অংশ নেওয়ার জন্য ‘দ্য ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন ইউনিয়ন’(আইইউসিএন) থেকে ২০০৪ সালের ২১ এপ্রিল তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদফতরের মিট দ্য পিপল প্রোগ্রামের সপ্তম সভার কার্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, মনছুর সরকার তার এলাকায় পাখি সংরক্ষণ ও অন্যান্য পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সভায় সিন্ধান্ত হয়, মনছুর সরকারকে পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হবে, অধিদফতর কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অধিদফতর কর্তৃক প্রকাশিত প্রচারপত্রসমূহ তাকে সরবরাহ করা হবে। এ সভার কার্য বিবরণী মনছুর সরকারকে ডাকে পাঠানো হলেও পরে সে কাজ আর বেশিদূর এগোয়নি। তবে কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পেলেও পাখি অন্তঃপ্রাণ মনছুর সরকারের পাখির প্রতি ভালোবাসা কিন্তু এতটুকু কমেনি। ইচ্ছা থাকলেই উপায়টা বের হয়ে আসে। অর্থাভাবের পরও পাখির প্রতি ভালোবাসা মনছুর সরকারকে নিয়ে গেছে ভারত, ভুটান ও নেপালে। ইচ্ছেশক্তি আর পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা থাকার কারণে অর্থ কোনো বাধা তৈরি করতে পারেনি। আজ মনছুর সরকারের মতো আমাদের কিছু মানুষ দরকার, যারা অনিবার্য বিপর্যয় থেকে প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে আমাদের রক্ষা করতে পারেন।