নদী বিষয়ক তথ্য ও চিত্র তুলে ধরাসহ নদী সংরক্ষণ-সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে প্রথমবার প্রবর্তিত ‘মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু।
রোববার বিশ্ব নদী দিবস-২০২৪ কে সামনে রেখে ২১ সেপ্টেম্বর (শনিবার) বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
নদী সংরক্ষণে অবদান রাখায় ব্যক্তি ক্যাটাগরিতে এবছরের মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু। গণমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জীবনকে তুলে ধরা এই ব্যক্তিত্বকে ‘মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন এই অ্যাওয়ার্ডের জুরি বোর্ডের প্রধান- হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়কারী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া।
চ্যানেল আইতে সম্প্রচারিত প্রকৃতি ও জীবন অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমি একজন প্রাণীবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে মনে করি মুকিত মজুমদার বাবু যে কাজটি করে চলেছেন তা এক কথায় অসাধারণ। বাংলাদেশে এক সময়ে হয়তো আমরা অনেক জীববৈচিত্র্য দেখবো না, কিন্তু মুকিত মজুমদার বাবু যে তথ্যচিত্র, ডকুমেন্টেশন তৈরি করেছেন, করে যাচ্ছেন সেসব দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য আরও অনেকদিন বেঁচে থাকবে। এরকম কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের বহু সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।’
অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে মুকিত মজুমদার বাবুকে ‘নদীযোদ্ধা’ সম্ভাষণ করে তিনি বলেন, ‘নদী সংরক্ষণেও মুকিত মজুমদার বাবু গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে যাচ্ছেন।’
নদী বিষয়ক সচেতনা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত হয়েছিল নদী অলিম্পিয়াড ‘ইয়াং রিভার চ্যাম্পিয়নশিপ’। সেই আয়োজনের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে নদী রক্ষার জন্য একটা জাগরণ তৈরি হয়। বিশেষ করে স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নদী সচেতনার মাধ্যমে নদী সংরক্ষণের জন্য এই উদ্যোগ ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ‘এসো নদীর গল্প শুনি’ কর্মসূচিতে স্কুলের শিক্ষার্থীরা যেভাবে অংশ নিয়েছে তাতে নদী রক্ষার জন্য সোচ্চার সচেতন প্রজন্ম তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।’

জুরি বোর্ডের প্রধানের বক্তব্য শেষে চিরচেনা সবুজ পোশাকে মঞ্চে উঠে আসেন প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু। তার কাঁধে বাংলাদেশের নদীচিত্র ফুটিয়ে তোলা শাল পরিয়ে দেন অধ্যাপক মনজুরুল কিবরীয়া। এরপর মুকিত মজুমদার বাবুর হাতে মার্ক অ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড তুলে দেন প্রধান অতিথি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশের শুরুতেই মুকিত মজুমদার বাবু প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে সচেতন গোষ্ঠীর পক্ষের মানুষ হিসেবে পরিচিত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগ্রহণ করায় শুভেচ্ছা জানান। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের মাঝ থেকে একজন অন্তর্বতীকালীন সরকারে প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমাদের জন্য এটা বিশাল পাওয়া। কারণ আমাদের কথা সবচেয়ে ভাল জানেন উনি (সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান)। পরিবেশ, প্রকৃতি, নদী সব মিলিয়েই তিনি আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা আশা করবো তার মাধ্যমে এই বিষয়গুলো ভাল অবস্থানে যাবে। ’
নদীর সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রথমবার প্রবর্তিত মার্ক অ্যাঞ্জেলো অ্যাওয়ার্ড পেয়ে মুকিত মজুমদার বাবু আরও বলেন, ‘অবশ্যই যেকোনো পুরস্কার সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়। আজকের এই মার্ক অ্যাঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড এটা নদী বিষয়ে সুন্দর একটি আয়োজন। এর মাধ্যমে আজ থেকে সুন্দর একটি অ্যাওয়ার্ডের প্রবর্তন হলো।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মজুমদার বাবু দেশের প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন,‘বাংলাদেশটা আমাদের, দেশটাকে ভাল রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। একাত্তরে যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। আর আজকে দেশকে ভাল রাখার যুদ্ধ এবং দেশকে ভাল রাখতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন দেশে ১৮ কোটির বেশি মানুষ, সমস্যার ব্যাপ্তি অনেক বেড়ে গেছে। এখন আমরা এই মানুষেরা যদি সচেতন না হই তাহলে বাংলাদেশ ভাল থাকবে না, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকেও ভাল রাখতে পারবো না। আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ক্ষমতা আছে, এই ক্ষমতার সাথে যদি মমতা মিশাই তাহলেই ভাল কিছু হবে। এই কাজটি করতে হবে বাংলাদেশের জন্য। ক্ষমতা এবং মমতাকে এক করে যখন কিছু করবো তখনই ভাল কিছু হবে।’
৫৩ বছর ধরে নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকের পর দেশে ভাল সময় আসছে এই আশা প্রকাশ করে সবার কাছে দোয়া চেয়ে বক্তব্য শেষ করেন মুকিত মজুমদার বাবু।
মুকিত মজুমদার বাবু ছাড়াও নদী নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এক প্রতিষ্ঠান ও এক ব্যক্তিকে মার্ক এঞ্জেলো রিভার এওয়ার্ড ২০২৪ প্রদান করা হয়। গবেষণা ক্যাটাগরিতে গবেষণা সংস্থা রিভার এন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ ও সাংবাদিকতা ক্যাটাগরিতে প্রথম আলো’র বিশেষ প্রতিনিধি ইফতেখার মাহমুদ এবছর এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সুইডেন অ্যাম্বাসির পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রম, নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড.আব্দুর রব মোল্লা, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান, পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এইচ এম সুমন, কর্ণফুলী সুরক্ষা পরিষদের সেক্রেটারি শেখ দিদারুল ইসলাম চৌধুরী, বিআইডব্লউিটিএয়ের পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর এ এম এম খাইরুল আনাম ।
নাসিমুল শুভ 










